আড়াইশো বছরের ভাবনার অভিযাত্রা || ডা. শাহাব আহমেদ

 ‘My country is the world, and my religion is to do good.’

 - Thomas Paine

আমেরিকায় যখন বিপ্লব হয়, অর্থাৎ আড়াইশ বছর আগে পৃথিবীতে ক্ষমতার একটাই রূপ ছিল, রাজাই সর্বেসর্বা, রাজার ইচ্ছাই আইন, শুধু তার নিজের দেশেই নয়, অন্য যে দেশগুলোকে জোর করে তার শাসনের অধীনে আনা হয়েছে, সে দেশগুলোতেও। এবং ইওরোপের ছোট ছোট কয়েকটি দেশ সারা পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিয়েছিল, শান্তিপূর্ণভাবে নয়, যুদ্ধের মাধ্যমে এবং এরা প্রতিনিয়তই একে অন্যের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। অর্থাৎ পৃথিবী চলতো পেশি শক্তির বলে। 

সুতরাং ইতিহাস ছিল যুদ্ধ, সাম্রাজ্য ক্ষমতার ইতিহাস হিসেবে। যদিও সকল ইতিহাসের গভীরেই আরএকটি নীরব ইতিহাস অবিরল প্রবাহিত হয়Ñমানুষের ইতিহাস। সেই মানুষ, যে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চায়; চায় তার সন্তান যেন ক্ষুধায় না কাঁদে, তার কণ্ঠ যেন ভয়ে স্তব্ধ না হয়, তার শ্রমের সঠিক মূল্য পায় এবং তার সত্য যেন ক্ষমতার খেলনা না হয়। 

আমেরিকার স্বাধীনতার আড়াইশো বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমরা শুধুই একটি দেশের স্বাধীনতা বার্ষিকী স্মরণ করি না, বরং তা আমাদের নিয়ে যায় আড়াইশো বছরের ভাবনার অভিযাত্রায়। ভাবনাও ভ্রমণ করে। মানুষের মতো তারও কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। কখনও সে দার্শনিকের কলমে জন্ম নেয়, কখনও উচ্চারিত হয় বিপ্লবীর কণ্ঠে, কখনও সৈনিকের সঙ্গে সে সমুদ্র পাড়ি দেয়, কখনও নির্বাসিতের স্মৃতিতে কেলাসিত হয়। এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক শতাব্দী থেকে অন্য শতাব্দীতে, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়Ñভাবনা পরিভ্রমণ করে।

আমেরিকার বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব কিংবা রুশ বিপ্লবÑতিনটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নয় বরং একই দীর্ঘ মানবিক অভিযাত্রার তিনটি অধ্যায়। তাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন, পথ ছিল ভিন্ন, পরিণতিও সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু তিনটিই মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ন্যায়বিচার সম্পর্কে মানবসভ্যতার দীর্ঘ সংলাপের অংশ।

এই বিপ্লবগুলোর সাফল্য বা ব্যর্থতার বিচার নয়, আমরা জানতে চাই, তারা মানুষকে কী শিখিয়েছে। তারা কী উত্তরাধিকার রেখে গেছে আমাদের জন্য। আরও বড় প্রশ্ন, তারা কি আজও আমাদের জন্য কোনো গুরুত্ব বহন করে, কোনো প্রশ্ন ঠেলে দেয় সামনে?

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার আসলে কোনো বিজয় নয়, কোনো পতাকা নয়, কোনো সংবিধানও নয়। সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হচ্ছে প্রশ্ন করার সাহস। মানুষ যখন প্রশ্ন করতে শেখে, তখনই সে নতুন পৃথিবীর কল্পনা করতে শেখে। প্রতিটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হয় প্রথমে মানুষের কল্পনায়, তারপরে ইতিহাসে।

ভাবনার ইতিহাসেরও একটি বংশলতিকা আছে। একটি ধারণা আরেকটি ধারণার জন্ম দেয়, একটি প্রজন্ম আরেক প্রজন্মকে প্রশ্নের উত্তরাধিকার দিয়ে যায়। কখনও একটি বই একটি বিপ্লবের জন্ম দেয়, আবার কখনও একটি বিপ্লব জন্ম দেয় নতুন বইয়ের।

ইউরোপের রেনেসাঁর যুগে জন লকের মতো দার্শনিকেরা মানুষের স্বাভাবিক অধিকার, শাসিতের সম্মতি এবং সীমিত রাষ্ট্রক্ষমতার যে বীজ বপন করেছিলেন, আমেরিকার বিপ্লবের মাধ্যমে তা সর্বপ্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের রূপ পায়। পৃথিবী দেখতে পায়, দর্শনের পাতায় যা স্বপ্নের বীজ হিসেবে ছিল তা বাস্তবের মাটিতে বৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই, আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিজয়টি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয়নি; অর্জিত হয়েছিল মানুষের কল্পনাশক্তিতে। মানুষ প্রথমবার গভীরভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করল, রাষ্ট্র মানুষের সৃষ্টি; ক্ষমতা ঈশ্বরপ্রদত্ত নয়, মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রকে বদলানো সম্ভব।

এই নতুন বিশ্বাসকে ভাষা দিয়েছিলেন থমাস পেইন। ইংল্যান্ডে জন্মে আমেরিকার স্বাধীনতার সংগ্রামের পক্ষে তিনি কলম ধরেন, পরে ফরাসি বিপ্লবের পক্ষেও অবস্থান নিয়ে প্রমাণ করেন, নিজেই তিনি ভাবনার অভিযাত্রার এক জীবন্ত প্রতীক।ডব যধাব রঃ রহ ড়ঁৎ ঢ়ড়বিৎ ঃড় নবমরহ ঃযব ড়িৎষফ ড়াবৎ ধমধরহ.”— “পৃথিবীকে নতুনভাবে শুরু করার ক্ষমতা আমাদের আছে।”—তিনি লেখেন। 

আড়াইশো বছর পার হয়ে যাবার পরেও মনে হয় এই তো সেদিন তিনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে এই কথা বললেন। আমাদের কথা, সমসাময়িক সময়ের দাবি। কিছু ভাবনা সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়ে যায়; কিছু ভাবনা সময়কে অতিক্রম করে আপন দীপ্তিতে জ্বলে।

আমেরিকার মুক্তি সংগ্রামের সময় বহু ফরাসি অফিসার এখানে যুদ্ধ করে, তারপরে দেশে ফিরে যায় স্বাধীনতার নতুন ভাষা নিয়ে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল লাফায়েত। তারা শুধু যুদ্ধ জিতে ফেরেনি; সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল একটি নতুন রাজনৈতিক কল্পনা। সেই সময়ের পৃথিবীতে রাজতন্ত্রকে ইতিহাসের অনিবার্য নিয়তি বলেই মনে করা হতো। আমেরিকা প্রথম দেখাল, ইতিহাসেরও বিকল্প আছে। মানুষের মনোজগতে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়, বাস্তবেও তার জন্ম হতে পারে।

কিন্তু ভাবনার অভিযাত্রা সেখানে থেমে থাকেনি। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে বহু রুশ তরুণ অফিসার ইউরোপকে স্বচক্ষে দেখতে পায়, তারপরে তারা যখন দেশে ফিরে আসে, রাশিয়ার দিকে তারা তাকায় সম্পূর্ণ অন্য দৃষ্টি দিয়ে। তারা চায় জারতন্ত্র স্বেচ্ছাচারিতার অবসান, আইনের শাসন, ভূমিদাসপ্রথার বিলুপ্তি এবং মানুষের মর্যাদা। সেই আকাক্সক্ষাই বিস্ফোরিত হয় ১৮২৫ সালের ডিসেম্ব্রিস্ট বিদ্রোহে, যা ব্যর্থ হয়েও রাশিয়ার চিন্তার ইতিহাসকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। এই বিদ্রোহের উত্তরাধিকার বহন করেন আলেক্সান্দর হার্ৎসেনের মতো একদল মননশীল মানুষ। হার্ৎসেন নির্বাসনে থেকেও রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর সংলাপ বন্ধ করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের স্বাধীনতা কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়; এটি বর্তমান মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। হার্ৎসেনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব পরে তাঁর বিরোধীরাও অস্বীকার করতে পারেননি। এমনকি লেনিনও তাঁর সম্পর্কে একটি স্মরণীয় মন্তব্য করেছিলেন— “ঞযব উবপবসনৎরংঃং ধধিশবহবফ ঐবৎুবহ. ঐবৎুবহ ধমরঃধঃরড়হ মধাব ৎরংব ঃড় ঃযব ৎবাড়ষঁঃরড়হধৎু ফবসড়পৎধঃং.” হ্যঁা, সত্য তাই, ডিসেম্ব্রিস্টরা হার্ৎসেনকে জাগিয়ে তুলেছিলেন; এবং তার জাগরণ জন্ম দিয়েছিল বিপ্লবী গণতন্ত্রীদের। তাঁর গুরুত্ব কোনো রাজনৈতিক মূল্যায়নে নয়; তাঁর গুরুত্ব ভাবনার উত্তরাধিকারে। 

একটি বিদ্রোহ ব্যর্থ হতে পারে, একটি প্রজন্ম পরাজিত হতে পারে, কিন্তু একটি ভাবনা যখন মানুষের মনোজগতে আশ্রয় পায়, তার যাত্রা থেমে থাকে না। তাঁদের প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মকে অস্ত্র নয়, প্রশ্ন করার উত্তরাধিকার দিয়ে যায়। 

দীর্ঘ বৌদ্ধিক অভিযাত্রার বহু বাঁক, বহু দ্বন্দ্ব, বহু আত্মসমালোচনা অতিক্রম করেই রাশিয়া পৌঁছায় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। সেই বিপ্লবের চরিত্র, লক্ষ্য পরিণতি ছিল ভিন্ন; কিন্তু মানুষের সমাজকে নতুনভাবে কল্পনা করার যে সুদীর্ঘ ইতিহাস, তার একটি উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল সেটিও।

তাই, ইতিহাসের গতিপথ অনেক সময় বদলে দিয়েছে সেই মানুষগুলো, যারা সীমান্ত অতিক্রম করেছিল সৈনিক হিসেবে, নির্বাসিত হিসেবে, পরিব্রাজক বা ট্রেডার হিসেবে; কিন্তু ফিরে এসেছে অন্য এক সম্ভাবনার সাক্ষী হয়ে। হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য এটাইÑবিপ্লব জাহাজে ভেসে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায় না। ঘোড়ার পিঠে চড়েও যাত্রা করে না। তা ভ্রমণ করে মানুষের স্মৃতিতে, অভিজ্ঞতায় এবং বিবেকে। নতুন সমাজের জন্ম হয় প্রথমে মানুষের কল্পনায়; ইতিহাস পরে শুধু তাকে অনুসরণ করে।

আমেরিকান, ফরাসি এবং রুশ বিপ্লবগুলো আসলে তিনটি ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল। আমেরিকান বিপ্লব প্রশ্ন করেছিলÑমানুষ কি নিজেই নিজের শাসক হতে পারে?

ফরাসি বিপ্লব প্রশ্ন করেছিলÑমানুষের জন্ম কি তার মর্যাদার সীমা নির্ধারণ করবে?

রুশ বিপ্লব প্রশ্ন করেছিলÑরাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ কী, যদি কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য, বৈষম্য শোষণের মধ্যে বেঁচে থাকে?

প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্নগুলো আলাদা মনে হয়। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজ আমরা জানি তারা আসলে একই ঘরের তিনটি দরজা।

একটি দরজার নাম স্বাধীনতা।

একটির নাম সাম্য।

আরেকটির নাম ন্যায়।

আগে ভাবা হতো এই তিনটি দরজা মানুষকে তিন দিকে নেয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত একই ঘরে গিয়ে খোলে। স্বাধীনতা ছাড়া সাম্য টেকে না। সাম্য ছাড়া স্বাধীনতা সবার হয় না। আর যেখানে ন্যায় নেই, সেখানে স্বাধীনতা সাম্যÑদুটোই মানুষের বিশ্বাস হারায়।

কিন্তু কঠিন প্রশ্নটি হলো: দরজাগুলো কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে খোলা

সংবিধান স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। আইন সাম্যের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে। রাষ্ট্র ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু তারা একা কোনো কিছু নিশ্চিত করতে পারে না। কারণ কাগজে লেখা অধিকার আর মানুষের জীবনে অর্জিত অধিকার এক জিনিস নয়।

আজ পৃথিবীর বেশিরভাগ, সম্ভবত সব দেশেই সংবিধান আছে, নির্বাচন আছে, আদালত আছে, আইন আছে। তবু মানুষ আজও বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান দারিদে্র্যর কারণে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, ক্ষমতার চোখ আজও টকটকে লাল। এবং পৃথিবীব্যাপী এই ক্ষমতাসীনরা যেমন, ঠিক তেমনি এই অবহেলিত নিগৃহীত নিপীড়িত জনগোষ্ঠী যেন একটি মিহি সূতো দিয়ে বাঁধা, তাদের ভাগ্য নির্ধারিত করে অদৃশ্য কোনো এক শক্তি, যে শক্তির ক্ষমতা ঈশ্বরের ক্ষমতাকে অতিক্রম করে গেছে বহু আগে। তারা প্রতিদিন নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে হাজির করে মানুষের সামনে, মানুষ হামলে পড়ে তাকে গ্রহণ করে, বুঝতেই পারে না এই আবিষ্কার হল তার শিকলের আর একটি বৃত্ত, তাকে আরো পোক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। 

সভ্যতার ইতিহাসে সংবিধান কখনও শেষ কথা নয়; সংবিধান প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, মানুষের বিবেকই হল শেষ কথা। সংবিধান দরজা নির্মাণ করতে পারে, আইন বসাতে পারে কপাট; কিন্তু সেই দরজা প্রতিদিন খুলে রাখার দায়িত্ব পালন করে নাগরিকের নৈতিক সাহস, সত্যের প্রতি আনুগত্য এবং অন্য মানুষের মর্যাদাকে স্বীকার করার ক্ষমতা। তা যদি না থাকে, সেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তাই, স্বাধীনতা, সাম্য ন্যায় কোনো অর্জিত সম্পদ নয়; এগুলো প্রতিটি প্রজন্মকে পুনঃ পুনঃ অর্জন করতে হয়।

তাই, একবার আমরা যে শিকলটি ভেঙে ছিলাম, একটি ধর্ম নিরপেক্ষ মানবিক সমাজ গঠনের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, তা বাস্তবায়িত হয়নি, দেখেছি শত্রু বাইরে নয়, শত্রু আমাদের মধ্যে, আমাদের ঘিরে, আমাদের মনোজগতে। যে ক্ষণজন্মা পুরুষ আজ সত্যপথ দেখায়, আগামীকাল ক্ষমতার মোহে সে অন্ধ হয় এবং সেই অন্ধত্বের চোখ খুলে দিতে সত্য উচ্চারণ করে যারা তাদের জীবন দিতে হয়। 

অথচ স্বাধীনতা, সাম্য ন্যায় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তারা একই মানবস্বপ্নের তিনটি রূপ। একটিকে বিসর্জন দিয়ে অন্য দুটিকে রক্ষা করা যায় না।

জার্মানআমেরিকান চিন্তাবিদ হান্না আরেন্ট সতর্ক করেছিলেন, সর্বগ্রাসী ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু মিথ্যা বলা নয়। তার চেয়েও ভয়ংকর হলো সত্য মিথ্যাকে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া, যাতে মানুষ আর তাদের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা কিংবা ইচ্ছাÑকোনোটাই ধরে রাখতে না পারে। তখন মানুষ আর সত্যের অনুসন্ধান করে না; সে শুধু পক্ষ বেছে নেয়। সেই মুহূর্ত থেকেই শোষণ সবচেয়ে নিরাপদ হয়ে ওঠে। কারণ যে সমাজ সত্যকে হারিয়ে ফেলে, সে সমাজ ধীরে ধীরে ন্যায়বিচারের ভাষাও হারিয়ে ফেলে। তখন এই প্রশ্নটি আর থাকে নাÑসত্য কী? ন্যায় কী? প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়ায়Ñক্ষমতা কার হাতে?

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট তথ্যের অভাব নয়; তথ্যের প্রাচুর্য। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ, মতামত, ছবি, ভিডিও ব্যাখ্যার মধ্যে ডুবে থাকি। কিন্তু এত শব্দের ভিড়ে অনেক সময় সত্যের কণ্ঠস্বর এত ক্ষীণ থাকে যে আমরা তাকে আর চিনতে পারি না। তার রূপ রস গন্ধ আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। মিথ্যা ঝলমল করে এবং আমরা তাকেই সত্য বলে গ্রহণ করি। ফলে, বর্তমান পৃথিবীতে আমরা জ্ঞানের সংকটে নয়, প্রজ্ঞার সংকটে আছি। 

ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই ক্ষমতা সত্যকে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু এখন সেই কাজটি আরও সহজ হয়েছে। প্রযুক্তি নিজে মানুষের শত্রু নয়; গণমাধ্যমও নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও নয়। সভ্যতার প্রতিটি অর্জনের মতো এগুলোর মধ্যেও দুটি সম্ভাবনা লুকিয়ে আছেÑএকটি মানুষকে উপকৃত আলোকিত করার, অন্যটি মানুষকে বিভ্রান্ত করার। এখানেই আসে মানুষের বিবেকের প্রশ্ন। সে কিভাবে তাদের ব্যবহার করবে। প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু সেই মুহূর্তটি, যখন মানুষ সত্যকে খুঁজে পাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সত্যের প্রতি আনুগত্য হারালে স্বাধীনতার অধিকারও একদিন অর্থহীন হয়ে যায়।

ইতিহাসের একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে। মানুষ যখন অন্য দেশ ভ্রমণ করে সে শুধু উপহার পণ্য নিয়ে দেশে ফেরে না; সঙ্গে করে নিয়ে ফেরে ভাবনা। আমেরিকা থেকে ফরাসি অফিসাররা ফিরেছিলেন স্বাধীনতার নতুন ভাষা নিয়ে। ইউরোপ থেকে রুশ অফিসাররা ফিরেছিলেন সাংবিধানিক শাসনের স্বপ্ন নিয়ে। আমরা যারা বিদেশে যাই, আমরা কী নিয়ে ফিরি?

শুধু ডিগ্রি?

শুধু অর্থ?

শুধু প্রযুক্তি?

নাকি এমন কিছু মূল্যবোধ, যা আমাদের সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, আরও সহমর্মী, আরও সত্যনিষ্ঠ করে তুলতে পারে?

আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো যে জিনিসটির, তাহলো নৈতিক সাহস। আমরা কি বিদেশ থেকে জবাবদিহির সংস্কৃতি নিয়ে ফিরছি? আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে ফিরছি? ভিন্নমতকে সহ্য করার শিক্ষা নিয়ে ফিরছি? মানুষের মর্যাদাকে মতবাদের ঊর্ধ্বে রাখার অভ্যাস নিয়ে ফিরছি?

ইতিহাসের একটি কঠিন শিক্ষাও ভুলে গেলে চলবে না। বিদেশ থেকে ফিরে আসা সব ভাবনাই কল্যাণ বয়ে আনে না। যে ধারণা মানুষকে মুক্ত করতে পারে, সেই ধারণাই কখনও মানুষকে বিভক্ত করার অস্ত্রও হয়ে উঠতে পারে। যে ভাষা স্বাধীনতার কথা বলে, সেই ভাষাই কখনও ঘৃণার স্লোগানে পরিণত হতে পারে। তাই প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে, আমরা কী নিয়ে ফিরছি; প্রশ্নটি আরও গভীরÑআমরা যা নিয়ে ফিরছি, তা কি মানুষের মর্যাদাকে আরও শক্তিশালী করছে, নাকি মানুষের উপর নতুন ধরনের শোষণকে আরও সুসংহত করছে?

হয়তো প্রতিটি প্রজন্মেরই একটি নীরব দায়িত্ব আছে। পৃথিবী দেখে ফিরে এসে নিজের দেশকে অন্য কারও প্রতিচ্ছবি বানানোর চেষ্টা না করে স্বদেশকে আরও সত্যনিষ্ঠ, আরও ন্যায়ভিত্তিক, আরও মানবিক করে তোলার। প্রকৃত ভ্রমণ তাই, যা নিজের দেশকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়।

আড়াইশো বছর আগে একদল মানুষ বিশ্বাস করেছিল, পৃথিবীকে নতুন করে শুরু করা যায়। সেই বিশ্বাসের সাহস থেকেই জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন রাষ্ট্র। তারপর সেই সাহস সমুদ্র পেরিয়েছিল, ভাষা বদলেছিল, রূপ বদলেছিল, কখনও আলোর মতো ছড়িয়েছিল, কখনও অন্ধকারের মধ্যেও হারিয়ে গিয়েছিল। সেই স্বপ্নের ইতিহাস নিখুঁত নয়। সেখানে গৌরব আছে, আবার গভীর ব্যর্থতাও আছে। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা আছে, আবার আদিবাসীদের নিপীড়ন দাসপ্রথার লজ্জাও আছে। সেখানে সাম্যের আহ্বান আছে, আবার রক্তাক্ত সন্ত্রাসও আছে। সেখানে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আছে, আবার মুক্তির নামেই নতুন শোষণের জন্মও আছে। মানুষ বারবার ব্যর্থ হলেও আবার নতুন করে শুরু করার চেষ্টাও আছে। 

থমাস পেইন পৃথিবীকে কেবল ভূগোলের মানচিত্রে দেখেননি; তিনি দেখেছিলেন একটি নৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে। তাঁর কাছে দেশপ্রেম মানবতার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না; বরং মানবতারই একটি সম্প্রসারণ। নিজের দেশকে ভালোবেসেও সমগ্র মানবজাতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকা যায়Ñএই বিশ্বাসই তাঁকে তাঁর সময়ের বহু মানুষের চেয়ে বড় করে তুলেছিল।

আমাদের প্রত্যেকের হাতেই সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার ছোট্ট একটি টুকরো অর্পিত হয়েছে। আমরা কী নিয়ে ফিরব? আরও বিভাজন, আরও ঘৃণা, আরও কৌশল? নাকি আরও সততা, আরও সহমর্মিতা, আরও নৈতিক সাহস?

ইতিহাসের শেষ প্রশ্নটি কোনো রাষ্ট্রকে নয়, আমাদের প্রত্যেকের নিজেকে করতে হবে।

আমরা কি মানুষকে আরও মানুষ হতে সাহায্য করেছি?

যদি তার উত্তরহ্যাঁহয়, তবে ভাবনার এই আড়াইশো বছরের অভিযাত্রা এখনও অর্থবহ। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো বিপ্লবই মানুষের চেয়ে বড় নয়। কোনো রাষ্ট্র, কোনো মতবাদ, কোনো প্রযুক্তি, কোনো ক্ষমতা মানুষের মর্যাদার ঊর্ধ্বে নয়। যতদিন মানুষ প্রশ্ন করবে, ততদিন ভাবনার অভিযাত্রাও চলবে।

ওকালা, ফ্লোরিডা

জুলাই , ২০২৬


Related Posts