চোখের তিন লক্ষণে বুঝে নিন ডায়াবেটিস হয়েছে কি না

কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদঃ ডায়াবেটিসের শুরুতেই রোগের লক্ষণ হিসেবে অনেকের ঝাপসা দৃষ্টি থাকতে পারে। টাইপ ডায়াবেটিসের সিকিভাগের বেশি রোগীর রোগ নির্ণয়ের সময় জটিলতা থাকে। এসব জটিলতার মধ্যে চোখের জটিলতা তথা রেটিনোপ্যাথি সবচেয়ে বেশি। ডায়াবেটিস বেড়ে গেলেও ঝাপসা দৃষ্টি তৈরি হতে পারে।

দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, সোজা রেখা বাঁকা দেখা, দৃষ্টিসীমানার ভেতরে কালো কালো দাগ দেখা, আকস্মিক অন্ধত্বএগুলো সব হতে পারে রেটিনার ব্যাধিতে। মাঝেমধ্যে দৃষ্টিশক্তির হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে রক্তে গ্লুকোজের তারতম্যের কারণে।

চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তর হচ্ছে রেটিনা।  ডায়াবেটিসের কারণে রেটিনার রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কখনও রেটিনায় ঘটে রক্তক্ষরণ। ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে রেটিনা বিচ্ছিন্ন পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় রেটিনা অক্ষিগোলকের জেলিসদৃশ পদার্থের ভেতর নতুন নতুন রক্তনালি তৈরি হতে থাকে। এসব গজিয়ে ওঠা নবীন রক্তনালি থাকে ভঙ্গুর। এখান থেকে হতে পারে রক্তক্ষরণ। এমনটি ঘটলে দৃষ্টিশক্তি চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ডায়াবেটিক রোগীদের অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ ছানি পড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের গ্লুকোমা বা চোখের চাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি।

ডায়াবেটিসের ধরন, সময়কাল, ব্যক্তির বয়স, গ্লুকোজের মাত্রা, উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে কোলেস্টেরল বা চর্বির উপস্থিতি রেটিনার ব্যাধি সৃষ্টির জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। চোখের জটিলতা কমাতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শরীরচর্চা, ওষুধ এবং প্রয়োজন বোধে ইনসুলিনের চিকিৎসা নিতে হবে। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে হবে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কেমন। প্রতিবছর অন্তত একবার চক্ষু চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়ে চোখের জটিলতা নির্ণয় করে চিকিৎসা নিতে হবে। টাইপ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস নির্ণিত হওয়ার পর প্রতিবছর চক্ষু পরীক্ষা করা জরুরি। টাইপ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের পাঁচ বছর পর থেকে প্রতিবছর এমনটি করতে হবে। ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

রেটিনার এসব রোগের জন্য বর্তমানে বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। একজন বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসক ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন। কখনও এর জন্য প্রয়োজন হতে পারে লেজারথেরাপি কিংবা কখনও চোখের ভেতরে ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। এসব নির্ভর করে রেটিনার অবস্থার ওপর।

ডায়াবেটিস হয়েছে কি না বুঝে নিন চোখের লক্ষণে

রক্তের শর্করার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার সমস্যাকে ডায়াবেটিস বলা হয়। এই রোগ শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।

মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত শরীরের সব অংশেই প্রভাব ফেলে ডায়াবেটিস। চোখেরও ক্ষতি করে এই রোগ। এমনকি ব্রেন স্ট্রোক থেকে পা বা পায়ের আঙ্গুল কেটে ফেলার মতোও মারাত্মক ঘটনাও ঘটে ডায়াবেটিসের প্রভাবে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস দ্বারা পরিচালিত এক মার্কিন সমীক্ষা অনুসারে, ডায়াবেটিস চোখের মারাত্মক ক্ষতি করে।

যা দুর্বল দৃষ্টি থেকে একসময় অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। কারণে প্রথম থেকেই ডায়াবেটিস রোগীর চোখের যত্ন নেওয়া আবশ্যক। ফলে অন্ধত্ববরণের আশঙ্কা কমবে।

তাই সময়মতো ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শনাক্ত চিকিৎসা করা না হলে ডায়াবেটিস রোগীর মারাত্মক বিপদ হতে পারে। এজন্য অবশ্যই নিয়মিত চোখ স্ক্রিনিং করাতে হবে।

বিষয়ে সিনিয়র রেটিনা কনসালট্যান্ট ডা. সিদ্ধার্থ সাইন জানান, ‘গবেষণা অনুসারে, বর্তমানে ভারত বিশ্ব ডায়াবেটিক রাজধানী।’ ‘শুধু ভারতেই নয় ডায়াবেটিস বিশ্বের নারীপুরুষদের মধ্যে একটি খুব সাধারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় না হলেও ডায়াবেটিসের কিছু লক্ষণ চোখেও প্রকাশ পায়।

কীভাবে ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ সনাক্ত করা যায় সে সম্পর্কে জানিয়ে ডা. সিদ্ধার্থ সাইন ব্যাখ্যা করেছেন, ‘প্রায়ই অস্পষ্ট দৃষ্টি বা ঝপসা দেখার সমস্যা ডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে।

ক্রমাগত এই সমস্যা বাড়তে থাকে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে আমাদের চোখের লেন্স শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর মতোই প্রচুর পরিমাণে তরল টেনে নেয়। যা আমাদের ফোকাস করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।তিনি আরও বলেন, ‘ডায়াবেটিসের কারণে আমাদের রেটিনায় নতুন রক্তনালী তৈরি হতে পারে। যদি নতুন রক্তনালীগুলো চোখের বাইরে তরলের স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে চোখের গোলায় চাপ তৈরি হতে পারে।

ফলে গ্লুকোমার কারণে অপটিক নার্ভের ক্ষতি হয়। কারণ রক্তে অত্যধিক চিনির কারণে ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো বাধাগ্রস্ত হয় রেটিনা তার রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

ছাড়াও কিছু উপসর্গ যেমনচোখের সামনে ভাসমান কালো দাগ দেখা বা অন্ধকারে কোনো রং চোখে ভেসে ওঠা ইত্যাদি লক্ষণ মোটেও সুবিধার নয়। এটি হতে পারে ডায়াবেটিসের লক্ষণ।

এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জোর দিয়ে জানান, ‘ ধরনের পরিবর্তনগুলো যদি চিকিত্সা ছাড়াই চলতে থাকে তাহলে রোগীর স্থায়ী অন্ধত্ব দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

মার্কিন সমীক্ষা অনুসারে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ চোখ সুস্থ রাখার সেরা উপায় হলোনিয়মিত রক্তের গ্লুকোজ, রক্তচাপ কোলেস্টেরল পরিমাপ করা নিয়ন্ত্রণে রাখা। ধূমপান ত্যাগ করা বছরে অন্তত একবার হলেও চোখ পরীক্ষা করা।

Related Posts