গভর্নর্স আইল্যান্ডে বাংলাদেশী শিল্পীদের || স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস উদযাপন

বিশেষ প্রতিবেদনঃ গোলাপি রং সাধারণত কোমলতা, ভালোবাসা আর ফুলের স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে্যর প্রতীক। অথচ স্তন ক্যানসার—সচেতনতার পরিসরে এই পরিচিত রং ধারণ করেছে ভিন্ন এক তাৎপর্য। এখানে গোলাপি মানে কেবল মমতা নয়, প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস; কেবল বেদনা নয়, সেই বেদনাকে সম্মিলিত সহমর্মিতায় রূপান্তরের প্রত্যয়; কেবল নীরবতা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উচ্চারিত অঙ্গীকার। গত শনিবার ১৭ অক্টোবর নিউইয়র্কের গভর্নরস আইল্যান্ডের ১৬ নোলান পার্কে এই বহুমাত্রিক অনুভূতিরই শিল্পিত প্রকাশ ঘটেছিল বাংলাদেশী—আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরাম আয়োজিত ‘আমরা করব জয়: স্তন ক্যানসার ও ক্যানসার—সচেতনতা—শিল্প ও সংলাপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই উন্মুক্ত আয়োজনে চিত্রশিল্পী, ক্যানসারজয়ী নারী, সংস্কৃতি কর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ মিলিত হয়েছিলেন অভিজ্ঞতা ও সহমর্মিতার এক অভিন্ন পরিসরে।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল শিল্পী ফারহানা ইয়াসমিনের শিল্প—উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। আলোচনার সুবিধার্থে তাঁর স্থাপনাশিল্পটিকে ‘গোলাপি প্রহর’ নামে অভিহিত করা যায়। নারীর ব্যক্তিগত অস্তিত্ব এই চিত্রে বৃহত্তর সামাজিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। 

শিল্পী জেবুন্নেসা হেলেনের স্থাপনাকর্মে কালো দেয়ালজুড়ে সাদা রেখার জটিল বিস্তার। ছোট ছোট গোলাপি ফিতা এবং ফুল ও জালের মতো রেখাবিন্যাসকে ঘিরে রয়েছে বৃহৎ গোলাপি কাপড়ের আবরণ।

শিল্পী কায়সার কামালের স্থাপনাকর্মে স্তন ক্যানসার—সচেতনতার পরিচিত গোলাপি ফিতা পেয়েছে স্থাপত্যিক বিশালতা। ‘বহুস্বরের ফিতা’ নামে আলোচ্য এই শিল্পকর্মে গোলাপি ও ফিরোজা রঙের অসংখ্য ছোট বর্গাকার কাগজের পটভূমিতে স্থাপিত হয়েছে একটি বৃহৎ কাপড়ের ফিতা।

কানিজ হুসনা আকবরীর দুটি চিত্রকর্মÑ ‘প্রত্যাশা’ এবং ‘বিসর্জন’Ñমানবদেহ ও অনুভূতির আরও অন্তরঙ্গ স্তর উন্মোচন করেছে। চিত্র দুটি কেবল হতাশা কিংবা আরোগ্যের সরল কাহিনী নয়; তাদের অর্থ নিহিত রয়েছে প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যবর্তী জটিল অনুভূতিতে।

শিল্পী তাজুল ইমামের মেঝেতে স্থাপিত শিল্পকর্মে রঙিন গাছের ডাল, গোলাকার আক্রান্ত স্তন এবং উজ্জ্বল গোলাপি কাপড়ের সম্মিলন লক্ষ্য করা যায়। ‘ভঙ্গুর পৃথিবী ঘিরে শাখাপ্রশাখা’ নামে আলোচ্য এই বিন্যাসের পরস্পরছেদী কাঠামো একই সঙ্গে বাধা ও সুরক্ষার সম্ভাব্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। 

তারিক জুলফিকারের ‘যত্নের বৃত্ত’ নামের স্থাপনাকর্মে শূন্যে ঝুলন্ত গাঢ় লাল কাপড়ের জরায়ুর অবয়বের নিচে লাল পাত্রগুলো সর্পিল বিন্যাসে সাজানো। তাদের পুনরাবৃত্তি শরীরের সঞ্চালন, আনুষ্ঠানিকতা এবং সম্মিলিত যত্নের ভাবনাকে উসকে দেয়।

শিল্পী মোহাম্মদ হাসান রোকনের স্থাপনাশিল্পে বৃহৎ গোলাপি ফিতাসদৃশ অবয়বের নিচে চিত্রিত হয়েছে মানুষের ঊর্ধ্বাঙ্গ। পাশে দৃশ্যমান বার্তায় স্তন ক্যানসার—সচেতনতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে।

চিত্রকর্মগুলোর প্রতীকী ব্যঞ্জনা আরও মানবিক গভীরতা পেয়েছে অনুষ্ঠানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পর্বে। স্তন ক্যানসারজয়ী সীমা সরকার তাঁর অসুস্থতা ও প্রতিকূলতা অতিক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কানিজ হুসনা আকবরীও নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তাঁদের বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্যানসার কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় নির্ধারিত একটি রোগ নয়; এর অভিঘাত বিস্তৃত হয় পরিবার, আত্মপরিচয়, দৈনন্দিন জীবন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের নিশ্চয়তার অনুভূতি পর্যন্ত।

অনুষ্ঠানে ড. জীবন বিশ্বাস ক্যানসার চিকিৎসার বিপুল ব্যয় এবং স্বাস্থ্য বীমার আওতা ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের গবেষণায় চিকিৎসাব্যয়, আয় হ্রাস এবং বীমার আওতার বাইরে থেকে যাওয়া খরচের কারণে ক্যানসার রোগী ও তাঁদের পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বীকৃত। এমনকি স্বাস্থ্য বীমা থাকা সত্ত্বেও অনেক রোগী গুরুতর আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হতে পারেন। ফলে ক্যানসার মোকাবিলার প্রশ্নটি শুধু চিকিৎসার নয়; ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও।

অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে প্রথমেই তাজুল ইমামের নেতৃত্বে পরিবেশিত হয় ‘আমরা করব জয়’। সংগে ছিলেন কায়সার—হেলেন দম্পতির দুই কন্যা। এরপর ড. জীবন বিশ্বাস পুরনো দিনের আধুনিক গান পরিবেশন করেন। সবশেষে মৃদুল আহমেদের সংগীত পরিবেশনা আয়োজনটিকে নতুন এক অনুভূতির স্তরে পৌঁছে দেয়। 

১৭ অক্টোবরের অনুষ্ঠানকে সমগ্র কর্মসূচির সমাপ্তি হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। এই আয়োজন ছিল গভর্নরস আইল্যান্ডে বাংলাদেশী—আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের বৃহত্তর শিল্প—আবাসিক কর্মসূচির অংশ। সমাপনী বক্তব্য রাখেন বিএএএফ—এর সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী এবং সভাপতি আর্থার আজাদ।

Related Posts