চিরশান্তির দেশে আমাদের তাসিন সেলিমা আশরাফ নিউইয়র্ক
চিত্রটি এ রকম ছিলঃ শ্যামা গীতিনৃত্যনাট্যের মহড়া চলছিল ১৯৯৩ সালে সানিসাইডের একটি বেসমেন্টে। সরাসরি গানের সাথে নাচের মঞ্চায়ন হবে। সেখানে নৃত্য পরিচালক এ্যানি ফেরদৌস, সাথে শ্যামার চরিত্রটিতেও তিনি নাচবেন। সঙ্গীতে শ্যামার চরিত্রে কন্ঠ দেব আমি। স্ট্রলারে করে শিশু তাসিন আর স্ট্রলার ধরে হাঁটা শিশু পুত্র ফাহিমকে নিয়ে আসতেন জাফর ভাই ও এ্যানি ভাবী। তিন—চার ঘন্টা রিহার্সেল চলতো। জাফর ভাই পুরোটা সময় দুটি শিশুকে সামলে রাখতেন। কখনো কোলে কখনো স্ট্রলারে নিয়ে বাচ্চাদের সামলাতেন। কিন্তু তাসিনকে কখনো কাঁদতে বা অস্থির হতে দেখিনি। ওর স্বভাবটি শিশু বয়স থেকেই এরকম। আজ সবাই এক বাক্যে বলে মিষ্টিভাষী একটি মেয়ে ছিল। কাউকে আহত করে কোনো কথা বলতো না। ওর ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুবই প্রিয় একটি শিক্ষক।
বিপার ক্লাসের সময় সবাই যখন উচ্চস্বরে কথা বলছে, ছুটোছুটি করছে, তাসিন তখন চুপচাপ এক কোনে বসে আছে। ছোট্ট তাসিন যখন ‘বুদ্ধভুতুমে’ ঢোল বাজিয়ে নাচছে বা ‘তাসের দেশে’ (বিপার প্রথম প্রযোজনা) সওদাগরের ভূমিকায় অভিনয় করছেÑ সে সব দেখে বোঝা যেত একদিন এই শিশুটিই ভবিষ্যতে বড় একজন নৃত্য শিল্পী হবে। ২০১১ সালে ‘চন্ডালিকা’তে প্রকৃতির ভূমিকায় এবং ২০১৭ সালে বিপার দ্বিতীয়বারের প্রযোজনা ‘তাসের দেশ’এ রাজপুত্রের ভূমিকায় অসাধারণ নৃত্যাভিনয় মনে রাখার মত।
তাসিনের ‘আরঙ্গেত্রম’ (মঞ্চে ভরতনাট্যমের শিক্ষার সর্বশেষ পরীক্ষা) দেখে আমি মুগ্ধ। ‘আরঙ্গেত্রম’ আমি অনেকেরই দেখেছি। কিন্তু তাসিনের পরিবেশনায় যে দক্ষতা ও যে আভিজাত্য ছিল সেটি আর কারোর মাঝেই দেখেনি। একদিন এই মেয়েটি বিপার নাম তথা বাংলাদেশের নাম বিশে^র বুকে ছড়িয়ে দিতে পারতো।
সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন নিয়ে তাসিন তার ভাবিষ্যত পরিকল্পনা করেছিল। তার পছন্দের পেশা শিক্ষকতা নিয়ে দু’দুবার মাস্টার্স করে সেই পেশাতেই কাজ করছিল। বিপাতেও ভরতনাট্যমের ক্লাসের অতি প্রিয় একজন শিক্ষক ছিল সে। একজন আদর্শ মা ছিল তাসিন। লুকাস—অন্ত প্রাণ। লুকাসকে ঘিরে তার ভাবিষ্যত সব পরিকল্পনা। লুকাস যে স্কুলে যাবে সেই স্কুলে সে কাজ করবে এমন তার পরিকল্পনা।
স্বপ্নের বাড়িতে মাত্র এক সপ্তাহ আগে এসে বাড়িঘর সাজাচ্ছিল। মঙ্গলবার গিয়েছিলাম সেখানে। সুন্দর বাড়ি। সবাই আছে শুধু যে সবচেয়ে খুশী হয়ে জড়িয়ে ধরে বলতো ‘হাই আন্টি, অনেক খুশী হয়েছি তুমি এসেছো’ সেই মায়াবতী মেয়েটি নেই এ কথাটি বলবার জন্য। মাকে বলেছিল ‘মা এবারের থ্যাঙ্কস গিভিংয়ে আন্টিদের সবাইকে আমার বাসায় ডাকবো’। এত যার স্বপ্ন সেই স্বপ্ন দেখার চোখটিই তো চিরতরে নিভে গেল বড্ড অসময়ে।
আমিও ভাবছিলাম যদি শরীর সঙ্গ দেয় তবে এবারের খ্রীস্টমাসের ছুটিতে আমাদের তিন কন্যার (তাসিন, অঙ্কন আর মাইশা) জামাইদের ডাকবো। এখন তো কেমন অপূর্ণতা রয়ে গেল!
তাসিনের এমন হঠাৎ চলে যাওয়া আমাদের বিপার ওপরে এক শোকের কালো ছায়া ফেলেছে। অনেক শিক্ষার্থীর মনে মানসিক ট্রমা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যে সব শিক্ষার্থী তাসিনের সরাসরি ছাত্রী ছিল। অভিভাবকরা আমাদের ফোন করে জানতে চায় এর প্রতিকার কি? আমাদের এখন এসব নিয়ে কাজ করতে হবে।
আমরা বিপাতে এ প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে তৈরি করার প্রচেষ্টায় কাজ করে চলেছি। তাসিন ছিল এ প্রজন্মকে প্রতিনিধিত্ব করবার যোগ্য উত্তরাধিকার। বিপার সাধারণ সম্পাদক তাসিন ফেরদৌস ধীরে ধীরে তার দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছিল। আমরা স্বপ্ন দেখছিলাম তাসিন, দৃষ্টি, তৃণা, মাইশা, শায়ান এর মত এ রকম আরো অনেক নতুন প্রজন্মের হাতে বিপার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে চোখ বুজবো! কিন্তু কোথা থেকে আচমকা এক তান্ডব আমাদের সে স্বপ্ন ভেঙে তছনছ করে দিল। ভাবতে কষ্ট হয় পৃথিবীর দূরদূরান্ত থেকে যখন সবাই আসে এদেশে সুচিকিৎসার জন্য, সেখানে তাসিন বিনা চিকিৎসায় অকালে ঝরে গেল! এর উত্তর জানা প্রয়োজন। একজন তাসিনকে আমরা হারিয়েছি। চাইনা আর কাউকে হারাতে।
আজ বিপার চরম শোকের দিন। নিউইয়র্কবাসীদের শোকের দিন। উত্তর আমেরিকা, কানাডা, বাংলাদেশসহ বিশে^র প্রতিটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া। বিপা হারিয়েছে তার রত্নতুল্য যোগ্য উত্তরাধিকার।
মা তাসিন, তোমার কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আমাদের বিপার আরো সন্তানেরা। তুমি চিরকাল বেঁচে থাকবে বিপার প্রতিটি কর্মকান্ডের মাঝে। সকল সংস্কৃতিপ্রেমীদের মাঝে তুমি বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।
আদরের তাসিন সকল ব্যথা বেদনার ঊর্ধ্বে ওপারে তুমি চিরশান্তিতে ঘুমাও।
‘মৃত্যু নাই নাই দুঃখ, আছে শুধু প্রাণ’।
