যা দেখেছি যা বুঝেছি—৩৩ || মনিরুল ইসলাম
স্ত্রীচরিত
সমাধান কি? সমাধান নেই, সমাধান খঁুজতে গেলে বরং জটিলতা বাড়বে, নতুন সমস্যা বের হয়ে আসবে। এসব নিয়েই বাঁচতে হবে। কারণ, পুরুষের নিজেরও অন্যরকম সমস্যা আছে যা কেবল নারীই জানে ও বোঝে। সমস্যা নিয়ে যারা বাঁচতে পারে না, তারাই একাকিত্বে ভোগে, উভয়েই। যেটুকু বুঝলাম, একটা বোকার জীবন অনেক সুখেরÑতাকে যে ঠকানো যায় সেজন্য নয়, সে জীবনকে সহজভাবে দেখে, সেই কারণে।
আপনি যে আপনাকে ভালোবাসেন, সেকথা নিজেকে বলার দরকার পড়ে? না, সেটা বলতে হয় না। তেমনি বউকে ভালোবাসাতে হয় না, বউ হয়ে যায় নিজের জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিজেকে যেমন ভালো না বাসলেও বেঁচে থাকতে হয়, বউকে ভালোবাসার কথা না বলেও তাকে নিয়ে জীবনধারণ করতে হয়। একটা স্বপ্নের কথা বলি: ভাত চাইলাম, দেবে না। তরকারিও নেই খাওয়ার। সে রাঁধতে যাবে না, বসে টিভি দেখছে। ওর খালাকে বললাম। ‘ঠিকই তো, অন্তত বাসি একটা তরকারি থাকলেও খেতে পারত।’
তীব্র রাগে ঘৃণায় বিতৃষ্ণায় চিৎকার করি সংসারের বিরুদ্ধে। ছাড়তে পারি না। বলি ছেড়ে দেব, চলে আসব, একা থাকবÑপারি না। টিকে যায়, রয়ে যায় বন্ধন। এর নাম সংসার। সংসার ছাড়া যায় না, কাটা যায় না, ত্যাগ করা যায় না। জীবন যেমন নিরন্তর সংগ্রামে নিষ্পেষিত নির্যাতিত হয়েও তাকে বিসর্জন দেয়া যায় না, সংসারকেও না। এমনকি প্রেম স্নেহ আসক্তি শখ বিসর্জন দেয়া যায়, সংসার নয়। তবে মজার ব্যাপার হল, এই ‘বাধ্যবাধকতার’ মধ্যে একটা ভাল দিক আছে। পশ্চিমাদের ন্যায় ইচ্ছামতো যখন তখন সঙ্গী—সঙ্গিনী পরিবর্তন করলেই সুখ পাওয়া যায় না। পরিবর্তনে সুখ নেই। সুখ আছে সহ্যশক্তিতে, মানিয়ে চলার মধ্যে। মিল যেমন স্বাভাবিক, অমিলও। ‘ভাল—মন্দে মিলে আমরা সবাই’Ñএই সত্য গ্রহণের মধ্যে। সম্পর্কের আসল সৌন্দর্য একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নিহিত।
সংসারে অধিকাংশ দম্পতিই একে অন্যকে নিয়ে অসুখী, তবু অন্যের সামনে সুখের ভান করে। সমাজ, সন্তান, সুস্থিতির খাতিরে তারা একঘরে থাকতে বাধ্য হয়। দাম্পত্য কলহ হবে না যদি আপনি শুধু শুনে যাবেন, ‘হঁ্যা’ বলতে থাকবেন, কোনো মতামত দেবেন না। দশকের পর দশক আছি একসাথে, মনের মিল হয় না। বন্ধুত্ব সহমর্মিতা এখনো সেই প্রথম দিককার মতোইÑপান থেকে চুন খসলে গর্জে ওঠে মুখ। বাসায় ফ্রুটস নেই, একথাটা ভাল করে বলা যায়। ‘ভাল’ করে যে বলেনি, সেটা বললে তো আগুন ধরে যাবে তার গায়ে।
পৃথিবীর সব মানুষ একই, নর—নারী সর্বত্র অভিন্ন স্বভাবেরÑকিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে। তাহলে কি যে—কাউকে আমি জীবনসঙ্গী করে সংসারে সুখী হতে পারব? না। দরকার কমন—ফ্যাক্টর। দুজনের মধ্যে যতবেশি কমন—ফ্যাক্টর থাকবে, ততবেশি অ্যাডজাস্ট/সুসংহত হবে, সুবিধা হবে সংসার রণাঙ্গণে ফাইট করতে একত্রে। খাদ্যাভ্যাস, ধর্ম, ভাষা, আর্থ—সামাজিক পটভূমি সমপর্যায়ের হলে সহাবস্থান অধিকতর শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী হবে। বাঁশিহাতে রাখাল রাজকন্যাকে বিয়ে করে উঠাল পর্ণকুটিরে অথবা রাজপুত্র ভিখিরি—বিধবার অসূর্যস্পর্শা কমলাকে প্রাসাদে নিয়ে ‘হ্যাপি এভার আফটার’Ñঅবাস্তব, ভুল, কল্পনা। আসলে গ্রামীণ—শহুরে বা দেশী—বিদেশী মেলে না, জোর করে তেল—পানি এক সাথে রাখার মতো। তাহলে প্রেম বলে কিছু নেই? না। প্রেম হল ‘সঙ্গদোষ’ নামক মানসিক রোগ, যার মেয়াদ বিয়ের রাতে শেষ হয়ে যায়, রোগী আরোগ্যলাভ করে!
সংসারে আহাম্মক স্বামী ‘মহৎ’ হতে চায়। কিন্তু কোনো বুদ্ধিমতী স্ত্রী ‘মহীয়সী’ হবার বাসনা পোষণ করে না। পুরুষকে গালমন্দ করলে, নারীকে সর্বজয়া বললে আপনি মহাপুরুষ। যে উপন্যাসে নায়িকার দুঃখ বিড়ম্বনা ত্যাগ স্বীকার যতবেশি করুণভাবে ফুটে উঠবে, সে উপন্যাস ততবেশি কালোত্তীর্ণ, সেই মহান লেখক পুরস্কার পাবে নির্ঘাত। নারীনির্যাতন নিয়ে চলচ্চিত্র সেমিনার গবেষণা হয়, পুরুষনির্যাতন নিয়ে একলাইন লিখলে তা হাস্যকর, অবিশ্বাস্য, মুখরোচক মনে হয়। পশ্চিমা সমাজেও wifey material বলতে বোঝায় বিশ্বাসী সৎ প্রেমময় যত্নশীল আদর্শ স্ত্রীর গুণাবলী। অর্থাৎ স্ত্রী মানেই পতিপ্রাণা সর্বংসহা আত্মত্যাগী মহামানবী। সংসারের সব গুণ, পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য থাকে প্রেমিকার মধ্যে কিন্তু স্ত্রীর মধ্যে কী কতটুকু অবশিষ্ট থাকে গবেষণা করলে মজাই হত।
রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ—এর নায়িকা বধূদের সাথে নিজ স্ত্রীর তুলনা করে ওই লেখকদের গালি দিতে ইচ্ছা করে। যত্তসব অসার অবাস্তব কাল্পনিক কাহিনী লিখে মানুষের মন ভোলায়, বাহবা কুড়ায়। জীবনানন্দের স্ত্রীও নাকি ছিলেন খিটখিটে বদরাগী, অথচ তিনিই লিখলেন ‘বনলতা সেন’! নারী, বিশেষত স্ত্রীচরিত্রের প্রকৃত অবস্থার বাস্তবসম্মত বর্ণনা দিয়ে একটা কাব্য—উপন্যাস খঁুজে পাই না দেশে—বিদেশে। কারণ কি? তটস্থ লেখকরা কি তাদের স্ত্রীর ভয়ে এসব প্রকাশ করতে পারেন না, নাকি ‘মহান’ সেজে ‘মহৎ’ কাহিনী লিখে অমর হওয়ার বাসনায় মশগুল থাকেন?
পৃথিবীর ‘মা’য়েরা এত ভালো হয়, বউয়েরা কেন হয় না? সন্তানের সাথে রক্তের সম্পর্ক, স্বামীর সাথে সামাজিকতার। আফ্রিকায় তাই মেয়েরা স্বামীর চেয়ে ভাই—বোনদের সাথে সম্পর্ক রাখে নিবিড়, কারণ স্বামী যে কোনো সময় বদলাতে পারে, ভাইবোন কখনোই নয়।
স্বামীর প্রতি স্ত্রীদের এই নির্যাতনের কথা—কাহিনী যে কেউ লেখেননি তা নয়, করুণভাবে অনেকেই লিখেছেন কিন্তু তা ভাত পায়নি। পুরুষের অত্যাচার যত নিন্দিত চর্চিত সমালোচিত হয়, নারীর বেলায় তা হাস্য—রসে পর্যবসিত হয়। যেমন ‘মহৎ’ ব্যক্তির মন্দগুণ আলোড়িত হয়, অসৎ ব্যক্তির অন্যায় নিয়ে কেউ তেমন মাতে না। পুরুষ অত্যাচারিত হলে সে হয় অপদার্থ কাপুরুষ, নারী অত্যাচারিত হলে তিনি হন মহীয়সী। কী আর করা।
আগের যুগের উপন্যাস পড়ে কতদিন চোখের জল ফেলেছি নায়িকা—বধূদের কষ্টের পর কষ্ট দেখে। আজ কাঁদি পাঠক হিসাবে নয়, স্বামী হিসাবে! আজকের যুগে স্বামী না হয়ে একজন ‘সার্থক’ স্ত্রী হলে জীবনটা মন্দ হত না। যাক, এই সবকিছু নিয়ে যিনি আজীবন ‘এক’ নারীর সাথে সংসার করে যেতে পারেন, তিনিই ‘যোগ্য’ পুরুষ। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কঠোর দীর্ঘতম পরীক্ষার নাম স্ত্রী—সন্তান সমভিব্যাহারে ‘সংসার’। সংসার সাধনাই বড় সাধনা, সংসারধর্মে উত্তীর্ণ পুরুষ স্বর্গের দাবি করতে পারেন।
