ওয়াশিংটনের সংবাদ সম্মেলন এবং শেখ হাসিনার ভাষণ || আনিস আহমেদ

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহু ভাষণ ও বক্তব্যের সঙ্গে আমরা সকলেই কম বেশি পরিচিত। তবে গত ১৯ অক্টোবর মূলত বিদেশী সাংবাদিকদের উদ্দেশে ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অন—লাইনে দেওয়া ভাষণ তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। সেই ভাষণে তিনি আবারও বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে তাঁর ইস্পাত দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করেন। তিনি শত সহস্র বিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে তাঁর নিজ জন্মভূমির মাটি স্পর্শ করবেন বলে যে প্রতিজ্ঞা আগেও ব্যক্ত করেছিলেন এবং বার বার করছেন, সেই প্রত্যয়ই তিনি পুনর্ব্যক্ত করলেন ওয়াশিংটনের এই সম্মেলনে। তবে তিনি যে প্রধানমন্ত্রীর পদ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশে যেতে চাইছেন তা নয়, এবারকার বক্তব্যে শেখ হাসিনা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি ওয়াশিংটন ডিসিকে এমন এক রাষ্ট্রের রাজধানী বলে উল্লেখ করেন যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে। তিনি সরাসরি আমেরিকান জনগণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং যারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন তাদের উদ্দেশে তাঁকে কিছু বলার সুযোগ দেয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানান। লক্ষ্যণীয় যে শেখ হাসিনা তাঁর এই ভাষণে দলীয় বিষয়টির চাইতে অনেক বেশি জোর দিয়েছেন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ওপরে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনি ক্ষমতার বাইরে থেকে কথা বলছেন, কেবল মাত্র একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেই নয় বরঞ্চ তাঁর দেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একজন আজীবন সেবিকা হিসেবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাস বিরোধিতা, জলবায়ু ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও মানুষের নিরাপত্তার মতো অভিন্ন মূল্যবোধ ও স্বার্থের গভীর বন্ধনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পৃক্ত। অতএব বাংলাদেশে যা ঘটছে তা যে কেবল তার জনগণের বিষয় তাই—ই নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও ভাবিয়ে তুলতে পারে। 

তিনি বেশ পরিষ্কারভাবেই বলেন যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ অবলম্বন করুক, সেটা তিনি চাইছেন না। তিনি বলেন, তিনি কেবল এটুকুই চান যে বিশ্বব্যাপী যে গণতান্ত্রিক নীতিমালা তুলে ধরা হয়, বাংলাদেশকে যেন সেই নীতিমালার মাধ্যমে বিচার করা হয়। আর সেই গণতান্ত্রিক নীতিমালার মধ্যে রয়েছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সংবিধান অনুযায়ী দেশ শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদিতা এবং আইন অনুযায়ী সকলের সমান সুরক্ষা। তিনি স্বীকার করেন যে রাজনৈতিক ভিন্নমত পোষণ খুব স্বাভাবিক বিষয় এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এর প্রয়োজনও রয়েছে। সরকারকে জবাবদিহিমূলক হতেই হবে। তবে ভিন্নমত পোষণের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কিংবা কোটি কোটি লোকের মুখ বন্ধ করে দেওয়া কোনো অজুহাত হতে পারে না। শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে গণতন্ত্রের কিছু মূল কথা, বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত কিছু আবশ্যিক ও তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন। তারপরই তিনি যৌক্তিক ধারাবাহিকতায় উল্লেখ করেন যে আওয়ামী লীগের যারা সমর্থক তারা তো বাংলাদেশেরই নাগরিক, তাদেরকে রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া যায় না। আর ঠিক তেমনি যারা তাঁর সরকারের বিরোধিতা করে তারাও বাংলাদেশের নাগরিক, তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। বাংলাদেশের রাজনীতির নির্মিতিতে থাকতে হবে সমঝোতা, প্রতিশোধ নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ যেখানে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, ধর্ম, লিঙ্গ ভেদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা অঞ্চল—ভেদ নির্বিশেষে সকল নাগরিক দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নিতে পারেন। 

তিনি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। এ পর্বে তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল একজন বিচক্ষণ কূটনীতিকের মতো দক্ষতা, তেমনি ছিল দৃঢ়চেতা মনোভাবও। শেখ হাসিনা বলেন, দায়িত্বের প্রশ্ন উঠলে বলা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ এশিয়ায় তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে; না বাংলাদেশকে কারা শাসন করবে সেটা নির্ধারণ করার জন্য নয় বরঞ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়গুলি তুলে ধরার জন্য। তিনি তাঁর ভাষণে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন, যখন তিনি বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আমাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে, ‘এর মূল জায়গাটি হবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা’। এই প্রসঙ্গটিকে আমি তাৎপর্যপূর্ণ বললাম এ জন্য যে ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ট্রাম্প কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক অতটা মসৃণ না হলেও এই সম্পর্ককে লালন করতে হবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে। একদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীরতর সম্পর্কের আশা ব্যক্ত করেছেন, অন্যদিকে তিনি একথাও বলেছেন যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তার সহযোগী সকল পক্ষ, তা হোক যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান কিংবা ইউরোপÑসকলের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক রাখতে হবে। তিনি ২০২৪ সালের ঘটনার কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করে বলেন যে তাঁর সরকার সম্পর্কে ইতিহাসের মূল্যায়ন যাই হোক না কেন, ইতিহাস এটাও স্বীকার করবে যে লক্ষণযোগ্য পরিবর্তন তাঁর সরকার এনেছিলো দেশে। ওয়াশিংটনকে এই ভাষণে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন তাহলো বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেখানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। 

যুক্তরাষ্ট্র যে গণতন্ত্রের কথা বলে বার বার, মুক্ত গণতন্ত্রের আদর্শের প্রতি এই দেশটির যে নিবেদন গত আড়াইশ’ বছর ধরে সেই আদর্শ যাতে অন্য দেশেও প্রতিষ্ঠিত হয়, সে কথাই বার বার তুলে ধরেছেন শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে। এই ভাষণে তিনি তাঁর সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতির পক্ষে কোনো সাফাই গাননি তিনি আগামী দিনের বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছেন সুষ্ঠু গণতন্ত্রের আদর্শ অনুসারি রাষ্ট্র হিসেবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র যে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করেও যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়টিকে সমুন্নত রাখতে পারে। তিনি ২০২৪ পরবর্তী সরকারগুলির সমালোচনা না করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র স্থবির হয়ে পড়েছে। সেখানে গণতন্ত্রকে সক্রিয় ও সচল করতে হলে প্রয়োজন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তবে শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেননি আর সেটি হলো বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান। অনুমান করছি তিনি মূলত গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে আলোকপাতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আর সেই দিকটি তিনি দারুণ বিচক্ষণতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। এইভাবে তিনি দেশকে যতবার তুলে ধরবেন, ততবারই বাংলাদেশের সংকট মোচন সহজতর হবে। 


Related Posts