ভ্রমণ গদ্য—৭ পাঠকের সাথে লেখকের সাক্ষাৎ || শাহাব আহমেদ
ক্ষণজন্মা চলচ্চিত্রকার তারকোভস্কি ক্ষমতার লালচোখকে খুব একটা ভয় করতেন না।
বিদেশে ছবি করতে গিয়ে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে ইতালিতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, তিনি আর সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরবেন না। দেশে তাঁর চলচ্চিত্র দেখানো বন্ধ হয়ে যায়, সংবাদমাধ্যমে তাঁর নাম উচ্চারণও উহ্য হয়। তাঁর ছোট ছেলেকে দীর্ঘদিন বিদেশে বাবার কাছে আসার অনুমতিও দেওয়া হয়নি।
একজন শিল্পীর নিজের দেশে ফেরার অধিকার কেড়ে নেওয়ার নৈতিক অধিকার কোনো সরকারের আছে?
তারকোভস্কি আর জীবিত অবস্থায় নিজের দেশে ফিরতে পারেননি।
ক্যান্সার তাঁকে এনে শুইয়ে দিয়েছে এই ফরাসি মাটিতে।
হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব—পরবর্তী প্রথম সাময়িক সরকারের প্রধান প্রিন্স গিওর্গি ইয়েভগেনিয়েভিচ লভভ ও তাঁর আত্মীয়স্বজনের কবর।
দেশহীন নির্বাসিত জীবনে খুব বেশি দিন কাটাতে হয়নি। ১৯২৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
অবশেষে আমরা ইভান বুনিনের কবরের কাছে পৌঁছাই।
প্রেমের গল্পের অসাধারণ রূপকার একটি সাধারণ কবরে শুয়ে আছেন।
দেশকে ভালোবাসতেন।
কিন্তু বলশেভিক বিপ্লব মেনে নিতে পারেননি।
মস্কো ছেড়ে প্রথমে ওডেসায় চলে যান। গৃহযুদ্ধের ঢেউ সেখানেও এসে পৌঁছালে ১৯২০ সালে জাহাজে চড়ে রাশিয়া ছেড়ে আসেন।
দেশ ছেড়েছিলেন।
দেশকে ভালোবাসা ছাড়তে পারেননি।
আমরা সাদা চোখে দেখি।
আদর্শ, বিশ্বাস আর প্রপাগান্ডায় অন্ধ হয়ে সাদামাটা বিভাজন করি।
কাউকে শত্রু, কাউকে মিত্রের তকমা এঁকে দিই।
অথচ জীবনটা জটিল।
এর বর্ণাভা অনেক।
ফিরতে ফিরতে প্রায় অপরাহ্ন হয়ে যায়।
মন্টমার্ট্র আমাদের শেষ গন্তব্য।
অনেক উঁচু পাহাড়ের ওপরে উঠি ফুনিকুলারে।
আজ পর্যটকের ঢল, কিন্তু একসময় মন্টমার্ট্র ছিল প্যারিসের প্রান্তের প্রায় গ্রামসদৃশ একটি এলাকা। উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুতে সস্তা থাকার জায়গা, ক্যাফে, কাবারে আর স্বাধীন জীবনের টানে এখানে এসে জড়ো হয়েছিল শিল্পী, কবি, ভবঘুরেরা।
ভ্যান গঘ থেকেছেন এখানে।
রেনোয়া, ত্যুলুজ—লোত্রেক, মদিলিয়ানি, পিকাসোÑকত নাম!
পিকাসো তাঁর যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বছর কাটিয়েছেন এই পাহাড়ে। বাতো—লাভোয়ারের সস্তা স্টুডিওগুলোতে তখন শিল্পী আর কবিরা এমন সব ছবি ও ধারণা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল, যেগুলো পরে আধুনিক শিল্পের ভাষাই বদলে দিয়েছে।
এখন সেই বোহেমিয়ানদের জায়গায় টুরিস্ট।
স্যুভেনিরের দোকান।
ইতিহাস বদলায়।
ব্যবসা থাকে।
পাহাড়ের মাথায় বিশাল সাক্রে—ক্যর গির্জা।
এটিও মধ্যযুগের নয়, দেখতে যত পুরনো মনে হয়। উনিশ শতকের শেষ ভাগে এর নির্মাণ শুরুÑফ্রান্সের পরাজয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের রক্তাক্ত সময়ের পরের সেই অশান্ত ফ্রান্সে।
১৮৭৫ সালে প্রথম পাথর বসে।
তৈরি হতে লাগে কয়েক দশক।
১৯১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র করা হয়।
একদিকে প্যারিসের বিপ্লবী পাহাড়।
অন্যদিকে তার মাথায় সাদা গির্জা।
ইতিহাস কখনও কখনও পাশাপাশি এমন সব প্রতীক দাঁড় করিয়ে রাখে, যেন মানুষকে ইচ্ছে করেই বিভ্রান্ত করতে চায়।
গির্জায় ঢুকি।
বসি।
ওখান থেকে প্যারিসের দৃশ্য দুর্দান্ত।
অনেক টুরিস্ট।
অনেক বাংলাদেশী হকার।
কেউ জল বেচে, কেউ স্যুভেনির, কেউ তালা।
এখানে—সেখানে প্রেমিক—প্রেমিকারা ছোট ছোট তালা ঝুলিয়ে দেয়।
একটা কিনব নাকি?
শ্বেতাকে জিজ্ঞেস করি।
সে বলে, চল্লিশ বছর তো তালা ছাড়াই কাটল। বাকিটাও কাটবে, তোমার কী মনে হয়?
দিন শেষ।
ক্লান্ত।
ক্ষুধা পেয়েছে।
বাঙালিদের জিজ্ঞেস করি, ভাই, এখানে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট আছে নাকি?
“গার দ্য নর যান। ওটা বাঙালি পাড়া।”
চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করি কনফার্ম হওয়ার জন্য।
সে দু—তিনটি রেস্টুরেন্টের নাম দেয়। তবে ঝঁষঃধহ কধপপযর ইরৎুধহর রিকমেন্ড করে। ঠিকানাও দেয়।
পাহাড় থেকে নেমে উবার নিই।
রেস্টুরেন্টটি পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন।
বাঙালি রেস্টুরেন্টের দুর্বলতম স্থান বাথরুম।
এখানে ইজ্জত রক্ষা হয়েছে।
এক ভদ্রলোক হাসিমুখে মেনু এগিয়ে দেন।
কথায় কথায় নাম জিজ্ঞেস করি।
দেলোয়ার হোসেন জন।
বাড়ি লক্ষ¥ীপুর।
খাবার অর্ডার দিই।
কিন্তু নামটা মাথায় ঘুরছে।
দেলোয়ার হোসেন জন।
আমার ভাইয়ের নামের সঙ্গে শুধু ‘জন’টুকুর পার্থক্য।
কোথায় যেন..
২০১৮—১৯ সালে যখন নিয়মিত ফেবুতে লিখতাম, প্যারিস থেকে আমার একজন পাঠক প্রায় প্রতিটি লেখায় মন্তব্য করতেন। মেসেঞ্জারে যোগাযোগও হয়েছে কয়েকবার। দেশ থেকে আমার তিনটি বই আনিয়েছিলেন।
ফেবু পেজ খুললাম।
মেসেঞ্জার খুললাম।
ছবিটা দেখলাম।
এই সেই জন।
এত পথ ঘুরে, এত মানুষ, এত কবর, এত ইতিহাস, এত প্রশ্ন পার হয়ে প্যারিসের একটি বাঙালি রেস্টুরেন্টে এসে হঠাৎ নিজের একজন পুরনো পাঠককে খুঁজে পেলাম।
পাঠকের সঙ্গে লেখকের এমন কাকতালীয় দেখা হয়ে যাওয়ার মধ্যে কী যে এক অদ্ভুত শান্তি আছে।
আগস্ট ২৭, ২০২৬
প্যারিস থেকে নিউইয়র্কের পথে প্লেনে।
