‘জীবনের দাবি আজ এতই বিরাট’ || খায়রুল আনোয়ার
দেশের অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক—আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকের ফাঁকে অর্থমন্ত্রী যখন ঋণ পাওয়ার জন্য দেন—দরবার করছেন, তখন হয়তো অনেক তরুণ বা যুবক একটি কাজ পাওয়ার আশায় রাশিয়া—ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে অথবা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মরণের সীমানায় পৌঁছে গেছেন। এ মৃত্যুর মিছিল যেন শেষ হওয়ার নয়। সেই একই কাহিনি, যার কোনো শেষ নেই। দেশে হন্যে হয়ে একটি চাকরি বা কাজ জোটানোর প্রাণান্তর চেষ্টা। ব্যর্থ হয়ে নিরুপায় অবস্থায় জমি বিক্রি ও ধার করা টাকা মানব পাচারকারীর হাতে তুলে দেওয়া। পরে সেই পরিবারের কাছে ভূমধ্যসাগরে ডুবে সন্তান বা স্বামীর মৃত্যুর খবর আসে। সম্প্রতি রাশিয়ার যুদ্ধে প্রতিপক্ষের শিকার হয়ে অনেক বাংলাদেশী তরুণ—যুবক প্রাণ হারাচ্ছেন।
এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে, সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তের একটি বিখ্যাত কবিতার দুটি পঙ্ক্তি ‘মৃত্যুর জানাজা মোরা কিছুতেই করিব না পাঠ, কবরেরও ঘুম ভাঙে জীবনের দাবি আজ এতই বিরাট’। সন্তোষ গুপ্ত ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, সফিকসহ অনেকেই শহীদ হওয়ার পর দিন দৈনিক আজাদে তার লেখা এই কবিতা দিয়ে ব্যানার হেডলাইন করেছিলেন। এ কবিতার পঙ্ক্তি ‘জীবনের দাবি আজ এতই বিরাট’ এখানেও প্রাসঙ্গিক। দেশের ভেতরে অসংখ্য তরুণ চাকরি বা কাজ জোটাতে না পারায় তাদের কাছে জীবনের দাবি এতই বড় হয়ে দেখা দেয় যে, তারা বিদেশে পাড়ি জমানোর পথ বেছে নেন। অনেক তরুণ, যুবক দেশে ছোটোখাটো চাকরি বা কাজ করলেও সংসারের অনটন মেটাতে, সচ্ছলতা আনতে বিদেশে যাওয়ার হাতছানির ফাঁদে পড়েন।
এদেরই একজন রাশিয়ার যুদ্ধের ময়দান থেকে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা ঝিনাইদহের রাজন হোসেন (২২)। ইউক্রেন বাহিনীর ড্রোন হামলায় কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। ডান পায়েও চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ক্র্যাচে ভর করে এখন তার চলাফেরা। পত্রিকার খবর: রাজন জানান, বাংলাদেশ থেকে গত ৮ মে ৩০ জনের একটি টিম রাশিয়ায় যায়। বাংলাদেশী যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজন বড় স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়া যান, তাদের ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। জমি বিক্রি, বন্ধক, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার টাকা জোগাড় করে রাজনের পরিবার। যে প্রতিষ্ঠানে তাদের কাজ দেওয়ার কথা ছিল, সেই নামে সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। এটি রাশিয়ায় যাওয়ার পর জানতে পারেন। পরে ইউক্রেনের যে অংশ রাশিয়া দখল করেছে, সে ধরনের একটি এলাকায় নিয়ে রাজন হোসেনসহ ৩০ জনকে একটি বাংকারে রাখা হয়। তাদের ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশী ৩০ জনের দলকে তিনটি ভাগে ভাগ করে যুদ্ধের ময়দানে নেওয়া হয়। ড্রোন হামলায় রাজনদের দলের ২০ জন মারা গেছেন। এক দিনেই মারা গেছেন ১৭ জন। ড্রোনের আঘাতে গুরুতর অবস্থায় চারদিনে বুকে ভর দিয়ে চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের অংশে তাদের ক্যাম্পে পৌঁছান। পরে আরেকটি হাসপাতালে তাকে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার সময় রাশিয়ান এক ডাক্তার তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান। রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাদের পাসপোর্ট নিয়ে যায় রিক্রুটিং এজেন্সির লোকজন। এ কারণে রাশিয়া থেকে তাকে ট্রাভেল ভিসা নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। রাজন হোসেনকে নিয়ে সাহাদাত হোসেন পরশের লেখা এই বিশেষ রিপোর্টটি গত ১৫ অক্টোবর সমকালের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে।
ড্রোন হামলায় পঙ্গু হয়ে যাওয়ার রাজন হোসেনের কাহিনি শেষ ঘটনা নয়। একই তারিখে সমকালের পাঁচের পাতায় তিন কলাম শিরোনাম হয়েছে, ‘ইতালির নামে লিবিয়া নিয়ে নির্যাতন, টাকায়ও মেলে না মুক্তি’। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ফুলসুতি ইউনিয়নের মিজানুর রহমান (৪০)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালি পাঠানোর নামে তাকে লিবিয়া নিয়ে মাসের পর মাস নির্যাতন চালায় মানবপাচারকারী চক্র। এখান থেকে বেঁচে দেশে ফিরে আসতে তিন দফায় পরিবারকে দিতে হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। জমি বিক্রি এবং ঋণ করে এই পরিমাণ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মিজানের পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে একই জেলার ভাঙা উপজেলার হাবিব মাতুব্বর (৪০) নামে এক যুবক মারা যান। ১৪ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে নির্যাতিত ও নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে অংশ নিতে আসা হাবিব মাতুব্বরের স্ত্রী তাসলিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা দিতে না পারায় আমার স্বামীকে মুরাদ (পাচারকারী) মাইর্যা ফেলছে। স্বামীর এক শতাংশ জমি ছিল, সেই জমিও বিক্রি করে দিছি। বর্তমানে তিন সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেছি।’ ওই মানববন্ধনে তার উপর চালানো নির্যাতন ও মুক্তিপণের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিজান। এই প্রতিবেদনের তথ্য মতে, মাফিয়া চক্রের ফাঁদে নিঃস্ব ফরিদপুরের ১৫ পরিবার। হত্যা করা হয়েছে একজনকে, নিখোঁজ কয়েকজন।
স্বাধীনতার পর সত্তর ও আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার এক ধরনের হিড়িক পড়ে যায়। অনেক বছর এই হিড়িক চলতে থাকে। তখন টেলিভিশন নাটকে ‘টাকা দাও, দুবাই যামু’— এমন সংলাপও শোনা যেত। তবে সে সময় ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা অথবা এখনকার মতো কাজের জন্য যাওয়া যুবকের যুদ্ধের ময়দানে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। শুধু তরুণ—যুবক নয়, টিকে থাকার সংগ্রামে অনেক নারী গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরব যান। সৌদিতে নারী গৃহকর্মীদের খাবার না দেওয়া, বেতন আটকে রাখার পাশাপাশি শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনে অনেক নারী মারা যান। ডেইলি স্টারের এক বিশেষ প্রতিবেদনের তথ্যে বলা হয়েছে, আট বছরে ৭৯৯ নারী অভিবাসীর মরদেহ বাংলাদেশে এসেছে। এর বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সৌদি আরবে।
সরকার যায়, সরকার আসে। রাজন হোসেন, মিজানুর রহমান, তাসলিমা বেগমদের দুঃখের অবসান আর হয় না। রাজধানীতে বসে মেগা মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়। উন্নয়ন হয়, উন্নয়ন নিয়ে অনেক গল্পও তৈরি হয়। রাজনীতির কথামালা তৈরি হয়, কথা আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ঝরে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও সামাজিক বৈষম্যের অবসান হয়নি। বরং দিন দিন বৈষম্য আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। সরকারি ও বেসরকারি নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে চাকরির বাজারে মাথা ঠুকে চলছে লাখ লাখ তরুণ। বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কলেজ পৌঁছাতে না পারা তরুণের সংখ্যা হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। যেখানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও লাখ লাখ তরুণ চাকরি পাচ্ছেন না, সেখানে এরা চাকরি পাবেন কোথায়? দেশি বিনিয়োগ স্থবির, বিদেশি বিনিয়োগ আসার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে, বাস্তবের তার দেখা মিলছে না। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আছে।
একটি মাত্র উদাহরণ থেকেই চাকরির বাজারের শোচনীয় অবস্থা স্পষ্টভাবেও ফুটে উঠবে। সম্প্রতি সরকারি একটি চাকরির জন্য প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে দশ হাজারের বেশি প্রার্থী এক ধরনের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সরকারি উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষায় ২৪২টি পদের বিপরীতে তিন লাখেরও বেশি প্রার্থী আবেদন করেন। যদিও এই পরীক্ষা নিয়ে মহা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ অক্টোবর পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে বসেন, প্রশ্নপত্র বিতরণ শেষ। হঠাৎ ঘোষণা করা হলো, পরীক্ষায় স্থগিত। কারণ হিসেবে বলা হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। এরকম একটি ঘটনায় চাকরি প্রার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের মানসিক অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। তবে এ পরীক্ষা পরে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ফলও প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আইএমএফের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও বিরাটসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের বাইরে থাকছেন।
বিএনপি নির্বাচনের আগে পাঁচ বছরের মেয়াদে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নির্বাচনি ইশতেহারে। সেই হিসেবে প্রতি বছর ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ৮ মাস অতিক্রম করেছে। এই ৮ মাসে সরকার কয় লাখ তরুণ যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছে, তার একটি হিসাব সরকারের প্রকাশ করা উচিত। লেখার শুরুতে দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিতে ব্যাংককে অর্থমন্ত্রীর চেষ্টা—তদবিরের কথা বলা হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর বলেছে, আইএমএফের কাছ থেকে আগামী ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে চায় বাংলাদেশ। ডিসেম্বরের মধ্যে এই ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিরাট অঙ্কের ঋণ রাজন হোসেন, মিজানুর রহমানের মতো অসংখ্য তরুণ যুবকের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে? সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর মৃত্যুর ঘটনা কি বন্ধ হবে? কর্মসংস্থানের সুযোগ কি বাড়বে? ক্রমাগত বেড়ে চলা সামাজিক বৈষম্য কি আদৌ কমবে?
