গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— বত্রিশ শূন্যের মাঝারে বৈরাগ্যের সুর মরমি সাধক হাছন রাজা

ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলার মরমি গানে এমন কিছু চিত্রকল্প আছে, যা একটি মাত্র পংক্তিতেই জীবনের সমস্ত নিশ্চয়তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। হাছন রাজার সেই প্রশ্নÑএই শূন্যতার মধ্যে স্থায়ী ঘর বানাব কেন? তেমনই এক চিত্রকল্প। প্রশ্নটির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর বৈপরীত্য। জমি, অর্থ, সামাজিক প্রতিপত্তি, বাড়িঘর, জমিদারি সমাজের প্রায় সমস্ত সুবিধাই তাঁর নাগালে ছিল, অথচ যে গান তাঁকে সাংস্কৃতিক স্মৃতির অমর অংশ করে রেখেছে, সেসব গান বারবার ভেঙে দিয়েছে মালিকানার ধারণাটিকেই। ঘর হয়ে ওঠে সাময়িক আশ্রয়, দেহ হয়ে ওঠে পিঞ্জিরা, ধনসম্পদ হয়ে ওঠে মায়া, এমনকি ‘আমি’ নামের আত্মপরিচয়ও পরম সত্তার সামনে থাকে টলায়মান। এই অধিকার থেকে অনাসক্তির যাত্রাই হাছন রাজাকে বাংলা লোক ও ভক্তিমূলক সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী মরমি কবি, গীতিকার ও আধ্যাত্মিক কণ্ঠে পরিণত করেছে। দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী, যিনি হাছন রাজা নামেই সর্বাধিক পরিচিত, জন্মেছিলেন ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর, সুরমা নদীর তীরবর্তী সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীতে। আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক সূত্রমতে তাঁর মৃত্যু ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর। জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া হাছন অল্প বয়সেই পারিবারিক মৃত্যুবিয়োগের পর বিস্তৃত সম্পত্তি ও দায়িত্বের ভার গ্রহণ করেন।

আত্মজিজ্ঞাসা

তাঁর জীবনকে সহজ একটি নীতিকথায় নামিয়ে আনা খুব লোভনীয়Ñবিলাসী জমিদার একদিন হঠাৎ জেগে উঠে সাধক হয়ে গেলেন। কিন্তু ইতিহাসের ছবি সম্ভবত এর চেয়ে অনেক ধীর, জটিল এবং আকর্ষণীয়। তাঁর প্রথম জীবনের বিবরণে ঘোড়া, পাখি, নৌকা, ভ্রমণ, বিলাসিতা ও প্রেমাসক্তির কথা আছে; একই সঙ্গে আছে দরিদ্র প্রজা ও অসহায় মানুষের প্রতি উদারতার স্মৃতিও। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বস্তুগত সম্পদের ওপর তাঁর আস্থা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। পোশাক—আশাক অনেকটাই সাধারণ হয়ে আসে, স্থায়ী মালিকানার ধারণা সন্দেহের মুখে পড়ে। কিন্তু মৃত্যু, আত্মসত্তা ও ঐশী প্রেম হয়ে ওঠে তাঁর ভাবনার কেন্দ্র। ফলে এই পরিবর্তনকে আকস্মিক ধর্মীয় রূপান্তর না ভেবে বরং গভীর এক আত্মজিজ্ঞাসা হিসেবে দেখা অধিক যথার্থ, যেখানে প্রশ্ন ছিলÑ দেহ, ঘর, জমিদারি সবই যখন ক্ষণস্থায়ী, তখন মানুষ আসলে কীসের মালিক?

এই আত্মজিজ্ঞাসার স্বাভাবিক ভাষা হয়ে উঠেছিল সিলেটের আঞ্চলিক কথন। হাছন রাজা তাঁর গানকে অভিজাত সাহিত্যিক বাংলার দিকে ঘষেমেজে নিয়ে যাননি। বরং আঞ্চলিক শব্দ, ক্রিয়াপদ, পুনরুক্তি, সরাসরি সম্বোধন এবং নিজের নামের পুনঃপুনঃ ব্যবহারেই তৈরি হয়েছে তাঁর স্বরভঙ্গির মৌলিকতা। তাঁর গান দীর্ঘদিন মৌখিক পরম্পরায় বেঁচেছে। বিভিন্ন বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং সহচর বা জমিদারির কর্মচারীরা কখনো তা লিখে রাখতেন। এই মৌখিক উৎসই একদিকে পাঠভেদের কারণ, অন্যদিকে তাঁর গানের অসাধারণ প্রাণবন্ততারও উৎস। দর্শন এখানে বিমূর্ত তত্ত্ব নয়; তা কখনো নিজের সঙ্গে কথা, কখনো প্রেমিকের সঙ্গে, কখনো আল্লাহর সঙ্গে, কখনো কানাইয়ের সঙ্গে, কখনো দেহ বা মৃত্যুর সঙ্গে—আবার কখনো রহস্যময় ‘বন্ধু’র সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপ।

অধ্যাত্ববাদের বহুমুখিতা

তাঁর আধ্যাত্মিক জগৎকে কোনো একক পরিচয়ে আটকে রাখা কঠিন। ইসলামী শব্দভাণ্ডার তাঁর গানে মৌলিকÑআল্লাহ, মওলা, ফানা, ইবাদত, আত্মসমর্পণ এবং স্রষ্টার কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা বারবার ফিরে আসে। আবার একই কাব্যভুবনে আছে কৃষ্ণ, রাধা, কানাই এবং বৈষ্ণব প্রেমভাবের নানা প্রতীক। ফলে গবেষকরা হাছন রাজাকে বৃহত্তর সিলেটি মরমি সংস্কৃতির পরিসরে দেখেছেনÑযেখানে সুফি ভাব, বৈষ্ণব ভক্তি ও লোকঐতিহ্য বহুদিন ধরে পরস্পরের সান্নিধ্যে ছিল। তাঁকে কেবল ‘সুফি’, ‘বাউল’ বা ‘বৈষ্ণব’ বলে একক ঘরে বসানো তাই যথার্থ নয়। তাঁর দৌহিত্র দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফও এমন সরলীকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। শিল্পগত সত্যটি বরং এইÑবিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীক ও ভাষাকে ব্যবহার করে হাছন রাজা একটিই গভীর আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছেন, আর হা হচ্ছে, অহংকে বিলীন করে পরম প্রিয়ের সঙ্গে মিলনের বাসনা।

এই কারণেই তাঁর গানে ‘আমি’ শব্দটি কখনো আত্মস্বীকৃতি, কখনো আত্মসংশয়, কখনো আবার আত্মবিলোপের দরজা। কোথাও মানুষ স্রষ্টার সামনে অসহায়; কোথাও আত্মা ও পরম সত্তার ব্যবধান প্রায় মিলিয়ে যায়; কোথাও আবার ‘আমিত্ব’ ত্যাগ করাই মুক্তির পূর্বশর্ত। প্রভাতকুমার শর্মা তাঁর গানকে প্রেম, বৈরাগ্য ও পরম উপলব্ধির তিন প্রবণতায় ভাগ করেছিলেন। এই বিভাগ সহায়ক, কিন্তু কঠোর নয়, কারণ হাছন রাজার গানে প্রেম এক মুহূর্তেই দর্শনে রূপ নেয়, দর্শন হয়ে ওঠে আকুলতা, আকুলতা দেহের জ্বালা হয়ে ওঠে, আর মৃত্যু উন্মোচন করে জাগতিক অহংকারের অসারতা।
তাঁর দুটি বিখ্যাত চিত্রকল্পে এই দর্শন আশ্চর্যভাবে ধরা পড়ে। ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে’ গানে দেহ যেন মাটির খাঁচা, যার ভেতরে প্রাণপাখি অস্থির। আর ‘লোকে বলে, বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা না আমার’Ñএ বাড়িঘরই অনিত্যতার যুক্তিতে পরিণত হয়, কতদিন থাকা হবে তা—ই যখন জানা নেই, তবে স্থায়ী অট্টালিকার অহংকার কেন? এগুলো নিছক দারিদে্র্যর গান নয়, বিচিত্র স্বভাবের জমিদারের আত্মকথাও নয়। পিঞ্জিরা, ঘর, আয়না, পাকা চুলÑসাধারণ বস্তুগুলো তাঁর হাতে মৃত্যুচিন্তার দার্শনিক উপকরণে পরিণত হয়েছে।

সুরমা নদী, হাওর, জমিদারির পথ, নৌকা এবং বিস্তৃত গ্রামীণ নির্জনতাও তাঁর কল্পনার অবিচ্ছেদ্য উপাদান। কিন্তু এই ভূদৃশ্য কেবল দৃশ্যসৌন্দর্য নয়। নদী হয়ে ওঠে যাত্রা, নৌকা জীবনের অনিশ্চিত বাহন, ঘর দেহের প্রতীক, পাখি আত্মার রূপক, আগুন প্রেমের দহন। উত্তর—পূর্ব বাংলার দৃশ্যমান জগত এভাবেই তাঁর গানে এক আধ্যাত্মিক ব্যাকরণে রূপান্তরিত হয়। সম্ভবত এই কারণেই তাঁর দর্শন সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনিÑপ্রশ্নগুলো মহাজাগতিক, কিন্তু প্রতীকগুলো ছিল দৈনন্দিন জীবনের চেনা জিনিস।

প্রকাশনার তথ্য

হাছন রাজার জীবদ্দশায় ১৯১৪ সালে ২১০টি গানের সংকলন হাছন উদাস প্রকাশিত হয়। পরবতীর্তে বিভিন্ন সংগ্রহ, পাণ্ডুলিপি ও মৌখিক স্মৃতি তাঁর পরিচিত রচনাসম্ভারকে আরও বিস্তৃত করে। মৃত্যুর পর তাঁর ভাবজগৎ নতুন বৌদ্ধিক মর্যাদা লাভ করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনায়। ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম ওহফরধহ চযরষড়ংড়ঢ়যরপধষ ঈড়হমৎবংং—এর সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ হাছন রাজার গান ব্যবহার করেন ব্যক্তি ও বিশ্বের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে। পরে তিনি সেই ভাবনাকে আরও বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যান ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ গ্রন্থে, যার মূল অংশ গড়ে উঠেছিল ১৯৩০ সালের মে মাসে অক্সফোর্ডের গধহপযবংঃবৎ ঈড়ষষবমব—এ প্রদত্ত ঐরননবৎঃ বক্তৃতামালা থেকে। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। রবীন্দ্রনাথের আগ্রহের জায়গাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণÑসিলেটের আঞ্চলিক ভাষায়, লোকমুখে ঘুরে বেড়ানো একটি গানও যে ‘মানুষের ভেতরের শাশ্বত পুরুষ’—সম্পর্কে গভীর দার্শনিক বোধ ধারণ করতে পারে, তিনি সেটিই লক্ষ্য করেছিলেন গভীর আগ্রহে। 

হাছন রাজার ২৫টি স্মরণীয় গান

১। লোকে বলে, বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা না আমার, ২। মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে, ৩। আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, ৪। সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল, ৫। আমি যাইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে, ৬। একদিন তোর হইবে মরণ রে হাছন রাজা, ৭। মরণ কথা স্মরণ হইল না হাছন রাজা তোর, ৮। বাউলা কে বানাইলো রে হাছন রাজারে, ৯। নেশা লাগিল রে, বাঁকা দু’নয়নে নেশা লাগিল রে, ১০। আগুন লাগাইয়া দিল কোনে হাছন রাজার মনে, ১১। প্রেমের আগুন লাগল রে হাছন রাজার অঙ্গে, ১২। হাছন রাজায় কয়, আমি কিছু নয় রে, ১৩। রঙ্গিলা বাড়ৈ এই ঘর বানাইয়াছে কলে, ১৪। দেখা দেও দেখা দেও বন্ধুরে ভুবনমোহন, ১৫। মরণ কালেরে কে যাইবে তোর সঙ্গে, ১৬। ছাড়িলাম হাছনের নাও রে, ১৭। বাড়ৈ, কই লুকাইলায় রে, ১৮। প্রেমানলে হাছন রাজা জ্বলিল, ১৯। আমি তোমার কাঙালী গো সুন্দরী রাধা, ২০। বন্ধে কেন আমায় ভালবাসে না, ২১। গুড্ডি উড়াইল মোরে, মওলার হাতে ডুরি, ২২। হাছন রাজা রে কয়দিন, কয়দিন তোর আর বাকি, ২৩। কলে হাসে কলে মাতে, কলে করে কারখানা, ২৪। বিচার করি চাইয়া দেখি সকলেই আমি, ২৫। হাছন রাজায় বলে ও আল্লা, ঠেকাইলায় ভবের জঞ্জালে

পরিশেষ

হাছন রাজার গুরুত্ব এই নয় যে এক ধনী জমিদার শেষ বয়সে বিলাসিতা ছেড়েছিলেন, তাহলে তাতে তাঁর জীবন খুব সহজ একটি নীতিকথা হয়ে যেত। তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব হলো, জীবনের সেই বৈপরীত্যকেই তিনি গানে রূপ দিয়েছিলেন। সম্পদের অর্থ তিনি জানতেন বলেই অনিত্যতার গান তাঁর কণ্ঠে শুধুমাত্র উপদেশ হয়ে ওঠেনি। দেহের ভোগ তিনি চিনেছিলেন বলেই পরে দেহকে মাটির পিঞ্জিরা বলতে পেরেছেন। বাড়িঘর ও জমিদারির মালিক ছিলেন বলেই একদিন প্রশ্ন করতে পেরেছেন, শূন্যের মাঝারে ঘরই বা বানাব কী করে? তাঁর সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার তাই কোনো মতবাদের নাম নয় বরং আত্মজিজ্ঞাসার এক ভাষা। সেই ভাষায় আল্লাহর পাশে কানাই আসতে পারেন, আত্মা হয়ে উঠতে পারে পাখি, দেহ ঘর, প্রেম আগুন, মৃত্যু আয়না। শেষ পর্যন্ত সংসারের কাছেও থেকে যায় হাছন রাজার সেই অনিবার্য প্রশ্নÑযা কিছু ‘আমার’ বলে ধরে রাখা, একদিন যদি সবই ছেড়ে যেতে হয়, তবে যে ‘আমি’ থেকে যায়, সে আসলে কে, আর তার প্রকৃত অধিকারিই বা কে?

Related Posts