নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে ভোট দিন
দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী ভোটার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। সেই সময় অর্থাৎ নির্বাচনের আগে বছরজুড়ে ইসরাইল বেপরোয়া হয়ে গাজাকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছিল। তখন গাজায় নির্বিচারে শিশু, বৃদ্ধ, নারী, বিকলাঙ্গসহ সব মানুষকে হত্যা করা হয়। হাসপাতালে, এপার্টমেন্ট বিল্ডিংএ, স্কুলে এমন কি আশ্রয় শিবিরেও বোমা বর্ষণ করা হয়। আর সেই আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। তিনি এই হত্যাকান্ডে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিলেন ইসরাইলকে। বাংলাদেশী ভোটাররা কি ভেবেছিলেন, তারা যাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে তিনি এই হত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন? হয়ত তাই ভেবেছিলেন। নইলে একবার পরীক্ষিত ব্যক্তিকে ভোট দেবে কেন? অবশেষে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে ঘোষণা দিলেন দখলকৃত মাটিতে মিশে যাওয়া গাজায় তিনি এপার্টমেন্ট বানাবেন। অর্থাৎ ব্যবসা করবেন। তিনি বলেছিলেন, ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিনি রাশিয়াকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম। তার পরিবর্তে তিনি ইরান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন ইসরাইলকে সাথে নিয়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার অর্থনীতিতে লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা গেল। এই দুই স্ফীতি রোধ করতে ব্যর্থ হলো সরকার।
তার আগে, দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি চীন ও ইয়োরোপীয় দেশসহ ভারত, বাংলাদেশের মত দেশের পণ্যের ওপর বিপুল ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক ঝড় তুললেন যে তাতে ব্যবসায়ীদের মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা। শেষে দেখা গেল এই শুল্ককে তিনি নতুন অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে প্রায় সব দেশের ওপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেছেন। কিন্তু তিনি ভুলেই গেলেন, যেসব দেশ আমেরিকা থেকে তাদের পণ্য আমদানি করে তারাও বসে থাকবে না। ফলে সব দায় গিয়ে পড়ল আমেরিকার (সেই সাথে অন্য দেশেরও) ক্রেতা—ভোক্তাদের ওপর।
গত দুই বছরে ইমিগ্রেশন এবং অর্থনীতি আমেরিকার গায়ে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তা মেরামত করতে কতদিন লাগবে, সে বিষয়ে কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। অর্থনীতিবিদরাও নয়। এইসব দেখে এদেশের সাধারণ জনগণ, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজসমীক্ষক সকলেই যখন স্তম্ভিত এবং প্রায় হতবাক তখন গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত ধেয়ে আসছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মত মানুষের প্রতিপক্ষ একটি ভয়াবহ শক্তি। এই শক্তির আবিষ্কারক মানুষই। কিন্তু এই শক্তি প্রকৃতপক্ষে ফ্রাংকেনস্টাইনের প্রতিরূপ। লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন বেকারত্বের আশংকায় যেমন যবুথবু তেমনই লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী গ্রাজুয়েশন শেষে কাজ না পাওয়ার আশংকায় জর্জরিত।
আজ আমেরিকা যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, তা এদেশের মূল বাসিন্দারা বুঝতে পারছেন। বাংলাদেশী ইমিগ্রান্টরা তো বটেই। সে কারণে রাস্তায় নেমে এসেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তারা ‘নো কিংস’ নামে দিবস উদযাপন করছে। এরা যে সকলেই ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক তা নয়। বরং বেশির ভাগই অরাজনৈতিক ব্যক্তি। এদের মধ্যে অধিকাংশই লিবারেল। এরা তরুণ—তরুণী এবং প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ। তারা আগেও দেশের সংকটকালে রাস্তায় নেমে এসেছেন। কারণ তারা রাস্তায় আন্দোলন করে এ দেশের সরকারের পতন ঘটানোর পক্ষে নয়। এদেশ গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সামনে মধ্যবতীর্ নির্বাচন। এই নির্বাচনে হাউজের ৪৩৫ জন সদস্যেরই নির্বাচন হবে। অনেকেই পুনর্নির্বাচন করবেন। আর সিনেটের ১০০টি আসনের (প্রতিটি স্টেটের দুটি করে) ৩৩টি আসনে নির্বাচন হবে ৩ নভেম্বর। এছাড়াও ৩৬টি স্টেটের গভর্নর নির্বাচন হবে।
রয়টার্স জানাচ্ছে সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান জনগণের সমর্থন সবনিম্ন পর্যায়ে অর্থাৎ মাত্র ৩১% এসে নেমেছে। পক্ষান্তরে কংগ্রেসের হাউজে ডেমোক্রেটদের পক্ষে নিশ্চিত রয়েছে ১৯৬ আসন, আর রিপাবলিকানদের পক্ষে নিশ্চিত ১৫৯ আসন। ডেমোক্রেটদের পক্ষে সম্ভাব্য আসন ৯টি, আর হেলে আছে (কিছুটা সম্ভাব্য) ২০টি আসন। অপরপক্ষে রিপাবলিকানদের পক্ষে সম্ভাব্য আসন ৩৫টি আর হেলে আছে ৬টি। দুই দলের যে কোনো দল পেতে পারে ১০টি আসন (টস আপ)। এদিকে সিনেটে ডেমোক্রেটদের ৩৪টি আসনে নির্বাচন হবে না। তবে যেসব আসনে নির্বাচন হবে সেখানে ৯টি আসনে নিশ্চিত জিতবে বলে জরিপে উঠে এসেছে। জয়ের সম্ভাবনা আছে ৩ আসনে। হেলে আছে ৩ আসনে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদেন ৩১টি আসনে কোনো নির্বাচন হবে না। যে কটি আসনে নির্বাচন হবে তার মধ্যে ১১টি আসনে নিশ্চিত জিতবে বলে জরিপে উঠে এসেছে। ৪টি আসনে সম্ভাবনা আছে জয়ের আর ১টি আসনে রিপাবলিকানদের প্রতি হেলে আছে। ৪টি আসনে সমান সমান সম্ভাবনা। হিসাব নিকাশ করলে সিনেটেও ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিনেট এবং হাউজ অর্থাৎ পুরো কংগ্রেসে যদি ডেমোক্রেটরা তাদের নিয়ন্ত্রণ পায় তাহলে প্রেসিডেন্টের অধিকাংশ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রেসিডেন্টকে জবাবদিহিতায় আসতে হতে পারে। যদিও তিনিও কংগ্রেসের পাশ হওয়া বিলে চাইলে ভেটো দিতে পারবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে রয়েছে অপর উইং সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের অধিকাংশ বিচারপতি রক্ষণশীল ঘরানার। তারা ইচ্ছা করলেই প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু সে সম্ভাবনা কম। সবচেয়ে বড় কথা এখনকার মত পটাস যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না।
সব কিছু নির্ভর করবে আমেরিকান ভোটারদের ওপর। আমেরিকান ভোটাররাও ভুল করে। তারা প্রথমবার ভুল করে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার সংশোধন করে নেয়। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে যায়। গত দুই বছর তার প্রমাণ। গত দুই বছরে আমেরিকার অর্থনীতিতে, শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং সামাজিক অবস্থায় যে পরিবর্তন ঘটেছে তার পরিণাম আমেরিকার জনগণ বুঝতে পারবে আরো দশ বছর পরে, যদি এখনই সচেতন হয়। না হলে যে সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করবে তা হবে অভাবনীয়।
এই লেখা পড়বেন বাংলাদেশীরা। আশা করি তারা এবার ভোটের আগে আমাদের নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেবেন। কাকে ভোট দেবেন সেটা একান্তই তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু তারা যেন ভোট দেন। ভোট দেয়া থেকে বিরত না থাকেন। পারলে আগাম ভোট দেন। ভোট দেয়া সকলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
