উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—৩০ || ড. আনিস রহমান

জনস্বাস্থ্য ও রিমোট ডায়াগনস্টিকস: চিকিৎসকের অভাব পূরণে এআই ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ হিসেবে একটি উচ্চতর বিশ্লেষণ

মাতৃস্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন সেবায় পোর্টেবল এআই আল্ট্রাসাউন্ড

মাতৃস্বাস্থ্য বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ভ্রম্নণের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য আল্ট্রাসাউন্ড অত্যন্ত জরুরি হলেও দক্ষ সোনোগ্রাফারের অভাবে গ্রামীণ নারীরা এই সেবা থেকে বঞ্চিত হন। এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এশিয়ায় পোর্টেবল এআই—চালিত আল্ট্রাসাউন্ড ডিভাইস প্রবর্তিত হয়েছে। মার্কিন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সো ইমেজিং (Exo Imaging) এর এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তিটি স্মার্টফোনের সাথে সংযুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে এবং এআই নির্দেশিত ইমেজিংয়ের মাধ্যমে একজন নার্স বা মিডওয়াইফকেও বিশেষজ্ঞের মতো স্ক্যান করতে সহায়তা করে।

এই এআই—চালিত ডিভাইসটি গর্ভবতী নারীর গর্ভে ভ্রম্নণের অবস্থান, হৃদস্পন্দন এবং অ্যামনিওটিক তরলের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিমাপ করতে পারে। এটি কেবল মাতৃস্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং থাইরয়েড সমস্যা, স্তন ক্যানসার এবং হৃদরোগের প্রাথমিক ঝুঁকি শনাক্তকরণেও সমান কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে মায়েদের প্রসবকালীন সেবার মান নিরূপণে মেশিন লার্নিং মডেলগুলো ৮১.৩ শতাংশ নির্ভুলতার সাথে কাজ করতে পারে। এই মডেলগুলো মায়েদের বসবাসের ধরন, শিক্ষা এবং পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য তথ্যের সমন্বয়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো শনাক্ত করতে সাহায্য করে, যা নীতিনির্ধারকদের সম্পদ বরাদ্দে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। এআই—এর এই রিমোট ইন্টারভেনশন সরাসরি মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে অবদান রাখছে।   

চর্মরোগ নির্ণয়ে এআই স্কিন স্ক্যান

চর্মরোগ বা স্কিন ডিজিজ বাংলাদেশের একটি সাধারণ সমস্যা হলেও দক্ষ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এআই এখানে স্কিন স্ক্যান বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তৈরি করা মডেলগুলো ত্বকের ছবির মাধ্যমে ক্যানসার বা অন্যান্য জটিল সংক্রমণ শনাক্ত করতে পারে। একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে, এআই মডেলগুলো বিভিন্ন জাতির মানুষের ত্বকের রঙের বৈচিত্র্য বিবেচনা করে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুলতায় ত্বকের ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম। এটি সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়াই দ্রুত রোগের গুরুত্ব বোঝার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ ও খরচ কমায়।   

স্থানীয় উদ্ভাবন: সিএমইডি হেলথ এবং অমরডক্টর

বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবক এবং উদ্যোক্তারাও এআই—কে জনস্বাস্থ্যের মূল ধারায় নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এর মধ্যে সিএমইডি হেলথ (ঈগঊউ ঐবধষঃয) এবং অমরডক্টর (অসধৎউড়পঃড়ৎ) এর মতো উদ্যোগগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সিএমইডি হেলথ তাদের ‘সুস্বাস্থ্য’ (ঝঁঝধংঃযড়) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। তারা আইওটি (ওড়ঞ) ডিভাইস এবং এআই—এর সমন্বয়ে মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে । তাদের সিস্টেমে ৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষিত আছে, যা ব্যবহার করে এআই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিরূপণ করে এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করে। বিশেষ করে কিশোর—কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এআই—চালিত চ্যাটবট ব্যবহারের মাধ্যমে সামাজিক জড়তা ভেঙে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।   

অন্যদিকে, অমরডক্টর একটি ভয়েস—ইন্টারেক্টিভ এআই অ্যাপ্লিকেশন যা বাংলা ভাষার তিনটি প্রধান উপভাষা বুঝতে সক্ষম। এটি সেই সব মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছে যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নন বা যারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। এই অ্যাপটি রোগীর কথা শুনে তার লক্ষণগুলো বিশ্লেষণ করে এবং অত্যন্ত উচ্চ নির্ভুলতার সাথে (৮১.০৮ শতাংশ ডায়াগনস্টিক প্রিসিশন) রোগ শনাক্ত করতে পারে। এটি চিকিৎসকের অভাব পূরণে সরাসরি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে, কারণ এটি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের কাজগুলো নিজেই সম্পন্ন করে চিকিৎসকের সময় সাশ্রয় করে।   

মহামারি মডেলিং: ডেঙ্গু ও কোভিড—১৯ এর প্রাদুর্ভাব ট্র্যাকিং

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এআই—এর আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রয়োগ হলো মহামারি মডেলিং। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু—সংবেদনশীল এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ডেঙ্গু বা কোভিড—১৯ এর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব আগে থেকে অনুমান করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস

ডেঙ্গু বাংলাদেশে প্রতি বছর একটি মানবিক সংকটে পরিণত হয়। এই বাস্তবতায় এআই এবং মেশিন লার্নিং মডেলগুলো, বিশেষ করে এক্সজি—বুস্ট (ঢএইড়ড়ংঃ) এবং লাইট—জিবিএম (খরমযঃএইগ), ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দিতে অত্যন্ত সফল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকরা আবহাওয়ার তথ্য যেমন বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের তথ্য ব্যবহার করে এমন একটি মডেল তৈরি করেছেন যা ১ থেকে ২ মাস আগেই সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে। এই পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাযোগ্য এআই বা এক্সপ্লেনেবল এআই (ঢঅও) এর ব্যবহার একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা নীতিনির্ধারকদের সংক্রমণের কারণগুলো বুঝতে সাহায্য করে।

কোভিড—১৯ ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি

কোভিড—১৯ মহামারির সময় বাংলাদেশ এআই এবং ডেটা অ্যানালিটিকসের ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। সরকারের এটুআই (ধ২র) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যৌথভাবে এমন একটি ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তুলেছিল যা রিয়েল—টাইম ট্র্যাকিং এবং হটস্পট শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ৩৩৩ হেল্পলাইনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য আক্রান্তদের ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব হয়েছে। পরবর্তী কোনো মহামারির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই এআই—চালিত মডেলগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।   

এআই বাস্তবায়নের অবকাঠামোগত এবং নৈতিক চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য এআই—এর সম্ভাবনা অপরিসীম হলেও এর ব্যাপক প্রসারের পথে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বাধা রয়েছে। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হলো পরিকাঠামো। গ্রামীণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগের অভাব রিয়েল—টাইম রিমোট ডায়াগনস্টিকসকে বাধাগ্রস্ত করে। যদিও এআই মডেলগুলো অফলাইনে কাজ করার জন্য অপ্টিমাইজ করা হচ্ছে, তবুও বড় ডেটাসেট সিংক্রোনাইজেশনের জন্য উন্নত ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন।   

দ্বিতীয়ত, ডেটা প্রাইভেসি এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। স্বাস্থ্য তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং কোনো আইনি কাঠামোর আওতায় এই তথ্যগুলো সংরক্ষিত হবে, তা নিয়ে এখনও কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল ডিভাইড বা প্রযুক্তিগত বৈষম্য একটি বড় আশঙ্কার বিষয়। যদি এআই প্রযুক্তি কেবল ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা দরিদ্র ও ধনীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি অ্যালগরিদমিক বায়াস বা পক্ষপাতের ঝুঁকিও রয়েছে; যদি এআই মডেলগুলো সঠিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হয়, তবে তা ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণ হতে পারে। সবশেষে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে এআই প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরণের মানসিক জড়তা বা অবিশ্বাসের পরিবেশ বিদ্যমান। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা এবং এআই যে তাদের প্রতিস্থাপক নয় বরং সহায়ক, তা নিশ্চিত করা জরুরি।   

ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও উপসংহার

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও রিমোট ডায়াগনস্টিকসে এআই—এর ভূমিকা এখন আর কেবল একটি পরীক্ষা—নিরীক্ষার পর্যায়ে নেই, বরং এটি একটি অপরিহার্য জাতীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ ভিশনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকার ন্যাশনাল এআই পলিসি এবং ডিজিটাল হেলথ স্ট্র্যাটেজি ২০২৩—২০২৭ প্রণয়ন করেছে, যা এই খাতের প্রযুক্তিগত রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করবে। এটুআই এর মতো সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে ৪০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে ডিজিটাল সেবা এবং এআই—ভিত্তিক পূর্বাভাসের আওতায় নিয়ে এসেছে, যা একটি বিশাল অর্জন।   

পরিশেষে, চিকিৎসকের অভাব পূরণে এআই—কে কেবল একটি টুল হিসেবে দেখলে চলবে না, একে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রিমোট ডায়াগনস্টিকস, পোর্টেবল ইমেজিং এবং মহামারি মডেলিংয়ের সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ কেবল বর্তমান সংকটই কাটিয়ে উঠবে না, বরং সারা বিশ্বের জন্য সাশ্রয়ী ও কার্যকর ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হবে। এআই—এর এই যাত্রা কোটি মানুষের জীবন রক্ষার এবং একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের এক নতুন অধ্যায়। 

যোগাযোগ: anis@anisrahman.org

Related Posts