যে লড়াইটা কেউ দেখে না || এক অটিজম সন্তানের মায়ের ডায়েরি

রাবেয়া আলম রুবিঃ মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছে করে, মানুষ যদি অটিজমের পেছনের সেই জীবনটাও দেখতে পেত, যেটা কখনো ছবিতে আসে না। যে অংশটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। যে লড়াইটা চলে পর্দার আড়ালে। হ্যাঁ, বাবারাও সাহায্য করেন। অনেক বাবা আছেন যারা সন্তানের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন, অ্যাপয়েন্টমেন্টে যান, রুটিনে সাহায্য করেন এবং নিজের মতো করে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন। কিন্তু কখনো কখনো মা—বাবার মধ্যে মতের মিল হয় না। কখনো তর্ক হয়। কখনো অভিযোগ আসে।

—“তুমি ওকে সামলাতে পারো না কেন?”

—“তুমি ওকে বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছ।”

—“তুমি ওকে নষ্ট করে ফেলেছ।”

—“তুমি ওকে ঠিকভাবে সামলাতে জানো না।”

এই কথাগুলো অনেক সময় মানুষ যতটা বোঝে, তার চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়। কারণ সত্যি কথা হলো, অটিজম কোনো ম্যানুয়াল নিয়ে আসে না।

কোনো বই নেই যেখানে লেখা আছে, আমাদের সন্তান যখন চিৎকার করবে, মারামারি করবে, আঁচড়ে দেবে, স্কুলে যেতে চাইবে না, রাতে ঘুমাবে না, কথা দিয়ে নিজের প্রয়োজন বোঝাতে পারবে না, অথবা হঠাৎ তার আচরণ বদলে যাবে, তখন ঠিক কী করতে হবে।

কোনো নিখুঁত নিয়ম নেই। আমরা আমাদের সন্তানকে বুঝতে শিখি সংযোগের মাধ্যমে। তাকে দেখে দেখে। বারবার চেষ্টা করে। অনেক না—ঘুমানো রাতের মধ্য দিয়ে। ভুল করতে করতে, আবার চেষ্টা করতে করতে। আর ভালোবাসার মাধ্যমে।

একজন মা ধীরে ধীরে এমন অনেক ছোট ছোট বিষয় বুঝতে শেখেন, যেগুলো হয়তো অন্য কেউ খেয়ালও করে না। চোখের দৃষ্টি। কীভাবে সে হাত দিয়ে ইশারা করে। তার কণ্ঠের স্বর। তার আচরণের ছোট্ট পরিবর্তন। এমন কিছু যা হয়তো বলতে না পারলেও বুঝিয়ে দেয়, “কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে।”

অনেক সময় সে কী চায়, সেটা সে বলতে পারার আগেই মা বুঝে যান। এই সংযোগটাই একসময় আমাদের পথ দেখায়। এটাই আমাদের নিয়মের বই হয়ে যায়।

আর তারপরও কখনো কখনো কেউ বলে, “তুমি ভুল করছ।” এটাও একজন অটিজম মায়ের লুকানো লড়াই। মতবিরোধ। তর্ক। অভিযোগ। অপরাধবোধ। এবং সবসময় মনে হওয়া, যত কিছুই করি না কেন, হয়তো আরও কিছু করা উচিত ছিল।

এর মধ্যেই মা সবকিছু সামলাচ্ছেন। থেরাপি। এবিএএ আইইপি মিটিং। স্কুল। শিক্ষক। থেরাপিস্ট। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। কাগজপত্র। অসংখ্য ফোন কল। ওষুধের সময়সূচি। প্রতিদিনের রুটিন। খাবার। ঘুম। ব্যক্তিগত যত্ন।

তারপর আছে ঘর। কাপড় ধোয়া। রান্না। ঘর পরিষ্কার করা। বাজার করা। বিল দেওয়া।

আর এসবের মাঝখানে কোথাও একজন মা নিজেকেও সামলানোর চেষ্টা করছেন। কখনো একটি সার্ভিসের ব্যবস্থা করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে থাকতে হয়। কখনো সন্তানের প্রয়োজনীয় সাহায্য পাওয়ার জন্য পুরো একটা দিন ফোন কল আর কাগজপত্রের পেছনে চলে যায়।

কখনো রাতে শরীর এতটাই ক্লান্ত থাকে যে মনে হয় আর পারছি না, কিন্তু মাথার ভেতর চিন্তা থামে না। আজ কী হলো? সে ঠিকমতো খেয়েছে তো? ঘুম হয়েছে তো? স্কুলে ঠিক ছিল তো? কোনো কিছু তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে কি? আমি কি কিছু বুঝতে পারিনি? আগামীকাল আমি কী করতে পারি? আর তারপর থাকে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা, যেটা প্রতিটি অটিজম মায়ের হৃদয়ের গভীরে নীরবে বাস করে: “আমি যখন থাকব না, তখন আমার সন্তান কীভাবে থাকবে?” এই ভয়টা খুব কম মানুষই সত্যি বুঝতে পারে।

আরও অনেক কিছু আছে এই তালিকায়। এমন অনেক কথা, যেগুলো আমরা বলি না। অনেক কিছু, যা আমরা লুকিয়ে রাখি। অনেক রাত, যখন কাউকে না জানিয়ে আমরা কাঁদি। অনেক কিছু ঘটে ঘরের দরজার আড়ালে। তারপরও আমরা এগিয়ে যাই। কারণ আমাদের সব উত্তর জানা আছে বলে নয়। কারণ আমরা সবসময় শক্ত থাকি বলে নয়। কারণ আমরা সবসময় জানি কী করতে হবে, তাও নয়। আমরা এগিয়ে যাই কারণ এটা আমাদের সন্তান। আর কোনো একসময় আমরা এমন একটি ভাষা শিখে যাই, যেখানে সবসময় শব্দের প্রয়োজন হয় না। এমন এক ভাষা, যা তৈরি হয় সংযোগ, ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ আর ভালোবাসা দিয়ে। এটাই অটিজমের সঙ্গে পথ চলার সেই অংশ, যেটা মানুষ সবসময় দেখতে পায় না।

তাই কোনো অটিজম মাকে বলার আগে যে, “তুমি তোমার সন্তানকে নষ্ট করে ফেলেছ,” অথবা “তুমি ওকে সামলাতে জানো না,” কিংবা “তুমি ভুল করছ”Ñ একটু থামুন।

হয়তো আপনি এমন একজন মায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন, যিনি প্রতিদিন চেষ্টা করছেন এমন একটি পৃথিবীকে বুঝতে, যে পৃথিবীকে তার সন্তান সবসময় নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে না। হয়তো আপনি এমন একজন মাকে দেখছেন, যিনি সীমাহীন ক্লান্ত, তবুও প্রতিদিন আবার দাঁড়াচ্ছেন। আবার ফোন করছেন। আবার চেষ্টা করছেন। আবার লড়ছেন। আবার শিখছেন। আবার ভালোবাসছেন। আবার আশা করছেন।

আর পরের দিন সকালে.. তিনি আবার সবকিছু শুরু করবেন। কারণ মা এমনই। কেউ দেখুক বা না দেখুক, সন্তানের জন্য মা লড়াই করে যান।

Related Posts