গভর্নর্স আইল্যান্ডে কানিজ হুসনা আকবরীর একক চিত্র প্রদর্শনী
ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলাদেশী—আমেরিকান চিত্রশিল্পী কানিজ হুসনা আকবরীর একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘সোল অব নেচার’ বা ‘প্রকৃতির আত্মা’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২০ জুন থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত গভর্নর্স আইল্যান্ডের ১৬ নোলান পার্কে। ট্রাস্ট ফর গভর্নর্স আইল্যান্ড ২০২৬ সালের রেসিডেন্স কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের বিটুইন রিভার এন্ড হারবর: স্টোরিজ দ্যাট ক্যারি আস—এর অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনী দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
নদী কেবল জল বহন করে না। তার স্রোতে মিশে থাকে আকাশের প্রতিচ্ছবি, হারিয়ে যাওয়া ভূদৃশ্যের চিহ্ন, শৈশবের স্মৃতি এবং মানুষের গভীরতম আত্মিক বন্ধনের অদৃশ্য মানচিত্র। কোনো নদী যখন ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার তীর ছেড়ে বহুদূরে চলে গেলেও সেই নদীর প্রবাহ থেমে যায় না। মানুষের অন্তর্জগতে সে বয়ে চলে নিরন্তরÑকখনো স্মৃতির স্নিগ্ধতায়, কখনো বিচ্ছেদের বেদনায়, কখনো নতুন কোনো ভূখণ্ডে আপন অস্তিত্বের সন্ধানে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন চিত্রশিল্পী কানিজ হুসনা আকবরীর কাছে জল ও স্মৃতির এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কই তাঁর শিল্পভাবনার অন্যতম ভিত্তি। সেই ভাবনারই নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘প্রকৃতির আত্মা’য়।
শিল্পী কানিজ জলকে প্রকৃতির প্রাণসত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর উপলব্ধিতে জলের অবিরাম প্রবাহের সঙ্গে আত্মিক পরিশুদ্ধি, মানবিক শান্তি এবং জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে তার জন্মভূমির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, নিউইয়র্কের হাডসন নদীর তীরে দাঁড়ালে তাঁর মনে পড়ে যায় স্বদেশের কথা, ফিরে আসে এক ধরনের অন্তর্গত প্রশান্তি। দুই নদীর এই স্মৃতিগত সংযোগ তাঁর শিল্পকর্ম অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তবে তাঁর চিত্রজগৎ কেবল প্রকৃতিচিত্রে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিকৃতি, প্রতীকী বিমূর্ততা, পারিবারিক স্মৃতি এবং মানুষের মনোস্তাত্ত্বিক অন্তর্লোকও সেখানে সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
শিল্পী কানিজ হুসনা আকবরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে অঙ্কন ও চিত্রকলায় স্নাতক এবং ২০০২ সালে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। চিত্রশিল্পের পাশাপাশি শিল্পশিক্ষা ও পেশাদার নকশাকর্মেও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বইয়ের প্রচ্ছদ নির্মাণ, অলংকরণ, প্রদর্শনীর শিল্পনির্দেশনা এবং প্রদর্শন—নকশাতেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পে রঙের অভিব্যক্তি, দৃশ্যমান অবয়ব এবং ভাবপ্রকাশের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবনে সহায়তা করে।
মুখাবয়বের আয়নায় মানুষের অন্তর্জগৎ
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া পনেরোটি ঋধপব গরৎৎড়ৎ ২০২৪ চিত্রকর্ম শিল্পীর পরিচয় ও মনোস্তাত্ত্বিক অনুভূতি অনুসন্ধানের সবচেয়ে বিস্তৃত প্রয়াস। সব কটি চিত্র অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে ক্যানভাসে আঁকা, প্রতিটির আকার ১৬দ্ধ২০ ইঞ্চি। এই চিত্রমালায় দীর্ঘায়িত ও শৈলীগতভাবে রূপান্তরিত মানবমুখগুলো সবুজ, নীল, হলুদ, লাল ও বেগুনির তীব্র রঙক্ষেত্রে স্বতন্ত্র অভিব্যক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
ঋধপব গরৎৎড়ৎ ২০২৪—১ চিত্রে অন্ধকার পটভূমির সামনে চশমা পরিহিত এক নারীর ফ্যাকাশে মুখাবয়ব। আলো—অন্ধকারের বৈপরীত্যে তাঁর মুখে প্রতিফলিত হয়েছে অভিজ্ঞতা ও আত্মসমীক্ষার এক সংযত আবহ। ঋধপব গরৎৎড়ৎ ২০২৪—২ ছবিতে বাদামি ও মাটিরঙের বিভিন্ন স্তরে গড়ে উঠেছে অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখ। অন্যদিকে ঋধপব গরৎৎড়ৎ ২০২৪—৩ চিত্রে প্রসারিত জিহ্বা এবং মুখের বিভিন্ন অংশে বিপরীতধর্মী রঙের প্রয়োগ এক ধরনের কৌতুকমিশ্রিত অবয়ব নির্মাণ করেছে। সবুজের প্রাধান্যে নির্মিত ঋধপব গরৎৎড়ৎ ২০২৪—৪, ২০২৪—৫ ও ২০২৪—৬ চিত্রে দীর্ঘায়িত মুখাবয়ব, ছায়াঘন চোখ এবং গাঢ় রঙের বৈপরীত্য লক্ষণীয়। প্রথম চিত্রে সূক্ষ¥ অলংকরণ মুখাবয়বকে কোমলতা দিয়েছে। দ্বিতীয়টিতে প্রায় একরঙা মুখের গভীর দৃষ্টি এক নিবিড় মনোস্তাত্ত্বিক উপস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তৃতীয় চিত্রে ফুলের ছোট অলংকরণ রহস্যময় অভিব্যক্তির মধ্যে একটি কোমল মাত্রা যুক্ত করেছে। আর ২০২৪—১৫ চিত্রে হলুদাভ—সবুজ মুখটি ঘিরে রয়েছে লালচে বর্ণের একাধিক বৃত্তাকার রেখা, যা ব্যক্তিসত্তা ও পারিপার্শ্বিক পরিসরের মধ্যে একটি কাল্পনিক মনোস্তাত্ত্বিক সীমানার ইঙ্গিত দেয়।
এই পনেরোটি প্রতিকৃতি প্রচলিত অর্থে ব্যক্তির হুবহু প্রতিরূপ নয়, আবার সম্পূর্ণ বিমূর্ত চিত্রও নয়। এখানে মানুষের মুখ যেন এক অনুভূতিসংবাহী পৃষ্ঠতল, যেখানে আবেগ, অনিশ্চয়তা, সাংস্কৃতিক অলংকরণ এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের নানা চিহ্ন প্রতিফলিত হতে পারে। ঋধপব গরৎৎড়ৎ বা ‘মুখের আয়না’ শিরোনামটি এমন একটি ব্যাখ্যার সুযোগ দেয় যে, দর্শক এসব অপরিচিত মুখের মধ্যেও নিজের অন্তর্জগতের কোনো অচেনা অংশ আবিষ্কার করতে পারেন।
জল, শিকড় ও আপন হয়ে ওঠার সম্মুখযাত্রা
এৎববহংধষঃ ওংষধহফ (অ্যাক্রিলিক, ক্যানভাস, ৩০দ্ধ৩০ ইঞ্চি, ২০২৫—২০২৬) চিত্রে বিস্তৃত শাখাপ্রশাখাবিশিষ্ট একটি বৃক্ষ সবুজ ও নীলের নিবিড় ভূদৃশ্যের মধ্যে প্রধান হয়ে উঠেছে। তার চারপাশে জল, ক্ষুদ্র উদ্ভিদ এবং ঘনবদ্ধ বসতবাড়ির উপস্থিতি। বৃক্ষের বিস্তৃত শিকড় সম্মুখভূমিতে স্থিতির অনুভূতি সৃষ্টি করেছে, অথচ পেছনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমশ খুলে গেছে এক কল্পনাময় দৃশ্যপটে। জল ও শিকড়ের এই সহাবস্থানকে সংযুক্তি, বিকাশ এবং জীবনের ধারাবাহিকতার এক প্রতীকী ভাষা হিসেবে পাঠ করা যায়।
উববঢ় জড়ড়ঃবফ খড়াব — ১ (অ্যাক্রিলিক, ক্যানভাস, ২০০৭) চিত্রে শিকড়ের ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে প্রতীকী বিমূর্ততার মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে উববঢ় জড়ড়ঃবফ খড়াব — ২ (অ্যাক্রিলিক, ক্যানভাস, ২০২১) চিত্রে আবদ্ধ জৈব কাঠামোর পরিবর্তে দেখা যায় একটি স্থাপত্যিক অন্তঃপরিসর, যেখানে বহুরঙা পর্দা দুই পাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। দুটি চিত্র পাশাপাশি বিবেচনা করলে গভীর মানবিক বন্ধনের দুটি ভিন্ন দৃশ্যভাষা পাওয়া যায়। প্রথমটিতে শিকড় ও জৈব ধারাবাহিকতা, দ্বিতীয়টিতে দূরত্ব, অন্তরঙ্গতা এবং স্মৃতির অভিজ্ঞতা। উভয় ক্ষেত্রেই ভালোবাসা যেন কেবল তাৎক্ষণিক আবেগ নয়; সময় ও বিচ্ছেদের মধ্যেও টিকে থাকা এক গভীর সম্পর্কের সম্ভাবনা।
বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা ও জলের আবেগময় জীবন
অইইট’ং (ঋধঃযবৎ’ং) খধংঃ ঔড়ঁৎহবু (বাবার শেষযাত্রা; অ্যাক্রিলিক, ক্যানভাস, ২৪দ্ধ৩৬ ইঞ্চি, ২০২১) চিত্রটি প্রদর্শনীতে এক গভীর ব্যক্তিগত অনুভূতির মাত্রা যুক্ত করেছে। নীলের প্রাধান্যে নির্মিত চিত্রবিন্যাসে উজ্জ্বল ও আলোড়িত আকাশসদৃশ রঙস্তরের নিচে দেখা যায় লালচে, নৌকাসদৃশ একটি উল্লম্ব অবয়ব। নিচের দিকে রয়েছে স্থাপত্যসদৃশ একটি গণ্ডীবদ্ধ রেখাবিন্যাস। চিত্রটির শিরোনাম পিতৃবিয়োগের সঙ্গে একটি প্রত্যক্ষ আবেগগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে অবয়বের ঊর্ধ্বমুখী গতি এবং চারপাশের অস্থির বর্ণবিন্যাস দর্শককে বিদায়, প্রস্থান এবং ফিরে না আসার অনুভূতি নিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়। তবে চিত্রটিকে শিল্পীর পারিবারিক জীবনের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার আক্ষরিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বরং দৃশ্যমান উপাদান ও শিরোনামের সম্মিলনে এটি ব্যক্তিগত শোককে বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার পরিসরে নিয়ে যায়।
খড়হবষু ঙপবধহ (নিঃসঙ্গ সমুদ্র; অ্যাক্রিলিক, ক্যানভাস, ২০২০) চিত্রে বিস্তৃত নীল জলরাশি গোলাপি ও বেগুনি মেঘমালার নিচে দূর দিগন্ত পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। ভাঙা ঢেউ এবং সরু তটভূমি সমুদ্রের একঘেয়েমি ভেঙে দৃশ্যে গতি ও স্থানিক বৈচিত্র্য এনেছে। দূর দিগন্তের অনুভূতি এবং আকাশের পরিবর্তনশীল রঙ মিলিয়ে এখানে এক অনির্ধারিত আবেগময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রকে এখানে নিঃসঙ্গতার প্রতীক হিসেবে পাঠ করা সম্ভব, কিন্তু তার অর্থ কেবল নিঃসঙ্গতায় সীমাবদ্ধ নয়। একই সমুদ্র আবার অসীমতা, মুক্তি এবং প্রবহমান ধারাবাহিকতার অনুভূতিও জাগাতে পারে। এই বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনাই চিত্রটিকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছে।
উপসংহার: অন্তরে বহমান নদীর শিল্পভাষা
কানিজ হুসনা আকবরীর ঝড়ঁষ ড়ভ ঘধঃঁৎব প্রদর্শনীতে দুটি পরিপূরক শিল্পভাষার বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। একটি জল, বৃক্ষ ও প্রকৃতির জৈব প্রবাহকে কেন্দ্র করে নির্মিত; অন্যটি মানবমুখের অভিব্যক্তি, মানসিক উপস্থিতি এবং পরিচয়ের বহুরৈখিক অনুসন্ধানে নিবিষ্ট। পরিচিত বাস্তবের অবয়ব থেকে শৈলীগত বিমূর্ততার দিকে অগ্রসর হতে হতে শিল্পী উজ্জ্বল ও সম্পৃক্ত রঙের সাহায্যে এমন অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যা নিছক বাস্তববর্ণনায় সম্পূর্ণ ধারণ করা কঠিন। প্রকৃতিচিত্র ও প্রতীকী রচনাগুলো প্রতিকৃতির সীমা অতিক্রম করে স্মৃতি, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ এবং আত্মিক ধারাবাহিকতার প্রশ্নকে নতুন দৃশ্যরূপ দিয়েছে। এই আপাতবিচিত্র চিত্রগুলোর অন্তর্নিহিত ঐক্য কোনো একটি প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ নিজের অন্তরে কী বহন করেÑসেই মৌলিক অনুসন্ধান। নদী বহন করে দূর উৎসের প্রবাহ, মুখাবয়বের দৃশ্যমান রেখার আড়ালে লুকিয়ে থাকে জীবনের অপ্রকাশিত ইতিহাস, আর বৃক্ষের শিকড় ধরে রাখে এমন বন্ধন, যা সব সময় চোখে দেখা যায় না। শিল্পী কানিজের শিল্পে পদ্মা ও হাডসনের মিলনের জন্য তাই কোনো ভৌগোলিক সঙ্গমস্থলের প্রয়োজন হয় না। দুটি নদী মিলিত হয় স্মৃতির গভীরে, রঙের বিন্যাসে এবং মানুষের নিরন্তর আপন আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার আকাক্সক্ষায়। এই শিল্পভুবনে জল কেবল নদীর নয়, স্মৃতিরও; মুখ কেবল অবয়বের নয়, আত্মপরিচয়েরও; আর প্রকৃতি কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যে্যর নয়, মানুষের অন্তর্গত অস্তিত্বেরও প্রতিচ্ছবি। পদ্মার তীর ছেড়ে হাডসনের পারে এসে শিল্পী যেন আবিষ্কার করেছেন এক অনন্ত সত্য—মানুষ নদী পেরিয়ে যায়, কিন্তু তার অন্তরে বহমান নদী কখনো শেষ হয় না।
