গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়- তেরো সুরের মোহনায় এক যাযাবর ভূপেন হাজারিকা
জীবন বিশ^াসঃ ভূপেন হাজারিকাকে অনুধাবন করার আদি শর্ত হলো, প্রথমে একটি প্রমত্তা নদীর আবহ মাথায় রাখা। নদী অবয়বে জড় হলেও বোবা নয়। সে নিজের ভাষায় কথা বলে, তার কলতানে মিশে থাকে পাহাড়ের পাথর, জেলের নৌকা, চরবাসীর ক্ষুধা, পাড় ভাঙার ক্রন্দন আর বৃষ্টির উল্লাস। ভূপেন হাজারিকার গানও ঠিক নদীর মতোই এক সুবিশাল সমান্তরাল প্রবাহ। তাঁর মহাকাব্যিক উদাত্ত কণ্ঠে মানুষ কখনো একা থাকে না। মানুষের সেই মিছিলে ছায়ার মতো হেঁটে বেড়ায় দেশ, ইতিহাস, শ্রম, প্রেম, দ্রোহের আগুন এবং এক অবিনাশী মানবিকতা। তিনি যখন গেয়ে চলেন ‘মানুষ মানুষের জন্য’, শ্রোতার কানে যেন এক মানবিক মানুষ অন্য এক বিপন্ন মানুষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরম মমতায় বলছে, তুমি একা নও, তোমার সংগে আমি আছি, আমরা আছি, তোমার চোখের জল আর বুকের গভীর দুঃখটি আমারও। ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সাদিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূপেন হাজারিকার জন্ম এবং ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন হাসপাতালে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর সেই পঁচাশি বছরের অবিনাশী জীবন যাপন কোনো সাধারণ সংগীতশিল্পীর জীবনপঞ্জি নয়, তিনি যাযাবরের মত মানুষের সংগেই হেঁটেছেন মানুষেরই গান গেয়ে।
কলাম্বিয়া থেকে পল রোবসনের আঙিনা
তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুর-স্থপতি, চলচ্চিত্রকার এবং এক গণচেতনার মহান কারিগর। কটন কলেজ ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে তিনি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কলাম্বিয়ায় তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষায় অডিও-ভিজ্যুয়াল পদ্ধতির ব্যবহার। তবে এই নিউইয়র্ক প্রবাসই তাঁর জীবনদর্শনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, যেখানে কিংবদন্তি কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী পল রোবসনের মানবমুক্তির সংগীতধারা তাঁর শৈল্পিক চেতনাকে আমূল বদলে দেয়। তাঁর গানে আশ্রয় নেয় গণমানুষের মুক্তির চেতনা ও ভালোবাসার সুরধ্বনি।
লোকসুরের আবহে শৈশব-স্মৃতি
শৈশব থেকেই তাঁর জীবন ছিল নদীর মত প্রবহমান। সাদিয়া, গুয়াহাটি, ধুবড়ি কিংবা তেজপুরের মত বৈচিত্র্যময় ভূগোল তাঁর কানে এনে দিয়েছিল নদীর রহস্যময় ধ্বনি, লোকসুর আর শ্রমজীবী মানুষের অকৃত্রিম কথ্য ভাষা। মাত্র দশ বছর বয়সেই জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ও বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার নজরে আসেন তিনি। বারো বছর বয়সে অসমীয়া চলচ্চিত্র ‘ইন্দ্রমালতী’-তে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়ে তাঁর রুপালি পর্দার যাত্রা শুরু। সেই কাঁচা বয়সেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, সংগীত কেবল নিছক সুরের অনুশীলন নয়Ñগান হলো মানুষের ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে তোলার এক অমোঘ সামাজিক শক্তি।
গণসংগীতের এক নতুন নান্দনিকতা
ভূপেন হাজারিকার বিশেষত্ব এই যে, তিনি গণসংগীতকে কখনো সস্তা বা শুষ্ক স্লোগানের কর্কশ চাতুর্যে নামিয়ে আনেননি। তাঁর গান রাজনৈতিক, কিন্তু দলীয় নয়; প্রতিবাদী, কিন্তু রুক্ষ নয়; মানবিক, কিন্তু দুর্বল নয়। তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ গানটি তাই কেবল দয়া বা করুণার কোনো হালকা আবেদন নয়, এটি আসলে আধুনিক সভ্যতার এক কঠিন নৈতিক পরীক্ষা। তিনি যখন গেয়ে চলেন-’বিস্তীর্ণ দুপারে’-তখন মনে হয় নদী যেন এক মহাকালের নিরপেক্ষ আদালত, যা দুপাড়ের মানুষের শোষণ আর বঞ্চনার নির্মম হিসাব দাবি করছে। ব্রহ্মপুত্র সেখানে কেবল জলধারা নয়, ইতিহাসের সাক্ষী। পল রোবসনের বিখ্যাত ঙষ’ গধহ জরাবৎ-এর ভাবনা ও সুরের গাম্ভীর্যকে নিজের অন্তরে ধারণ করে তিনি নদীকেন্দ্রিক যে মানবিক প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করেছিলেন, তা কালক্রমে বাংলা ও হিন্দিসহ বিশ্বের বহু ভাষার মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নেয়।
বাংলা ভাষার অন্তরঙ্গতা ও সেলুলয়েডের ক্যানভাস
বাংলা ভাষার আঙিনায় তাঁর গান শোনার অভিজ্ঞতা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়। তাঁর বাংলা উচ্চারণের অন্দরে আসামের মাটির সুবাস লেগে থাকত স্পষ্ট, কিন্তু ভাবের সেই আত্মিক নিবিড়তায় কোনো দূরত্ব ছুঁতে পারত না। তিনি বাংলাকে কখনো সাময়িক অতিথির মতো ব্যবহার করেননি বরং পরম অধিকারে আপন করে নিয়েছিলেন আত্মার অন্দরমহলে।
‘আমি এক যাযাবর’ শুনলে মনে হয় পৃথিবীর চেনা-অচেনা শহরগুলো তাঁর কাছে কোনো মানচিত্রের জড় রেখাচিত্র নয়, বরং তা হাজারো চেনা মানুষের জীবন্ত মুখ। ‘সাগর সঙ্গমে’ গানের সুরের তান শুনলে মনে হয় নদী ও সমুদ্রের সেই মিলন আসলে মানব সভ্যতার মহামিলনেরই এক নান্দনিক প্রতীক। আর ‘আমায় একজন সাদা মানুষ দাও’-এই কালজয়ী সৃষ্টির শিরোনামের আড়ালে যে তীব্র ও শাণিত ব্যঙ্গ লুকিয়ে আছে, তা আসলে বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদ, ক্ষমতা ও মানবসমতার প্রশ্নে তাঁর গভীর রাজনৈতিক সংবেদনশীলতারই এক অকাট্য দলিল।
চলচ্চিত্রের পর্দাতেও ভূপেন হাজারিকা নিজের এক অমোঘ স্বাক্ষর রেখে গেছেন। অসমীয়া চলচ্চিত্রের সমান্তরালে বাংলা, হিন্দি ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংগীতের ভান্ডারকেও তিনি সুরের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সৃজনশীলতায় উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকসুর, নদীমাতৃক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক মানবতাবাদের অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত আসাম বিধানসভার নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর স্থায়ী ঠিকানা রাজনীতিতে নয়, বরং মানুষের কণ্ঠনালীতে। শিল্প ও মানবতার এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে, সঙ্গীত নাটক একাডেমী রতœ, পদ্মবিভূষণ এবং মরণোত্তর ‘ভারত রতœ’ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করেছে।
ভূপেন হাজারিকার কয়েকটি বিখ্যাত গানঃ
১। মানুষ মানুষের জন্যে, ২। আমি এক যাযাবর, ৩। বিস্তীর্ণ দুপারে, ৪। সাগর সঙ্গমে, ৫। আজ জীবন খুঁজে পাবি, ৬। প্রতিধ্বনি শুনি, ৭। গঙ্গা আমার মা, ৮। সাগর সঙ্গমে, ৯। মেঘ থম থম করে, ১০। সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, ১১। ও বেহুলা বাংলা, ১২। শীতের শিশির ভেজা রাতে, ১৩। একটু গেলেই অথৈ সাগর, ১৪। ও বিধি আমায় কালো করলে যদি, ১৫। হে দোলা হে দোলা, ১৬। আমায় একজন সাদা মানুষ দাও, ১৭। দীপালি শেফালি অঞ্জলিরে, ১৮। এ কেমন রঙ্গ যাদু, ১৯। ও মালিক সারাজীবন, ২০। একখানা মেঘ ভেসে এল আকাশে, ২১। হৃদয়ের ব্যথা বিরহের কথা, ২২। শিমুল রাঙা পলাশ রাঙা, ২৩। শরৎবাবু খোলা চিঠি, ২৪। বিমূর্ত এই রাত্রি আমার, ২৫। আগুন ভেবে যারে কাছে ডাকিনি
পরিশেষ
আজ যখন এই ঘূর্ণায়মান পৃথিবী নানাবিধ বিভাজনের কুৎসিত রাজনীতিতে, সংকীর্ণতায় আর ক্ষমতার নির্মমতায় বারবার অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন ভূপেন হাজারিকার গান ধ্রুবতারার মতো আবশ্যিক হয়ে ওঠে। তাঁর গান মানুষকে সাহসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আরও মানবিক করে তোলে। তিনি চলে গেছেন সত্য, কিন্তু তাঁর সেই অবিনাশী গান আজও প্রবহমান-ব্রহ্মপুত্রের ভেজা পাড় ধরে কিংবা সুদূর প্রবাসের কোনো নিভৃত অডিটোরিয়ামে। তিনি আজীবন যাযাবর ছিলেন বটে, তবে তাঁর প্রকৃত ঠিকানাটি ছিল মানুষের স্পন্দিত হৃদয়। আর সেই অখন্ড হৃদয়ের গভীরে তিনি আজও গান ধরেন ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনাতে নজরুল’ -এক নরম অথচ আশ্চর্য অমোঘ মানবিক স্বরে।
