বিশ^কাপ নিয়ে নিউইয়র্ক সিটি প্রস্তুত
বাঙালী প্রতিবেদনঃ শেষবার নিউইয়র্ক সিটির পার্শ্ববর্তী নিউজার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেডোল্যান্ডসে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসেছিল ১৯৯৪ সালে। সেই ৩২ বছর আগের চেয়ে এ বছর নিউইয়র্কে উন্মাদনা অনেক বেশি। বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ তখনকার তুলনায় এখন এই এলাকায় ফুটবলপ্রিয় ইমিগ্রান্টের সংখ্যা অনেক বেশি এবং নিউইয়র্ক সিটির এশিয়ান বংশোদ্ভুত ফুটবলপ্রিয় মেয়র জোহরান মামদানি। নিউইয়র্ক সিটি এবং স্টেট প্রশাসন ধারণা করছে যত মনুষ এই বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যাবে, এবং এই খেলা দেখার জন্য আমেরিকার অন্যান্য সিটি ও অন্য দেশ থেকে ভক্তরা আসছেন, তাতে বিপুল জনসমাগম হবে ম্যানহ্যাটানসহ ব্রুকলীন, কুইন্স, ব্রংক্স, ওয়েস্টচেস্টার, ন্যাসাউ কাউন্টিতে। সে কারণে ম্যানহ্যাটানের অনেক রাস্তা ম্যাচ চলার দিন বন্ধ থাকবে। চলবে কেবল বাস। আশা করা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ফ্যান নিউইয়র্ক থেকেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যাবে। বিশ্বকাপের কারণে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের নাম সাময়িক পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়াম।
ম্যাচ চলার দিন সাবওয়ে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। উল্লেখ্য এই বিপুল জনপ্রিয় বিশ্বকাপ ফুটবলের ৮টি ম্যাচ হবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এবং ফাইনাল খেলাও হবে। বিশ্বকাপ ফুটবলের অনেকগুলো ওয়াচ পার্টি হবে নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায়, পার্কে, রাস্তায় এবং কনভেনশন সেন্টারে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের টিকিট মূল্য এবং স্টেডিয়াম থেকে যাওয়া-আসা-খাওয়ার খরচ বিপুল হওয়ায় মেয়র মামদানি ফিফা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১০০০টি টিকিট ৫০ ডলার মূল্যে কিনে লটারির মাধ্যমে বিতরণ করছেন অনলাইনে। লটারিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছিল।
বিশ্বকাপ নিয়ে মেয়র মামদানির সময়োচিত তৎপরতার কারণও আছে। তিনি জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বাজেটে বিপুল ঘাটতি থাকায় বেশ হিমশিম খাচ্ছিলেন। নিউজার্সিতে বিশ্বকাপের ৮টি ম্যাচ হওয়ার কারণে নিউইয়র্ক সিটিতে পর্যটকের যে ভিড় হবে, তা থেকে নিউইয়র্ক সিটি বড় অংকের রেভিনিউ সংগ্রহ করতে পারবে।
নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম ম্যাচ হবে আগামী শনিবার ১৩ জুন, এরপর ১৬ জুন মঙ্গলবার, ২২ জুন সোমবার, ২৫ জুন বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন শনিবার, ৩০ জুন মঙ্গলবার, ৫ জুলাই রবিবার ও ১৯ জুলাই রবিবার ফাইনাল। মেক্সিকো সিটিতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী খেলা হবে ১১ জুন বৃহস্পতিবার।
সেই ১৯৩০, আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উরুগুয়েতে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের প্রথম আসর। বড়জোর ২৫০ ফুটবলার অংশ নিয়েছিল। শতবর্ষ ছুঁইছুঁই সেই বিশ্বকাপ এবার ৪৮ দলের মহাআসর। ১ হাজার ২৪৮ ফুটবলারের স্বপ্ন ছোয়াঁর মঞ্চ। ১১ জুন মেক্সিকো থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের এই ২৩তম আসরে প্রতিটি দলের চূড়ান্ত স্কোয়াড দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। যেখানে আসর শুরুর আগেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা।
ফিফার দেওয়া তথ্যে এর আগে কখনোই বিশ্বকাপের আসরে এত বেশি সংখ্যক ফুটবলার অংশ নেয়নি। দল ও খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়ার কারণে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে এবার ১০৪-এ। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে বর্ধিত এই ফরম্যাটের কারণেই আগে যে কোনো বারের চেয়ে এবার বড় উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোও প্রস্তুত বিশ্বকাপের সর্ববৃহৎ এই আয়োজন সফল করতে।
ফিফার কাছে নাম জমা দেওয়া এই ১ হাজার ২৪৮ ফুটলারের মধ্যে এমন তিনজন রয়েছেন, যারা কিনা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে এই তালিকায় মেক্সিকোর বর্ষীয়ান গোলরক্ষক গুইলারমো ওচোয়া রয়েছেন। হিসাব বলছে, এই আসরে এমন ৩৫৭ ফুটবলার রয়েছেন, যারা কিনা এর আগেও কোনো বিশ্বকাপ আসরে অংশ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ বিশ্বকাপে এবার অভিজ্ঞদের চেয়ে তারুণ্য ও নবাগতের আধিক্যই বেশি। সব মিলিয়ে মোট ৮৯১ ফুটবলার এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে পা রাখতে যাচ্ছেন। তাদের সবাই অবশ্য ফুটবলবিশ্বের কাছে একেবারে অচেনা নন। স্পেনের লামিনে ইয়ামাল, নরওয়ের আর্লিং হালান্ড যেমন এ তালিকায় আছেন, তেমনি কুরাসাওয়ের লিয়েন্দ্র বাকুনাও আছেন। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর যুক্তি, ‘ফুটবলের বিশ্বায়ন বাড়াতেই এবার দলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এতে এমন কিছু দেশের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন পূরণ হবে, যারা হয়তো আগে কখনোই পারেনি।’ হয়েছেও তাই; এবারই প্রথম কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান আর উজবেকিস্তান বিশ্বআসরে অংশ নিতে যাচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপ দলগুলোতে বয়সের এক দারুণ বৈচিত্র্য দেখা গেছে। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে নাম লিখিয়েছেন মেক্সিকোর গিলবার্তো মোরা। মাত্র ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সে তিনি নাম লেখালেন বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। তাঁর মতো এমন বছর কুড়ির নিচে ফুটবলার আছেন এবার মোট ২২ জন। আর চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলার আছেন মোট সাতজন। স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ জর্ডন এবারের আসরের সবচেয়ে বুড়ো ফুটবলার। ৪৩ বছর ১৬২ দিন বয়সে যিনি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নাম লিখিয়েছেন। এবারের আসরেও চলবে লাতিন বনাম ইউরোপেরই লড়াই। তবে এবারে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া ফুটবলারদের মধ্যে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর আধিপত্যই বেশি।
হিসাব বলছে, ১ হাজার ২৪৮ ফুটবলার বিশ্বের ৭১টি দেশের ভিন্ন ভিন্ন মোট ৪৪৯ ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলে থাকেন। এই ৭১টি দেশের মধ্যে এশিয়ার ১৪টি, লাতিনের আটটি, উত্তর আমেরিকার সাতটি করে দেশ রয়েছে। ক্লাবগুলোর মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটি সবার চেয়ে এগিয়ে। তাদের ১৯ জন ফুটবলার এবারের বিশ্বকাপে নিজ নিজ দেশের হয়ে খেলতে নামছেন। বিশ্বকাপে সৌদি আরব আর কাতার একটি অনন্য নজির তৈরি করেছে। তাদের স্কোয়াডের ২৬ জনের ২৫ জনই তাদের ঘরোয়া লিগের ফুটবলার। শেষ মুহূর্তে বড় কোনো ইনজুরি না হলে ফিফার কাছে জমা দেওয়া প্রতিটি দলের ২৬ জনের এই চূড়ান্ত স্কোয়াড আর বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে এবারের আসর সত্যিকার অর্থেই রেকর্ড ভেঙে শুরু হতে যাচ্ছে।
