স্বপন বিশ্বাসের দুটি কবিতা
ঈশ্বর থাকে আয়নার ওপারে
ধর্মের শিক্ষক একদিন ক্লাসে বলেছিলেন
তুমি যদি ঈশ্বরের দিকে এক পা হাঁটো
ঈশ্বর তোমার দিকে দু‘পা এগিয়ে আসবে।
তারপর থেকে ভোলানাথ আর কোনদিন স্কুলে আসেনি।
মাঝেমধ্যে রাস্তায় দেখা হলে বলে -
ব্যস্ত আছি রে, কথা বলার সময় নেই,
ঈশ্বরের দিকে হাঁটছি।
তার চলার পথ
বারের অন্ধকার গলি পেরিয়ে
নিষিদ্ধ পল্লীর লাল দরজা ছুঁয়ে যায়,
মাঝে মাঝে রক্তের গন্ধ মেখে ফেরে-
সবকিছুই উৎসর্গ তার ঈশ্বরের পথে।
এক অচেনা পথিক ডেকে বলে
ঈশ্বরের কোন খবর পেলি?
ভোলানাথ একপেগ গলায় ঢেলে দিয়ে বলে-
সাত আসমানের ওপরে ঈশ্বরের
কোনো ঘর বাড়ি নেই রে!
ঈশ্বর আমাদেরই আশেপাশে থাকে।
কী করে বুঝলি?
বাতাসের কানে কানে খুব গোপনে বলে-
একদিন নিষিদ্ধ পল্লির গেট পেরোতেই শুনি, তুই এত খারাপ?
আরেকদিন একটা খুন করে ঘুরে দাঁড়াতেই শুনি, মানুষটাকে খুন করে ফেললি!
ইচ্ছা করছিল ঠাঁটিয়ে একটা চড় মারি
দুদিনই পালানোর খুব তাড়া ছিল,
কিচ্ছু বলিনি।
পরে বুঝেছি, সে-ই ঈশ্বর।
হাউ মাউ করে কেঁদে বলে,
কাছে পেয়েও চিনতে পারিনি রে।
ভোলানাথ আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বোতল হাতে ঈশ্বরকে দেখে।
বলে, ওই দেখ, ঈশ্বর থাকে আয়নার ওপারে।
আমি দুঃখ পেলে সে কাঁদে
আমি খুশি হলে সে হাসে।
আমি এক পা এগিয়ে গেলে
আমাদের দূরত্ব দু’পা কমে আসে।
চিয়ার্স! গুরু, চিয়ার্স।
হাতের বোতলটা ঈশ্বরের বোতলের সঙ্গে ঠুকে দেয়,
মুহূর্তে হাজারটা ঈশ্বর ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে
ভোলানাথ বোতলটা গলায় ঢেলে দিয়ে বলে, এবার খেলা হবে -
ছোট ঈশ্বর বড় ঈশ্বর
গুঁড়ো ঈশ্বর বুড়ো ঈশ্বর
সব ঠোকাঠুকি লেগে যাবে।
বাতাসে হই হই রব ওঠে
হাত দিস না ভোলা-
ভাঙা ঈশ্বর খুব ভয়ানক
রক্তারক্তি কান্ড হয়ে যাবে।
ভোলানাথ হো হো করে হাসে-
তোরা অযথায় ভয় দেখাস
ঈশ্বর তো আমার বন্ধু।
রক্তারক্তি হলে -
ওপরের মাল আবার ওপরে পাঠিয়ে দেবো।
পাগলা দাশু
দাশু কোন জাদুকর ছিল না।
পাগল মানুষ-
মনের আনন্দে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়
হাত পেতে টাকা পয়সা চায়
সুযোগ পেলে চুরি চামারি করে
যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করে।
লাঠি হাতে তাড়া দিলে বলে -
ছেড়ে দে, আমি পাগল মানুষ
কী করতে কি করে ফেলেছি।
অন্যসময় সে নায়ক উত্তম কুমার
সিনেমার নায়িকারা তার জন্য পাগল।
সুচিত্রা সেন নিজে মুখে বলেছে
সে নাকি তাকে ছাড়া বাঁচবেই না।
নারীর প্রতি দাশুর আকর্ষণটা একটু বেশি
বিজ্ঞানীরা কীসব হরমন, ডিএনএ, আরএনএ তত্ত্ব¡ আওড়ায়
যার জন্য মানুষ ধর্ষকাম হয়।
পাগলদের ওইসবে একটু চড়া ভাব থাকে।
দাশুর কবি মন সবকিছুর মাঝেই নারীর দেহ খুঁজে ফেরে-
কোকাকোলার বোতলেও নারীর অবয়ব
কী ঝাক্কাস ফিগার মাইরি!
হাতের তালুতে ঢেউ খেলায়
নারীর উন্নত বক্ষদেশ থেকে
ক্ষীণ কটিদেশ হয়ে স্ফীত নিতম্বের বাঁক।
কোম্পানীগুলো বড্ড হারামি আছে, বল?
দোকানী বলে, কি -
মাল খাবি?
আরে ধুর! আমি কেন মাল খাব
আমি হলাম সাধু পুরুষ।
তা সাধু পুরুষরা বুঝি মাল খায় না!
দাশু আশপাশ একটু দেখে নিয়ে
গলা নামিয়ে বলে, তবে দে, এত করে যখন বলছিস
মহাপ্রভুর প্রসাদ দুঢোক খাই।
দাশুর পেটে মাল পড়লে মনের পালে হাওয়া লাগে
সে হাওয়ায় সমাজের সভ্য ভব্য মেকি পর্দাটা উড়ে যায়
দাশু তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে
সুধীজনদের নামে খিস্তি খেউর করে
নারীর শরীরে হাত বাড়ায়।
সভ্য সমাজ তখন শুদ্ধতায় ফুঁসে ওঠে
রক্তাক্ত দাশু জ্ঞান ফিরে পেলে
চারিদিকে আওয়াজ ওঠে -
আমাকে চিনিস? আমাকে চিনিস?
দাশু ফ্যালফ্যাল করে তাকায়
চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে সময়
রক্তাক্ত মুখ থেকে ঘোষিত হয়
এক অস্ফুট দৈববাণী-
‘তোরা সবাই একেকজন দাশু পাগল।’
সন্দেহপ্রবণ মন গোপনে গোপনে পরিচয়পত্র খোঁজে
আর বিস্ময়ে হতবাক হয়।
দাশু কি কোন জাদু জান?
দাশু কোন জাদুকর ছিল না।
