যা দেখেছি যা বুঝেছি-১৪ || মনিরুল ইসলাম
মানবজন্মদিবস
আমার ছেলের জন্মদিন। ২৫ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে সে হল ২১ বৎসরের যুবক। মানুষ বলে শুভজন্মদিন, হ্যাপি বার্থডে। আমি কী বলব বুঝতে পারছি না, কারণ সে আর সাথে নেই আমাদের, এই পৃথিবীতে। কোথায় যে আছে, তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। খুঁজতেও চায় না কেউ। শুধু প্রভা মাঝে মধ্যে বলে, ‘যেখানেই হোক, সে আছে এবং তার সাথে আমি একবার অন্তত দেখা করব। বলব, বাবা, তোর শরীর কেমন?’ আমি অসহায়বোধ করি। তাকে নিঃসংশয়ে বলতে পারি নাÑ‘সেখানে’ কি মানুষ শরীর নিয়ে অবস্থান করে? সেখানকার ভৌগোলিক পরিবেশ, আনন্দ-বিলাস, দৈহিক গঠন ইত্যাদি নিয়ে কিছুকথা ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়। এত প্রাণ কোথা থেকে আসে, এত প্রাণ কোথায় যায় মিশে? গত ৫০ হাজার বৎসরে এ পৃথিবীতে যে ১০৬ বিলিয়ন মানুষের জন্ম হয়েছে, তারা যেখানে গিয়েছেন বা যাবেন, ছেলে নিশ্চয়ই সেখানে আছে। সুতরাং চিন্তার কিছু নেই।
নিউইয়র্কে বরফ-ঢাকা দিনে ও রাতে অনিন্দ্যকে নিয়ে লিখেছি। এখন আছি আফ্রিকার আদিম গরমে। পৌঁছে একটু ভয় পেয়েছিলাম। মনের সব ভাবনা বুঝি শুকিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, মানুষের কৃতঘœতার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসে একদম ভেঙে পড়েছিÑসে কাহিনী অন্যদিন। দ্বিতীয়ত, আফ্রিকার উত্তাপ দারিদ্র্য নৈরাশ্য বুঝি আমাকেও নিঃশেষ করে দেবে। তা নয়Ñলিখতে বসে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম, লেখাই যে আমার প্রাণ। আমি বেঁচে আছি ছেলের স্মরণিকা রচনা করার জন্য, তাই এ লেখা।
সকল প্রাণ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে আলোয় বেরিয়ে আসতে চায়। চরম বৈপরীত্য, সমূহ বিপদ কিংবা দুরতিক্রম্য শোকেও সে নিজেকে খাপ খাইয়ে উঠে দাঁড়ায়। যেমন মাইনাস পঞ্চাশ (ইয়াকুটস্ক, সাইবেরিয়া) এবং প্লাস পঞ্চাশ (আহওয়াজ, ইরান) ডিগ্রীতেও মানুষ সংসার করে। উভয়খানেই মানুষের মন বেঁচে থাকে, প্রাণ জেগে ওঠে, হৃদয় আলোড়িত হয়। ছোটবেলায় পড়েছিলাম, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, যার অর্থ করেছিলাম: বাংলার মতো সবুজ সুন্দর উর্বর ভূমি পৃথিবীর কোথাও নেই। বড় হয়ে দেখেছি তার চেয়েও অনেক নয়নাভিরাম প্রকৃতির কন্যা আছে ভূতলে। কথাটির আসল অর্থ হল ‘সে যে আমার জন্মভূমি’, অর্থাৎ সবার জন্মভূমিই নিজ নিজ অন্তরে প্রিয়তম স্থান।
ভেবেছিলাম উষ্ণ সিক্ত সুফলা বলে বাঙালির হৃদয়েই ‘ভাব’ জাগে। কিন্তু এখন দেখি আফ্রিকার শুষ্ক ঊষর বিরানভূমিতেও মানুষের পায়ে নৃত্য নামে। কণ্ঠে সে গান ধরে, মাথায় কবিতা আসে, মুখে হাসে ও চোখে কাঁদে। ইগলুবাসী মানুষও নিশ্চয়ই নিজেকে এভাবেই প্রকাশ করে। তাহলে কি সত্যিই এই জগতের তাবৎ মানুষের জন্মউৎস একক অভিন্ন অনন্য? শুনেছি মানুষের উৎপত্তি নাকি আফ্রিকাতে। তাই দেখতে এলাম আমার পূর্বপুরুষদের আবাসস্থলÑতাদের জীবনাচার, চিন্তা চেতনা বিকাশ বিস্তৃতি। জন্মের আদি উৎসে এসে কেমন যেন ভাল লাগছে। এখানকার মানুষ কি আমার কয়েক লক্ষ বৎসরের পুরনো আত্মীয়? এর জল মাটি বায়ু স্পর্শ করলামÑএক অপূর্ব অনুভূতি। আদিমতায় মাদকতা আছে, সেজন্যই মানুষ সমুদ্রজলে সাঁতরাতে যায়, বৃক্ষারণ্যে লুকাতে চায়। জন্মদিনে জন্মের কথাই বলি। মহাঅস্তিত্ব, মহাবিশ্ব, সৌরজগৎ, পৃথিবী, প্রাণ, প্রাণী এবং মানুষÑসবার জন্মকথা বলিÑঅতি পুরাতন, শুনতে নতুন।
দৃশ্য ও অদৃশ্য এবং ধারণায়ত্ত ও ধারণাতীত সকলকিছু নিয়ে যে মহাঅস্তিত্ব এবং মহাবিশ্ব তার সুুনিশ্চিত ব্যাখ্যা আজও জ্ঞানাতীত। যদি ধারণা করা হয় প্রায় ১৩৮০ কোটি বৎসর পূর্বে মহাবিশ্ব ‘বিগ ব্যাং’-এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছে, তাহলে তৎপূর্বে কি ছিল? অধিকন্তু মহাবিশ্ব (টহরাবৎংব)-যে একক অদ্বিতীয় নয়, একাধিক অসংখ্য (গঁষঃরাবৎংব)-ও হতে পারে, তাই বা কে জানে। আমাদের এই মহাবিশ্ব একই প্রাকৃতিক নিয়মে চললেও অন্য মহাবিশ্বগুলোর নিজস্ব ভিন্নতর নিয়মকানুন থাকতে পারে। তবে শুধুমাত্র আমাদের মহাবিশ্বকেই অনাদি অনন্ত মনে করলেও কেউ বলেন দৃশ্যমান মহাবিশ্বের পরিধি হল ৮.৮দ্ধ১০২৬ মিটার বা ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। এর মাত্র ৫% হল দৃশ্যমান ‘সাধারণ বস্তু’ (বস্তু, গ্রহ, তারা, গ্যালাক্সি ইত্যাদি), বাকি ২৫% অনাবিষ্কৃত ‘ডার্ক মেটার’ এবং ৭০% অদৃশ্য ‘ডার্ক এনার্জি’। মহাবিশ্বের এই ৯৫% মানবজ্ঞানের অতীত বলে তার চূড়ান্ত পরিণতির কথা এখনও কেউ বলতে পারছে না। আর চিরপ্রসারমান বলেই মানুষ মহাবিশ্বে তার অভিযাত্রাও কোনোদিন শেষ করতে পারবে না।
মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্রকণিকা হল ‘পৃথিবী’, যার বয়স মহাবিশ্বের বয়সের এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৪৫৪ কোটি বৎসর। পৃথিবী ক্রমান্বয়ে ঠান্ডা হয়ে মেঘ বৃষ্টি মহাসাগর সৃৃষ্টি শুরু করল ৪৪০ কোটি বৎসর পূর্বে। কঠিন শিলা ও তরল পানি সৃষ্টির পর ৩৮০ কোটি বৎসর পূর্বে পৃথিবীতে, বর্তমান গ্রীনল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতে, প্রথম ‘প্রাণকণা’-এর আবির্ভাব হয়। বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন আসার পর ২০০ কোটি বৎসর পূর্বে ‘প্রাণ’ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ৫৮ কোটি বৎসর পূর্বে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক প্রাণ বহুমুখী হতে শুরু করে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সাথে সাথে অসংখ্য ধরনের প্রাণের জন্ম ও বিলুপ্তি চলতে থাকে। তবে পৃথিবীতে সকল প্রাণের খধংঃ টহরাবৎংধষ অহপবংঃড়ৎ-কোষ ৩৫০ কোটি বৎসর পূর্বে এক ও অভিন্ন ধারা থেকে এসেছে। কী আর্শ্চয, সকল মানুষ শুধু নয়, সকল প্রাণীও তাহলে একই পূর্বকোষ থেকে উৎপন্ন! যদি তাই হয়, কেন আমরা ধরণীর অন্য সব ‘প্রাণ’-কে যথাযথ সম্মান করি না? ভূমন্ডলে উঘঅ, জঘঅ, প্রোটিন, মেমব্রেন, অ্যামাইনো এসিড, আয়রন, সালফার ইত্যাদির গঠন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে কয়েক কোটি বছর। প্রথমে ফার্মেন্টেশন ও পরে ফটোসিনথেসিস দ্বারা জলে ও স্থলে প্রাণকণা সরল থেকে জটিলতর ও বৈচিত্র্যময় হয়ে বিবর্তিত হতে থাকে আরো কত কোটি বছর।
একই সময়ে বায়ুমন্ডল, ভূমন্ডল ও মহাসাগরের আকার প্রকৃতিও বদলাতে থাকে। ১১০ কোটি বৎসর পূর্বে প্ল্যান্ট, প্রাণী ও ফাঙ্গির কোষধারা ভিন্নতর হতে থাকে। ১০০ কোটি বৎসর পূর্বে গ্রীন ধষমধব ধরনের প্ল্যান্ট এবং ৯০ কোটি বৎসর পূর্বে ংঢ়ড়হমব ধরনের বহুকোষী প্রাণীর আবির্ভাব শুরু হয়। সেই সাথে প্রাণকণার আকার ও বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে।
৫৪ কোটি বৎসর পূর্ব থেকে জলে স্থলে আধুনিক প্ল্যান্ট ও প্রাণীর পূর্বরূপ অস্তিত্ব লাভ করতে থাকে কিন্তু একই সাথে বিবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অনেকের সধংং বীঃরহপঃরড়হ চলতে থাকে। সুতরাং এতশত কোটি বছরের মহাবির্র্বতনে কোন প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটবে, কে-বা টিকে থাকবে, কেউ বলতে পারবে না। তবে অনুকূল উপযোগী পরিবেশে অন্য এক নতুন প্রজাতি দ্রুত তার স্থান দখল করতে থাকে। অর্থাৎ শুরু থেকেই ধরিত্রী মাতা বলে এসেছে: টিকতে পারছ না, সরে দাঁড়াও। আরেকজন আছে আসার অপেক্ষায়!
