৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ আইড্যাহো অ্যাঙ্গেল অব রিপোজঃ ওয়ালেস স্টেগনার || আবদুল্লাহ জাহিদ
আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলকে ঘিরে যে সাহিত্যভুবন গড়ে উঠেছে, সেখানে কিছু উপন্যাস কেবল গল্প নয়, একটি সভ্যতার নির্মাণকাহিনী। অ্যাঙ্গেল অব রিপোজ তেমনই একটি উপন্যাস। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থের জন্য লেখক ওয়ালেস স্টেগনার পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। উপন্যাসটি মূলত উনিশ শতকের শেষভাগে আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন, রেলপথ নির্মাণ, খনিশিল্প, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং মানুষের মানসিক আশ্রয়ের অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে রচিত।
এই উপন্যাসের বিস্তৃত ভৌগোলিক পটভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আইডাহো। আইডাহোর পাহাড়, খনি, নদী, দুর্গম জনপদ এবং অস্থির সীমান্তজীবন উপন্যাসটিকে এক বিশেষ বাস্তবতা দিয়েছে। স্টেগনার কেবল প্রকৃতিকে বর্ণনা করেননি; তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রকৃতি মানুষের ভাগ্য নির্মাণ করে, আবার ধ্বংসও করে।
উপন্যাসটির সারসক্ষেপ:
অ্যাঙ্গেল অব রিপোজ উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র লাইম্যান ওয়ার্ড একজন অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসবিদ, যিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ ও একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি তাঁর দাদা-দাদী অলিভার ওয়ার্ড এবং সুসান ওয়ার্ডের পুরনো চিঠি, ডায়েরি ও নথিপত্র ঘেঁটে তাঁদের জীবনকাহিনী লিখতে শুরু করেন। সেই গবেষণার মধ্য দিয়েই উপন্যাসের মূল কাহিনী উন্মোচিত হয়।
অলিভার ওয়ার্ড একজন আদর্শবাদী প্রকৌশলী। তিনি আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে খনি, সেচপ্রকল্প ও রেলপথ নির্মাণের কাজে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ান। তাঁর স্ত্রী সুসান ওয়ার্ড পূর্ব আমেরিকার শিক্ষিত, শিল্পমনস্ক ও সংস্কৃতিবান নারী। বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম অঞ্চল, বিশেষ করে আইডোহোর খনি ও সীমান্ত জনপদে চলে আসেন।
কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলের কঠিন ও অস্থির জীবন সুসানের জন্য সহজ ছিল না। একদিকে স্বামীর প্রতি ভালোবাসা, অন্যদিকে সভ্য ও স্থিতিশীল জীবনের আকাক্সক্ষাÑএই দ্বন্দ্বে তিনি ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অলিভার নতুন নতুন প্রকল্প ও স্বপ্নের পেছনে ছুটতে থাকেন, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই প্রতারণা, আর্থিক ব্যর্থতা ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
দাম্পত্য জীবনে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয়। সুসানের জীবনে অন্য একজন পুরুষের আবির্ভাব ঘটে, যা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। তবু তাঁদের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায় না; বরং দীর্ঘ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে তারা এক ধরনের নীরব সমঝোতায় পৌঁছায়।
বর্তমান সময়ের লাইম্যান ওয়ার্ড নিজের দাদা-দাদীর জীবনের ইতিহাস লিখতে লিখতে নিজের ব্যর্থ বিবাহ ও নিঃসঙ্গতাকেও নতুনভাবে বুঝতে শেখেন।
এইভাবে উপন্যাসটি একদিকে আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল নির্মাণের ইতিহাস, অন্যদিকে প্রেম, ত্যাগ, উচ্চাকাক্সক্ষা ও মানসিক আশ্রয়ের গভীর মানবিক কাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
অ্যাঙ্গেল অব রিপোজ একটি বহুমাত্রিক উপন্যাস। উপন্যাসে আইড্যাহো কেবল একটি ভূগোল নয়; এটি এক মানসিক অবস্থা। আইড্যাহোর খনিশহরগুলো ছিল দ্রুত গড়ে ওঠা অস্থায়ী জনপদ-যেখানে মানুষ স্বর্ণ, রূপা বা খনিজের আশায় ছুটে আসত। লেখক স্টেগনার অত্যন্ত সূক্ষ¥ভাবে দেখিয়েছেন, পশ্চিমাঞ্চলের এই শহরগুলোতে সভ্যতা ছিল অর্ধনির্মিত। কাদা, ধুলো, বরফ, দুর্গম পাহাড় এবং বিচ্ছিন্নতা মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলত।
সুসান ওয়ার্ডের চোখ দিয়ে আমরা দেখি এক সাংস্কৃতিক ধাক্কা। তিনি পূর্ব উপকূলের শিল্প-সংস্কৃতির পরিমন্ডল থেকে এসে পড়েন এমন এক পৃথিবীতে যেখানে মানুষের প্রধান চিন্তা টিকে থাকা। সেখানে সাহিত্য, সংগীত বা শিল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ খনি, খাদ্য ও আবহাওয়া। তবু সুসান নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি ছবি আঁকেন, লেখালেখি করেন, সন্তানদের মানুষ করেন। কিন্তু তাঁর চারপাশের বাস্তবতা ক্রমাগত তাঁকে ক্লান্ত করে তোলে।
আইড্যাহোর প্রকৃতি এখানে দ্বৈত চরিত্রে উপস্থিত। একদিকে তা অপূর্ব বরফঢাকা পাহাড়, নীল নদী, বিস্তৃত উপত্যকা। অন্যদিকে তা নির্মম দুর্ঘটনা, বিচ্ছিন্নতা, শীত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনকে গ্রাস করে।
উপন্যাসটি পড়তে গেলে বোঝা যায়, লেখক ইতিহাসকে কেবল তথ্য হিসেবে দেখেননি। তিনি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ইতিহাসের অভিঘাত খুঁজেছেন।
উনিশ শতকের শেষভাগে আমেরিকা দ্রুত পশ্চিমের দিকে বিস্তৃত হচ্ছিল। নতুন নতুন অঞ্চল দখল, রেলপথ নির্মাণ, খনি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশÑসব মিলিয়ে এক বিশাল পরিবর্তনের যুগ। অলিভিয়া ওয়ার্ড সেই যুগের প্রতিনিধি। তিনি বিশ্বাস করেন প্রযুক্তি ও প্রকৌশল পশ্চিমাঞ্চলকে বদলে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই তাঁর স্বপ্নকে ব্যর্থ করে দেয়। ব্যবসায়িক প্রতারণা, অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং প্রকৃতির প্রতিকূলতা তাঁর জীবনকে অস্থির করে তোলে।
এই দিক থেকে অ্যাঙ্গেল অব রিপোজ কেবল পারিবারিক উপন্যাস নয়; এটি আমেরিকান ড্রিম-এর সমালোচনাও। পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে লেখক একধরনের রোমান্টিক মহাকাব্য হিসেবে দেখাননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন এর মূল্যÑমানুষের মানসিক ক্লান্তি, সম্পর্কের ভাঙন, সাংস্কৃতিক নিঃসঙ্গতা।
উপন্যাসের সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র সম্ভবত সুসান ওয়ার্ড। তিনি প্রতিভাবান, সংবেদনশীল এবং উচ্চাভিলাষী। কিন্তু তাঁর জীবন বারবার স্বামীর স্বপ্নের পেছনে স্থানান্তরিত হতে হতে এক গভীর ক্লান্তিতে নিমজ্জিত হয়। তিনি কখনও সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমাঞ্চলকে গ্রহণ করতে পারেন না। তাঁর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের সভ্যতা, শিল্প ও স্থিতিশীল জীবনের আকাক্সক্ষা রয়ে যায়।
লেখক অত্যন্ত মানবিকভাবে দেখিয়েছেন একজন নারীর আত্মত্যাগ কীভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। সুসান স্বামীকে ভালোবাসেন, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর প্রতি ক্ষোভও জন্ম নেয়। কারণ অলিভারের প্রতিটি নতুন পরিকল্পনা মানে আবার নতুন অস্থিরতা।
এই দ্বন্দ্ব উপন্যাসটিকে গভীর মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা দিয়েছে।
উপন্যাসের নামটিই অত্যন্ত প্রতীকধর্মী। ‘অ্যাঙ্গেল অব রিপোজ’ প্রকৌশলবিদ্যার একটি শব্দ, যার অর্থ কোনো বস্তু সর্বোচ্চ কতখানি ঢালে স্থির থাকতে পারে, তার সীমা।
স্টেগনার এই ধারণাটিকে মানুষের জীবনে প্রয়োগ করেছেন।
মানুষ কতটা অস্থিরতার মধ্যে বাস করতে পারে?
একটি সম্পর্ক কতখানি চাপ সহ্য করতে পারে?
স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘর্ষে কোথায় গিয়ে স্থিতি আসে?
সুসান ও অলিভারের জীবন যেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে।
লাইম্যান ওয়ার্ড নিজেও বর্তমান জীবনে সেই এ্যাঙ্গেল খুঁজছেন। শারীরিকভাবে অক্ষম, স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, অতীতের স্মৃতিতে নিমগ্ন এই মানুষটি দাদা-দাদীর জীবন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিজের জীবনকেও বুঝতে চেষ্টা করেন।
অনেক সাহিত্যসমালোচক মনে করেন, এই উপন্যাসে প্রকৃতি নিজেই একটি চরিত্র। বিশেষ করে আইড্যাহোর ভূপ্রকৃতি উপন্যাসটিকে গভীরতা দিয়েছে।
লেখক নিজে পশ্চিমাঞ্চলের সন্তান। ফলে পাহাড়, মরুভূমি, খনি, নদীÑসবকিছু তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
তিনি প্রকৃতিকে কখনও নিছক সৌন্দর্যের বস্তু হিসেবে দেখাননি। বরং প্রকৃতি মানুষের চরিত্র গঠন করে। পশ্চিমাঞ্চলের কঠোর পরিবেশ মানুষকে সাহসী করে তোলে, আবার একই সঙ্গে নিঃসঙ্গও করে।
আইড্যাহোর দূরবর্তী খনিশহরগুলোতে বসবাসরত মানুষদের জীবন ছিল অস্থায়ী। আজ যে শহর জনাকীর্ণ, কাল সেটি পরিত্যক্ত। এই অনিশ্চয়তা মানুষের মনেও অস্থিরতা তৈরি করে।
ওয়ালেস স্টেগনারের গদ্য অত্যন্ত পরিমিত, সংবেদনশীল এবং গভীর।
উপন্যাসে দীর্ঘ চিঠিপত্র, স্মৃতিচারণ, ডায়েরি এবং বর্তমান সময়ের বর্ণনা মিলেমিশে এক জটিল কাঠামো তৈরি করেছে।
ওয়ালেস স্টেগনার (১৯০৯-১৯৯৩) আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক, ইতিহাসবিদ ও পরিবেশচিন্তক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলভিত্তিক সাহিত্যধারার অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তাঁর লেখায় আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃতি, সীমান্তজীবন, অভিবাসন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানুষের মানসিক নিঃসঙ্গতা গভীরভাবে উঠে এসেছে। তিনি আইওয়াতে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশব কাটে আমেরিকার বিভিন্ন পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চলে।
