বই আলোচনা এইচ বি রিতার মনোস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘সোফিয়া’ || সোহানা নাজনীন
এইচ বি রিতার ‘সোফিয়া’ উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে ভীষণ রকমের এক মনোস্তাত্ত্বিক ধাক্কা বা দোলাচলের মুখোমুখি হতে হলো। চমৎকার ও ভিন্ন আঙ্গিকে রচিত বইটি পাঠককে শুধু একটি গল্প শোনাবে না, বরং মানুষের মনের এমন কিছু জটিল ও অন্ধকার গলিতে নিয়ে যাবে, যেখানে প্রতিটি বাঁকে অপেক্ষা করে এক নতুন উপলব্ধি।
বইটির শুরু থেকেই লেখিকা যেভাবে মনোস্তাত্ত্বিক জাল বুনেছেন, তা এক কথায় আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে। মানব মনের অবদমিত ইচ্ছা, ট্রমা, অস্তিত্বের সংকট এবং শৈশবের অপ্রকাশিত ক্ষত থেকে উদ্ভূত সংকটকে খুব সূক্ষ¥ভাবে উপন্যাসের পরতে পরতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পড়তে পড়তে মনে হলো, আমি কেবল সোফিয়া নামের কোনো চরিত্রের গল্প পড়ছি না, বরং অবচেতনভাবেই নিজের ভেতরের কোনো এক অচেনা সত্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। এই যে পাঠককে এক ধরনের মানসিক দোলাচলের মধ্যে রাখা, এটাই এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
লেখিকার পূর্ববর্তী সাহিত্যকর্মÑ ‘পৃষ্ঠার বাইরে’ এবং ‘দাগ’, মনোস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন বিশ্লেষণে তিনি যে বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন, ‘সোফিয়া’ উপন্যাসে তা আরও পরিপক্ব ও পরিণত রূপ লাভ করেছে।
উপন্যাসের মনোস্তাত্ত্বিক বুননে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘ড্রিম সাইকোলজি’ তত্ত্বের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের স্বপ্ন হলো অবচেতন মনের অবদমিত বা অসম্পূর্ণ আকাক্সক্ষার এক বিকৃত ছদ্মরূপ। সোফিয়া যখন ফ্রয়েডের ড্রিম অ্যানালিসিস এবং সেক্স ড্রিম সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো অধ্যয়ন করে, তখন তার কাছে স্পষ্ট হতে থাকে যে স্বপ্নে দেখা অপ্রীতিকর বা ভীতিকর ঘটনাগুলো আসলে তার মনের ভেতরে সযতেœ লুকিয়ে রাখা কোনো গভীর কষ্টের বহিঃপ্রকাশ।
একই সঙ্গে, উপন্যাসে অতিপ্রাকৃত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার এক সূক্ষ¥ দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সোফিয়া তার ভৌতিক ভয় ও কবরস্থানের অভিজ্ঞতাগুলোকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার জন্য ড. ভিক ট্যান্ডি ও লরেন্সের ১৯ হার্টজ ইনফ্রাসাউন্ডের ‘গোস্ট ইন দ্য মেশিন’ তত্ত্ব, ড. সুজান ব্ল্যাকমোরের ইল্যুশন তত্ত্ব এবং ড. মাইকেল পার্সিঞ্জারের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের মনোস্তাত্ত্বিক প্রভাবের মতো বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাহায্য নেয়। এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলোর সংযোজন প্রমাণ করে যে উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু কেবল অলৌকিক রোমাঞ্চ তৈরি করা নয়, বরং মানুষের স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে অনুধাবন করা।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সোফিয়া। সে এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তার দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বাহ্যিকভাবে সে নিজেকে একজন সাহসী ও যৌক্তিক তরুণী হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যে রাতের অন্ধকারে সাউথ জার্সির এক নির্জন কবরস্থানে ক্যামেরার শাটার স্পিড ৩০-৬০ সেকেন্ডে রেখে রহস্য উদঘাটনে দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু তার এই বাহ্যিক কাঠামোর ভেতরে বাস করে এক তীব্র আতঙ্কগ্রস্ত সত্তা। সোফিয়ার সংকটের মূল লক্ষণগুলো শারীরিক ও মানসিক উভয় স্তরেই প্রকাশ পেয়েছে উপন্যাসটিতে। সে অনবরত তীব্র অনিদ্রা, অমূলক আতঙ্ক এবং দুঃস্বপ্নের শিকার হয়, যেখানে সে অন্ধকার কবরস্থান, গোঙানি ও কান্নার অদ্ভুত সুর এবং মাটির স্পন্দন অনুভব করে।
সোফিয়ার এই মানসিক সংকট তার বাস্তব জীবনে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সে তার মা মরিয়মের আন্তরিক উদ্বেগকে বিরক্তি মনে করে নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করে। এবং তার এই সংকটের প্রভাব তার কর্মক্ষেত্রেও দৃশ্যমান হয়। ম্যানহ্যাটানের পাবলিক লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনে কাজ করার সময় সে প্রায়শই গভীর অন্যমনস্কতায় ভোগে এবং মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। যার ফলে তার কাজের গতি ব্যাহত হয় এবং ম্যানেজার কার্লের কাছ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা পেতে হয়। লাইব্রেরিতে কর্মরত প্রবীণ সহকর্মী জনের সাধারণ সহানুভূতিশীল স্পর্শও সোফিয়ার অবচেতন ট্রমাকে জাগ্রত করে তোলে। ফলে সে তীব্র প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হয়ে চিৎকার করে কাজের জায়গা থেকে পালিয়ে যায়।
এই সংকটের আরেকটি বিশেষ মাত্রা প্রকাশ পায় সোফিয়ার দত্তক নেওয়া বিড়াল অগির মধ্য দিয়ে। তিন বছর বয়সী এই শান্ত বিড়ালটি চরম বিষণœতা ও উদ্বেগে আক্রান্ত, যার মনমেজাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অগির এই মানসিক অবস্থা মূলত সোফিয়ার নিজেরই বিষণœ ও ট্রমাগ্রস্ত মনের এক নীরব প্রতিফলন বলে মনে হয়। অগির খেলনা ক্যাটনিপ টয় ও পলিথিন ব্যাগ নিয়ে অদ্ভুত আচরণ এবং সোফিয়ার পায়ের কাছে তার গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকা সোফিয়াকে এক ধরনের সাময়িক মানসিক শান্তি দিলেও তার ভেতরের মূল সংকটকে দূর করতে পারে না।
সোফিয়া উপন্যাসের মূল আকর্ষণ এর চূড়ান্ত মনোস্তাত্ত্বিক টুইস্ট বা নাটকীয় মোড়, যা একটি মানসিক সংকটকে এক ভয়ানক অপরাধ ও পারিবারিক ট্র্যাজেডির সঙ্গে সংযুক্ত করে। প্রথম দিকে গল্পটিকে একটি সাধারণ মানসিক অসুস্থতা মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা এক নির্মম অতীতের জট খোলে। এই নাটকীয় মোড়টি উন্মোচিত হয় সোফিয়ার নিখোঁজ চাচা ফ্রানচেস্কো কারুসোর একটি রহস্যময় চিঠির মাধ্যমে। দীর্ঘ বছর ধরে নিখোঁজ থাকা ফ্রানচেস্কো সোফিয়াকে উদ্দেশ্য করে একটি বেনামী চিঠি পাঠায়, যেখানে লেখা ছিল: ‘ইশারাগুলো বুঝতে শিখ। বইয়ের ভেতরেই আমি সব রেখে গেছি। তুই ছোটোবেলায় যে 'লিটল বেয়ার' বইটা পেয়েছিলি আমার কাছ থেকে, সেটা খুঁজে দেখ।’
এই চিঠিটি পাওয়ার পর সোফিয়ার মনে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয় এবং সে পাগলের মতো তার শৈশবের ‘লিটল বেয়ার’ বইটি খুঁজতে থাকে। কিন্তু মা মরিয়মের পরম যতেœ রাখা পুরনো স্মৃতির আলমারিতেও পাওয়া যায় না। এই ঘটনার সমান্তরালে সোফিয়ার বাবা লুইজি কারুসোর অবদমিত অপরাধবোধ জাগ্রত হতে থাকে। লুইজি যখন ফোন করে জানতে পারে যে ড. স্টিভেন কিংয়ের কাছে সোফিয়ার থেরাপি চলছে, তখন সে চরম ভয়ের সম্মুখীন হয়। অবশেষে উপন্যাসের চূড়ান্ত মুহূর্তে লুইজি সোফিয়ার ঘরে গিয়ে তার দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে লুকিয়ে রাখা এক ভয়ানক সত্য স্বীকার করে।
উপন্যাসের সবচেয়ে বড় টুইস্টটি আসে লুইজির এই স্বীকারোক্তির পর সোফিয়ার অনড় ও অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়ায়। সাধারণ সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হলেও, সোফিয়া তার পিতার অপরাধ জেনেও তীব্র ঘৃণা বা ভয়ে ভেঙে পড়েনি, বরং সে অত্যন্ত শীতল ও অবিচলভাবে লুইজির হাত স্পর্শ করে বলে: ‘তুমি যা করেছো, যদি আমি হতাম, আমি এটাই করতাম।’
সোফিয়ার এই প্রতিক্রিয়া মনে হলো যেন অবদমিত ট্রমার এই চরম উন্মোচনে অপরাধী পিতা তার কাছে এক পরম রক্ষকর্তা হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেন।
উপন্যাসের প্রতিটি পার্শ্বচরিত্র সোফিয়ার মানসিক সংকট ও সত্যের উন্মোচনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করেছে। মরিয়মের চরিত্রটি বাঙালি সমাজের চিরন্তন মাতৃত্বের এক প্রতিচ্ছবিÑযাকে নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রাচীর ভেঙে লুইজিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার মূল্য দিতে হয়েছে আপন পরিবার থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ২৪ বছরের এই সুদীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তাঁর বাবা ও ভাই কখনো তাঁর মেয়ের মুখ দেখেননি, কেবল মায়ের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ বজায় রয়েছে। এই তীব্র পারিবারিক বিচ্ছেদই মরিয়মের মনে সোফিয়াকে নিয়ে এক চরম অবসেসিভ বা অতি-উদ্বেগময় মাতৃত্বের জন্ম দিয়েছে।
লুইজি চরিত্রটি সুনিপুণভাবে দ্বিচারিতায় গঠিত। একদিকে তিনি ‘ক্যাফে লুইজি’র একজন নম্র, দায়িত্বশীল ও বন্ধুবৎসল মালিক ও ম্যানেজার, যিনি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ কাপ স্পেশাল এসপ্রেসো, ভ্যানিলা হ্যাজালনাট ল্যাটে আর ভেগান ক্রসান বিক্রি করেন এবং অতিথিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। তাঁর কণ্ঠে ইতালীয় কবি জুভান্নি কাপুরোর ১৮৯৮ সালের বিখ্যাত গান ‘ও সোল মিও’ যেন এক প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু রান্নাঘরে স্প্যাগেটি অলিও এ ওলিও রান্নার সময় রসুনের তীব্র ঝাঁঝালো সুবাস যেমন তাঁর নেপলসের শৈশবকে মনে করিয়ে দেয়, তেমনি ফায়ার অ্যালার্মের সামান্য তীব্র শব্দও তাঁর ভেতরের লুকানো স্মৃতিকে আচমকা জাগিয়ে তোলে। তিনি একদিকে ভালোবাসার এক বিশাল ছায়া, অন্যদিকে নিজের অপরাধের অন্ধকারে বন্দি এক অসহায় পিতা।
দ্বীপ নাথ সোফিয়ার জীবনে নীরব বসন্তের মতো আবির্ভূত হয়। এতিমখানায় বেড়ে ওঠা এই তরুণটির মন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। কারণ সে জানে স্নেহের অভাব কতটা ভয়ানক হতে পারে। মরিয়মের আকুল অনুরোধে ‘বাবা। কিছু একটা করো!’ দ্বীপ সোফিয়ার মানসিক বন্ধনগুলো আলগা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। সে সোফিয়াকে ভোরের শীতল আলোয় শরতের রঙিন ওক ও ম্যাপল পাতা কুড়ানোর আনন্দময় খেলায় নিয়ে যায়, যা সোফিয়ার মনকে শৈশবের সারল্যে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ওয়াফল প্যানকেক হাউজে বসে দ্বীপ যখন তার নিজের এতিম জীবনের সত্য ও কাল্পনিক মায়ের অবাস্তব রূপকথা অত্যন্ত শান্ত সুরে প্রকাশ করে, তখন সোফিয়ার দীর্ঘদিনের পাষাণসম নীরবতার বাঁধ ভেঙে যায়।
এইভাবে, উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই সোফিয়ার মনোস্তাত্ত্বিক মুক্তির গতিপথকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে এবং মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে ‘সোফিয়া’-কে সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।
সমকালীন বাঙালি সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় যে উদাসীনতা ও সামাজিক কুসংস্কার বিদ্যমান, তার ফলে ব্যক্তির মানসিক সমস্যাগুলো কীভাবে নীরব ঘাতকের মতো বড় হয়ে ওঠে এবং এক সময় ব্যক্তির বাস্তব অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলে, তা এই উপন্যাসে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এইচ বি রিতা।
বইটি প্রকাশ করেছে ঘাসফুল প্রকাশনী ২০২৬ এ, প্রচ্ছদে আছেন সাহাদাত হোসেন। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আধুনিক মনোরোগবিদ্যার ফরাসি পথপ্রদর্শক ফিলিপ পিনেলকে, যিনি ১৭৯৩ সালে মানসিক রোগীদের শিকলবন্দী দশা থেকে মুক্ত করে এক মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেছিলেন। মুখবন্ধে আছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান (মহাপরিচালক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট)।
