লাইলাক ফুটতো যেখানে || শাহাব আহমেদ

অপ্রত্যাশিতভাবেই দেখা। 

কত বছর হল?’

বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস আটদিন’Ñআমার দিনক্ষণ ওর মত নিঁখুতভাবে মনে নেই। লেনিনগ্রাদে সে দুবছর ছিল, আমি আঠারো। মানে আজ থেকে সেই বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস আটদিন আগে সে চলে যায় ইউক্রেনে, লভভ নামে একটা শহরে। হাড় পাতলা হয়ে যাওয়া পর্যন্ত নাকি ওখানেই ছিল। তারপরে ব্যালিস্টিক উৎসব উত্তেজনায় ন্যাংটা হয়ে উঠলে পৃথিবী, অজস্রের সঙ্গে সেও পালিয়ে আসে। শহরটি পোল্যান্ডের কাছাকাছি। সাম্যের সেই লগ্নেই শুনেছি ওখানকার লোকজনের নাকগুলো অন্যধরনের, ওই দেশের অন্য সবার মত নয়। চাইনিজ বা জাপানিদের নাক অন্য রকম হয় জানতাম কিন্তু শোষণ মুক্তির আতুড় ঘরে? বিশ্বাস হতো না। যাই হোক, আমি ওই শহরে যাইনি, বেশি বলা ঠিক হবে না। তা ছাড়া, আমার চোখ ট্যারা, নাক দেখে মানুষ চিনতে পারি না। আমার একটা প্রেমিকা ছিল ওই শহরের, জাত খখলুশকা, কিন্তু মুরগীছানার বুকের নিচের হলদেটে নরম পালক যেমন ঠিক তেমনটাই ছিল সে, আর নাকটা..কী..

খখলুশকা শব্দটা খটোমটো, খখলের স্ত্রীলিঙ্গ, একটু আদর করে ওভাবেই বলা যায়। রুশরা মানবপ্রেমী, তবে প্রায় আবহমান কালের একটু কম সময় ধরে ওরা ইউক্রেনের ছোট-ভাই বোনদের ওই নামে ডাকতো, ওদের পিত্ত জ্বলতো কিন্তু বড় ভাই-বোনরা ব্যাপারটা বুঝতো না বা বুঝতে চাইতো না, বলতো ওরা তো আমরাই। কথাটায়ও আপত্তি ছিল, ওরা বলতো আত্মীয়, কিন্তু আমরা আমরাই, আর তোমরা তোমরা। আর যদি তোমরা-আমরা মিলে সত্যিইআমরাতবেছোটভাই’ ‘বড়ভাই’, ‘মালা-‘রস’, ‘ভেলিকা-রসবলো কেন

সব জাতিরই হাড়ির নিচে কিছু কালি থাকে। ওই শব্দগুলোও এক কালে উচ্চারিত হয়েছে, ‘মালা-রস’ -ছোট রাশিয়ান, ‘ভেলিকা-রস’- শুধু বড়ই নয়, বিশাল রাশিয়ান। ওগুলো জার আমলের কথা, তখন তো কত কথাই হোত, হতো বলেই বিপ্লব হয়েছে, বেশিরভাগ মানুষ ওসব ভুলেই গেছে, ‘মালায়-ভেলিকায় বিয়ে হয়েছে, সন্তানাদী জন্মেছে। ওরা দেখতেও এক, শুনতেও এক, দিলেও ভোলগা-নীপার সমান। কিন্তু সবাই সব ভুলে গেলে দুনিয়াদারী চলবে কী করে? যুদ্ধই তো সভ্যতার ইন্জিন, নাকি অন্য কিছু

যাই হোক, দূরে সরে গেছি।

কী খাবে?’-প্রশ্ন করি।

ভদকা।

জল বা সোডা?’

ওভাবে তো মেয়েরা খায়।

এই প্রশ্নে আমরা দুজনই পুরুষ। সে পুরুষ হয়ে উঠেছে ইউক্রেনে আর আমি রাশিয়ায়, সতরাং যে বিষয়ে মিল থাকার কথা নয়, সেখানে আমাদের অমিল বেশ। ওর নাকটাও আগের চেয়ে ভিন্ন, লাল, মোটা, থেতলা, এলকোহলিকদের নাকের যে একটা ডাক্তারি নাম আছে, ‘রাইনোফাইমাতা সহজেই চোখে পড়ে, তবে সেটাই সব নয়। যে অমিলের কথা মুখ-ফস্কে এসে গেল তা ইদানিং বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করেছে আমাদের মধ্যে। বন্ধু, পরিচিত, কমরেড, যাকে যে নামেই ডাকি না কেন ওই দেশে পড়াশুনো করা প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী, অর্থাৎ এখন যারা পঞ্চাশ অতিক্রম করেছে, বা বুড়ো হয়ে গেছে বা বুড়ো হই হই করে হৈ হৈ করার ক্লান্তি এড়িয়ে ঘরে বসে থাকে, অথবা গত চারবছরে যারা মারা গেছে বা শিগগিরই মারা যাবে, তাদের মধ্যে রাগারাগি, গালাগালি, হাতাহাতি হয়ে গেছে। 

অথচ, যারা ওই দেশে বড় হয়েছে, দেখা হলেকী খবর’, ‘কেমন আছোএই দুই বাক্যের পরে তৃতীয় বাক্য থেকে শুরু হতো সেই দেশের স্মৃতিচারণ, ভালো-মন্দ, পি-ি চটকানো ইত্যাদি ইত্যাদি। এটাই নিয়ম ছিল, ব্যতিক্রম হতো তখনই যদি দুজনের একজন ওই দেশ না মাড়িয়ে থাকে। কিন্তু এখন সব সয়লাব, কে কোন্ পক্ষ এই প্রশ্নটা বাঁচা-মরার প্রশ্নের চেয়েও বড়।

কিন্তু আমাদের আওতায় ভদকার বোতল। জিনিসটা আদর্শ-নিউট্রাল, জোট-নিরপেক্ষ, নির্দিষ্ট ডোজ পর্যন্ত কে মানব, কে দানব, বা কে পঙ্গ, পতঙ্গ সেই প্রশ্নের অবতারণা হলেও তীব্র হয়ে ওঠে না। সম্ভবত কারণেই যারা জানে দোযখে যাবে এবং সেখানে এইমালপাবে না, তৃার চেয়েও বেশি পান করে। তারপরে বমি করে, মারামারি করে এবং কী না করে। আমি সচেতন থাকি অতদূর না যেতে, তাছাড়া আমার হাঁটু ব্যথা, বেশি বেশি খেলে ঢেকুরও আসে।

যুদ্ধটা অন্যায় কিনা, বলেন।

একশভাগ অন্যায়।

আপনি কার পক্ষে?’ 

তিনি মারা যাবার আগ পর্যন্ত আমি শ্রীচৈতন্যের পক্ষে ছিলাম।

হেইডা আবার কে?’ তার জঠরমুক্ত মাতৃভাষা বলে, মগজে তরল সিঁদ কাটতে শুরু করেছে।

বইয়ের ভাষায় কথা বলে আমারও তৃপ্তি হয় না। ভদকা আমাকেও কিছুটা মুক্তির আনন্দ দিতে শুরু করেছে।আরে ভাই কইও না, আমাগো আজাইরা দেশে কিছু বোকা-সোকা লোক জন্মাইছিল না? শ্রী চৈতন্য তাগো একজন। কইতোদিয়াছিস কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দিমু না?’ বুঝলা কথা? মিসাইলের যুগে? মানুষটা মইরা গিয়া বাঁচছে।

হাহ্ হাহ্ হা, মইরা গ্যাছে? যাক গিয়া, আপনে যুদ্ধের কথা কন।

শোনো, তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। না, মতো না, তুমি আমার ছোট ভাই। যুদ্ধের কথা তুইলো না, তোমার সাথে বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস আটদিন পরে দেখা, আর বেয়াল্লিশ বছর পরে কেউ কারে খুঁইজ্জাও পামু না। রাশিয়া কও, ইউক্রেন কও, আমাদের সময়ে দেশটা আছিল লাইলাক আর ল্যুবভের দেশ। আরে লভভ্ না, ল্যুবভ্, বুঝছো? প্রেম! মে মাস আইলে লাইলাক ফুটতো আর প্রেম প্রজাপতির মত উইড়া বেড়াইত। মনে নাই?’

হাহ্ হাহ্ হা, দারুন কথা মনে করাইয়া দিলেন। সময় একটা আছিল, আর নাই। ল্যুবভ্! আহা কই গেল সেই দিন!’

কোনো একদিন যুদ্ধ থেমে যাবেমৃতেরা এই বিশ্বাস নিয়ে থাকুক। মিসাইল মেরে, রক্ত চুষে, শিশু ধর্ষণ করে মানুষ ঠিকই বাঁচবে এই পৃথিবীতে এবং প্রেমের জায়গায় কম-বেশি ধরা থাকবে চিরদিন।সময় আছিল, আর নাই’-এই কথাটাও ঠিক নয়। ভোলগা থাকবে, নীপার থাকবে, পদ্মা-যমুনা থাকবে, প্রেম করার পাত্র-পাত্রী থাকবে, সময় থাকবে না কেন? প্রেমে পড়ে বীর লেতুর হবে, লেতুর হবে বীর, আবার কেউ কেউ কবি হবে, নয় আত্মহত্যা করবে। কিছু কিছু যুদ্ধ থাকবে যেখানে বিজয়ী হবে বিজিতের চেয়েও বেশি পরাজিত। 

আমার সঙ্গি আনমনা হয়ে গেছে, স্তপকার পর স্তপকা স্বচ্ছ তরল গলায় ঢালছে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি তার মুখের মিমিক, সে এখানে নেই, চলে গেছে অন্য কোথাও।    

চুপ কইরা গ্যালা কেন?’

ঝেনিয়ার কথা মনে পইড়া গেল। আপনে অরে দেখছিলেন? না। আমি অরে কারেও দেখাই নাই। ছিল আমার প্রথম প্রেম। আপনের কথা ঠিক, মে মাসে পরিচয় হইছিল। নেভা নদীর তীর দিয়া হাঁটতাম আর দেখতাম ওকে। নিয়মিত হাঁটতো। 

মার্চের শেষে ওকে প্রথম দেখি, তখনও নদী জমাট। রাস্তা ঘাটে একটু একটু বরফ গলতে শুরু করেছে, কাদা আর জল। এর মধ্য দিয়েই হাঁটি। এপ্রিলে নদী নড়তে শুরু করে, বরফ গলে, স্রোত দেখা দেয়। আমার চোখ পড়ে থাকে ওর দিকে। মে মাসে হাজার হাজার বরফ - নিয়ে নদী ছোটে দ্রুত। মাত্র একমাস আগেও যে ছিল থির, সে এখন কেমন পাগলের মত, বুকের ভেতরটায় কেমন করে বলতে পারি না। দেশ থেকে এসেছি আট মাস পার হয়ে গেছে। কী যে একটা শূন্যতা! হাওয়ায় এখন আর শীত নেই, শরীরে সুড়সুড়ি দেয় মিষ্টি অনুভূতি। আর লাইলাক চারিদিকে, সাদা, লাল, নীল, গোলাপি, ফুল আর ফুল। জীবনের এই প্রথম দেখা হাফেজ স্যারের বেহেশত। 

তারপরে সাহস করে একদিন ওর কাছে এগিয়ে যাই। হাসে, ‘তোমাকে প্রায়ই হাঁটতে দেখি। ইন্ডিয়া?’ - স্ট্যাম্প-মারা প্রশ্ন।

না, বাংলাদেশ।

তার মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে, যেন খোঁজে এই নামের দেশটা কোথায়। খুঁজে পায়, ‘জর্জ হ্যারিসনের বাংলাদেশ?’

প্রথমে ধাক্কা খাই, তারপরে হাসি।হ্যাঁ, জর্জ হ্যারিসনের বাংলাদেশ।

বন্ধুত্ব হতে সময় লাগে না। আমাদের হোস্টেলের ছয়তলা দালানটা মুখ বরাবর যে চার তলা হোস্টেলটির দিকে তাকিয়ে থাকে সেখানে থাকে সে। চার বছরের পড়াশুনো শেষ হয়ে যাবে জুন মাসে। তারপরে চলে যাবে নিজের শহরে। 

নিয়মিত হাঁটি একসাথে। ভাষাটা পুরো রপ্ত হয়নি কিন্তু আমাদের কথা বলতে অসুবিধা হয় না। মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে যাই। মারিনিনস্কি থিয়েটারে যাইসোয়ান লেকদেখতে। ওটা ছিল সর্বনাশা সন্ধ্যা, ওর প্রেমে পড়ে অন্তরে ফতুর হয়ে যাই।

কিন্তু সে সংযত, বন্ধুই, আর কিছু নয়। ওর পাশে হাঁটতে আমার কষ্ট হয়, শরীর টনটন করে, পেশির প্রতিটা আঁশ ফুলে উঠেছে আকাংখায়। একটা ফালতু বাংলা শব্দ আছে নাপ্রদাহ’ , ওই শব্দ দিয়া এই কষ্টটারে বুঝানো যাইবো না। অথচ পাশে না থাকলে শ্বাস নিতে পারি না। কয়েকটা পরীক্ষায় ফেইল মারি। জুনের শেষ। দুজনে হাঁটছি নেভার তীর ধরে। বোটানিকাল গার্ডেনের পাশে যে কান্তিমিরভস্কি ব্রিজটা আছে না, সেই দিকে। শুরু হল বৃষ্টি, ফোঁটাগুলো মোটা, বড়, ভারী। দৌড়ে ব্রিজের নিচে দাঁড়াই, রাস্তাটা ব্রিজের পরে আর সামনে যায়নি, কন্সট্রাকশন চলছে, বন্ধ। এখানে গাড়ি চলে না, লোকজন নেই। দুজন নির্জনে, খুব কাছে। চারিদিকে যেন ছাই মুড়িয়ে দিয়েছে। কলসি উল্টানো আকাশ। ওকে আলিঙ্গন করতে চাই, সে দুহাত দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখে।

ঠোঁটে চুম্বন করতে চাই, সে মুখ সরিয়ে নেয়, শেষ পর্যন্ত গালে অনুমতি দেয়। রফা হয়, আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াই, সে আমাতে হেলান দেয়। ওর পিঠটা আমার বুকে। তীব্র আকর্ষণে ওকে আঁকড়ে থাকি। মনে হয় পাঁজরগুলো খুলে ওকে লুকিয়ে রাখি গহীনে। মসৃন গলার পাশে নাক রেখে ঘ্রাণ নিই। সে কোনোমতেই আমাকে বুকের স্পর্শ দেয় না।

আমি অন্যের। পাগলামি করো না। রাগে যাবো।মৃদুস্বরে বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। হাত ধরে টানে-‘চল যাই।

বৃষ্টি তো!’

বৃষ্টিতে ভিজবো।

আকাশেরও এত জল নেই, যত আছে চোখে, কিন্তু সেদিন দুজনেই নেভায় সাঁতরে ফিরেছিলাম।

বিছানায় পড়ে আছি, জ্বর, মাথা তুলতে পারি না। দেহের সমস্ত শক্তিটুকু অনিশেষে পান করে গেছে অদৃশ্য জোঁক। শূন্য ঘর। পাঁচদিন ধরে অসুস্থ। ঘুমিয়ে আছি, স্বপ্নে দু:স্বপ্ন সব, আগা মাথা নেই, কে যেন তাড়া করছে, আমি ছুটছি, ছুটছি কিন্তু যেখানে ছিলাম, তার থেকে একটুও এগোতে পারিনি। 

টুক্ টুক্ টুক্।

আওয়াজটা ঘুমের ভেতরে, দৌড়াতেই থাকি।

টুক্ টুক্ টুক্। এবার একটু জোরে। 

কে?’

আসবো?’

দরজা খোলা।’ - পাশ ফিরে আবার দৌড়ে ডুবে যাই। 

ধোয়াশায় দেখি ছায়া, ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে বিছানার কাছে। নিজের নামটা শুনতে পাই, চোখ খুলি।

শুয়ে আছো কেনো? কী হয়েছে? দেখি..’ , কপালে হাত দেয়, ‘এত বেশি জ্বর! ওষুধ খেয়েছো?’

কণ্ঠটা ভীষণ পরিচিত। যে আমাকে তাড়া করছে তার কণ্ঠের মত নয়, প্রকৃতপক্ষে তার কণ্ঠ আমি কখনও শুনিনি, কিন্তু এই কণ্ঠটা চিনি। সে ব্যাগ হাতড়িয়ে প্যারাসিটামল বের করে, পানি দেয়। 

চেতনায় ফিরি। একজোড়া চোখে গিয়ে দৃষ্টি ঠিকরে ফিরে আসে। মুখে ওর ধূসর বিষণœতা উদ্বেগ। কিন্তু তা দ্রুত কেটে যায় এবং হাসিতে ঝলমল করে ওঠে, ‘তা হলে এই কথা! যাক বাঁচা গেল।

কী।

সেদিনের পরে আর আসোনি, ভয় পেয়েছিলাম, ‘আমি অন্যেরকথাটি শুনে তুমি আমাকে ত্যাগ করেছো। কিছুতেই মানতে পারিনি। চলে যাবার আগে সত্যটি জানতে এসেছি। জানলাম। তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে, এবং জীবনটা..কী জানো.. এখানেই শেষ নয়।

এই প্রথম এবং এই শেষ, সে আমাকে চুম্বন করে। কপালে। গালে। ঠোঁটে।  দীর্ঘক্ষণ সে তার ঠোঁটদুটো আমার ঠোঁটে রেখে দেয়, তারপরে উঠে দাঁড়ায়। 

পড়াশুনো শেষ..জীবনটা সামনে..

অথচ..আমি ভাবি, জানেন, জীবনটা..একটা দীর্ঘশ্বাস কণ্ঠাস্থিতে আটকে যায়..পেছনে।

মে  , ২০২৬ 

Related Posts