মেক আমেরিকা ড্রীম এগেইন || ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক

আমেরিকার রাজনীতির আকাশ আজ এক ধূসর ও জটিল কুয়াশায় সমাচ্ছন্ন। বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব আছে, নৈতিক নেতৃত্ব নেই। স্বপ্নের আমেরিকার মন্থর অন্তর্ধান এখন যেন দৃশ্যমান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনকাল যেন এক আশ্চর্য আয়না, যার সামনে দাঁড়ালে পরাশক্তির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও ঔদ্ধত্য যুগপৎ উঁকি দেয়। হোয়াইট হাউসের অলিন্দে আজ যে সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হচ্ছে, তা কেবল দূরপ্রাচ্যের মরুভূমি কিংবা ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রকেই আন্দোলিত করছে তা নয়, বরং খোদ ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলের ভিত্তিপ্রস্তরকেও তা কাঁপিয়ে তুলছে। বৈদেশিক নীতির চোরাবালি, আইনসভার সুতীক্ষè প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ আদর্শিক সংকীর্ণতাÑসব নদী যেন আজ এক মোহনায় এসে মিশেছে। ক্ষমতার দম্ভ যেখানে প্রবল, সেখানে সম্মতির ভিত যে কতটা নড়বড়ে হতে পারে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন তার এক জ্যান্ত দলিল। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের বিশ্লেষণে যা সামনে চলে আসে তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলের সেই বহুল আলোচিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি আজ কেবল কাগজের বুদবুদ। ৩ জুনের প্রত্যুষে কুয়েতের আকাশে যখন ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন শোনা গেল, কিংবা বাহরাইন উপকূলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ যখন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে শান্তি এক অলীক আকাঙ্খা, মরীচিকা। হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ জলরাশিতে ট্যাংকার আটক আর পাল্টাপাল্টি হামলার এই যে খেলা, তা রয়টার্স কিংবা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পাতায় কেবল সংবাদ নয়, এক গভীরতর ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত। আমেরিকার মত সুপার-পাওয়ার আর ইসরাইলের মত সমরাস্ত্রে বলিয়ান যুদ্ধবাজ দেশ যৌথভাবে যেন হিমশিম খাচ্ছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে।

অথচ এই বারুদগন্ধী পরিস্থিতির ভেতরেও এক বিচিত্র ও কৌতুকাবহ কুহক তৈরি করা হচ্ছে। একদিকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বলছেন-‘আলোচনা চলছে, সব ঠিক হয়ে যাবে’, আর অন্যদিকে সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও শান্তির এক অবাস্তব খসড়া সাজাচ্ছেন। এ যেন সেই বিখ্যাত প্রবচনÑহাতে খঞ্জর, মুখে প্রেমের বাণী। ষাট দিনের এক মায়াবী কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে, যেখানে ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের শর্ত আছে, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে আছে কেবল পারস্পরিক অবিশ্বাসের দেয়াল। এই দ্বৈত সংকেতের কূটনীতি আসলে কোনো শান্তি আনে না, বরং এক অনন্ত যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই দোদুল্যমানতা তার চিরস্থায়ী মিত্রদের চিন্তায়ও বিভ্রান্তির উদ্রেক করেছে। লেবানন ইস্যুতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ক্ষমতার অন্দরমহলের নগ্ন রূপটি প্রকাশ করে দেয়। জনশ্রুতি আছে, ক্ষুব্ধ ট্রাম্প তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্রকে ‘পাগল’ বা ‘ক্রেজি’ বলে অভিহিত করতেও দ্বিধা করেননি। এটি কোনো ব্যক্তিসংঘাত নয়, এটি আসলে এক ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের মনস্তাত্ত্বিক সংকট। আমেরিকার অস্ত্রগুদামে আজ প্রচুর মারণাস্ত্র আছে, কিন্তু অন্যকে প্রভাবিত করার মতো সেই নৈতিক ও প্ররোচনামূলক আভিজাত্যটি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

ভিতরে যখন এই ক্ষয়, তখন মার্কিন কংগ্রেস তার সাংবিধানিক চাবুকটি হাতে তুলে নিয়েছে। ৩ জুনের প্রতিনিধি পরিষদের ভোটটি মার্কিন ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। ২১৫-২০৮ ভোটের এই ব্যবধানে কেবল ডেমোক্র্যাটরা নয়, টমাস ম্যাসি বা ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিকের মতো চারজন কট্টর রিপাবলিকানও দলীয় আনুগত্য বিসর্জন দিয়ে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতার দক্ষিণ পাখায় আঘাত করেছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ছায়া থেকে জন্ম নেওয়া ‘ওয়ার পওয়ার্স রেজোলিউশন’ আজ আবারও প্রাসঙ্গিক। হোয়াইট হাউস হয়তো ভেটো দিয়ে একে নস্যাৎ করতে চাইবে, কিন্তু এই ভোটের মাধ্যমে কংগ্রেস স্পষ্ট জানিয়ে দিলÑগণতন্ত্রে রাজার ইচ্ছেই শেষ কথা নয়।

পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের দাবিÑইরানকে পরমাণু মুক্ত করতে এই পেশীশক্তির আস্ফালন জরুরি। কিন্তু সাধারণ মানুষের হেঁশেলের খবর ভিন্ন। ফক্স নিউজের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, দেশের ষাট শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, আর একানব্বই শতাংশ নাগরিক মনে করছেন এই যুদ্ধের কারণেই তাঁদের যাতায়াত ও জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। জনসমর্থনহীন যুদ্ধ আসলে এক ধরনের জুয়া, যা শাসকের অহং চরিতার্থ করলেও রাষ্ট্রকে দেউলিয়া করে।

কংগ্রেসের এই অবাধ্যতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ‘ডিসচার্জ পিটিশন’-এর মাধ্যমে যেভাবে ট্রাম্পের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইউক্রেন সহায়তা বিলকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে, তা এক নীরব বিদ্রোহের শামিল। নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার এই যে প্রবণতা, তা মার্কিন শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের এক মরিয়া চেষ্টা।

আমেরিকার এই জবরদস্তিমূলক নীতির রূপটি ঘরোয়া রাজনীতিতেও সমানভাবে দৃশ্যমান। ‘মেডিকেইড’ বা দরিদ্রদের স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে যে কঠোর শ্রম-শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মার্কিন নাগরিকের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সুতোর ওপর ঝুলছে। একে যদি কেউ ‘প্রশাসনিক শৃঙ্খলা’ বলে চালাতে চায়, তবে বলতে হবেÑএ এক নির্মম শৃঙ্খলা। বাইরে যেমন বোমাবর্ষণ, ঘরের ভেতরেও তেমনি দরিদ্রের ওপর অর্থনীতির নীতিগত খড়্গহস্ত প্রসারণ। এ কোন প্রহসন?

সেনাবাহিনীর অন্দরমহলেও আজ অস্থিরতার হাওয়া। ফেডারেল আদালত যখন ট্রান্সজেন্ডার সৈনিকদের তাড়ানোর সরকারি ফরমান সাময়িকভাবে স্থগিত করে, তখন প্রমাণিত হয় যে সংবিধানের ‘সমান অধিকারের’ ধারণাটি হোয়াইট হাউস ভুলে গেলেও বিচারালয় ভোলেনি। আবার অভিজ্ঞতাহীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যখন জ্যেষ্ঠ নৌ-কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে দেন আদর্শিক আনুগত্যের দাঁড়িপাল্লায়, তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে পেশাদারিত্বের চেয়ে স্তাবকতা আজ বেশি সমাদৃত।

এমনকি সিনেটের ভেতর ১.৮ বিলিয়ন ডলারের তথাকথিত ‘অ্যান্টি-উইপনাইজেশন’ তহবিল নিয়ে যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি চলছে, তা রিপাবলিকান দলের ভেতরের ফাটলকেই স্পষ্ট করে। দলীয় অনুদান বা রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে এই অর্থ ব্যবহৃত হবে কি নাÑএই সংশয় খোদ ট্রাম্পের সতীর্থদের মনেই জাগ্রত হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক খামখেয়ালিপনার খতিয়ান আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমেরিকার মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। ‘পিউ রিসার্চ’-এর তথ্য বলছে, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ আজ মার্কিন নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। আরও লজ্জাজনক তথ্য এনেছে বৈশ্বিক গণতন্ত্র জরিপÑযেখানে দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সুনামের সূচকে আমেরিকার অবস্থান আজ রাশিয়ারও নিচে। শিকাগো কাউন্সিলের সমীক্ষায় আমেরিকানরা নিজেরাই স্বীকার করছেন, এই অন্তহীন যুদ্ধবিগ্রহ তাঁদের জাতীয় নিরাপত্তাকে মজবুত করার বদলে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে।

ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষাটি অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর; বাহুবল মানুষকে নতজানু করতে পারে, কিন্তু শ্রদ্ধাবনত করতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে আমেরিকার ডলারের জোর কিংবা অস্ত্রের ঝনঝনানি হয়তো এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে তীব্র শব্দ, কিন্তু তার ভেতরের সুরটি আজ কেটে গেছে। যে রাষ্ট্র তার সহযোগিদের বিশ্বাস করতে পারে না, ঘরের ভেতরের ভিন্নমতকে শত্রু মনে করে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখায়Ñতার ‘প্রভাব’ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো নৈতিক নেতৃত্ব থাকে না। শক্তি যখন বৈধতা হারায়, তখন তা কেবল স্বৈরাচারে রূপ নেয়। আর ট্রাম্পের আমলে অভিবাসীদের দুর্ভোগের কথা কে না জানে। তাই সেই স্বপ্নের আমেরিকার কথা মনে করে বর্তমান আমেরিকার দিকে তাকালে সচেতন যে কোন নাগরিকের মনেই প্রশ্ন জাগে, স্বপ্নের আমেরিকা কি তাহলে মন্থর গতিতে সুদূরে মিলিয়া যাচ্ছে? পরাক্রমের আস্ফালনে আমেরিকা কেবল বিশ্বমঞ্চে শুধু বন্ধুই হারাচ্ছে তা নয়, হারাচ্ছে নিজের আত্মাকেও। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে গণতান্ত্রিকভাবে গণতন্ত্রকে রক্ষা করা, আসন্ন মিডটার্ম ইলেকশনে দেশপ্রেমিক প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত ‘রাজার ভয়ে ভীত’ কংগ্রেসকে গণতন্ত্রের সুগন্ধি নির্যাস দিয়ে অবগাহন করানো।

‘মেক এমেরিকা ড্রিম এগেইন’, Make America Dream Again !!


Related Posts