তোফায়েলের তিরোধান: বিস্ময়ে বিমূঢ় বাংলাদেশ || আনিস আহমেদ
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু কোন আকস্মিক ঘটনা নয়; তিনি বেশ দীর্ঘ দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন, হাসপাতালেও ছিলেন অনেকদিন। সুতরাং বেদনাহত হলেও আমরা তাঁর এই মৃত্যুতে বিস্মিত বোধ করছি না; আমাদের বিস্ময় ও বেদনা তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নির্মমতায়। তোফায়েল আহমেদকে বাংলাদেশের জনগণের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। তিনি কেবল একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মুক্তি সংগ্রামী। সেই সংগ্রামের সূচনা ১৯৬৯ সালে যখন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। তদানীন্তন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান যখন তাঁর কথিত উন্নয়ন দশক উদযাপনের সমান্তরালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফা দাবিতে ভীত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আইয়ুব সরকার এমন একটি মামলা দায়ের করেছিল যে সাজানো মামলায় তাঁর প্রাণদন্ড হতে পারতো। কারণ আইযুব-মোনায়েম এবং তাদের সহযোগীরা খুব ভালো করেই জানতো যে ৬-দফার বাস্তবায়ন মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হওয়া। অতএব ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর উত্থাপিত এই প্রস্তাব নস্যাৎ করতেই ষড়যন্ত্র মামলার এই সরকারি ষড়যন্ত্রের উদ্ভব। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোদ্ধারা যখন সামরিক কারাগারে বন্দী এবং তাঁর ফাঁসির মঞ্চ যখন আমাদের প্রায় দৃষ্টিগোচরে, তখন সেই মঞ্চের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যিনি জীবনের জয়গান গাইলেন বলিষ্ঠ কন্ঠে তিনি কিন্তু আর কেউ নন, স্বয়ং তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। ১৯৬৯ এর সেই আন্দোলনে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্ব ছিল নিরাপোষ। বস্তুত ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। সেইসময় ডাকসুর সহসভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সেই অভ্যুত্থানের মুখে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন আইয়ুব খান। পরদিন তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে তোফায়েল শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। আইয়ুব খানের পতন হয়েছিল সেই গণঅভ্যুত্থানের ফলে আর যেমনটি সকলেই জানেন ১৯৬৯ এর সেই গণ-অভ্যুত্থানের কর্ণধার ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায়শই মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন এবং নানান ভাবে এটা সকলকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে মুক্তিযুদ্ধকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না। অথচ সেই তারেক রহমান ও তাঁর সরকার বেমালুম ভুলে গেলেন যে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে যে গণঅভ্যুত্থান হয় তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে সুগম করে তোলে। তাহলে কি তারেক ও তাঁর সহযোগীরা মুক্তিযুদ্ধ বলতে কেবল জিয়াউর রহমানকে বোঝান? ইতিহাসের সেই রিসেট বাটন কি আর ঠিক করতে চাইলেন না তারেক রহমান? আমাদের বিস্মিত বেদনার অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথমত এই তোফায়েল আহমেদ যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে, তখন কি বিএনপি’র কোনো নেতা তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন? সরকারের তরফ থেকে তাঁর উন্নত চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা কি নেয়া হয়েছিল? তোফায়েল আহমেদের চিকিৎসার জন্য কোনো নির্দেশনা কি তারেক সরকার দিয়েছিল? এ রকম বোধ হয় বহু প্রশ্ন করা যেতে পারে। তবে জানি সব ক’টির জবাব হবে নেতিবাচক। নয় বারের সাংসদ তোফায়েল আহমেদের জানাজার নামাজ কোনো খোলা জায়গায়, কিংবা বিশেষত সংসদ ভবন চত্ত্বরে কেন পড়াতে দেয়া হয়নি সে জবাব কে দেবে? অশ্লীল বাক্যবাণে যে লোকটা সকলকে জর্জরিত করেছিল সেই জনৈক হাদীর জানাজার নামাজ যখন সংসদ ভবনের খোলা চত্ত্বরে অনুষ্ঠিত হয় এবং তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে কবর দেয়া হয়, তখন সদ্য প্রয়াত তোফায়েল আহমেদের প্রতি এই অসম্মান কেন? একটা বড় রকমের আতংক এই সরকারের মধ্যে কাজ করেছে যে তোফায়েল আহমেদের জানাজা যদি উন্মুক্ত স্থানে হয় তাহলে তাতে বিপুল জনসমাগম হবে এবং সেখানে আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্লোগান শোনা যাবে। সরকারের এই আশংকা যে মিথ্যে ছিল তা নয়, কারণ তাকওয়া মসজিদের অভ্যন্তরেও তাঁর জানাজার নামাজ শেষে জয় বাংলা শ্লোগান দিয়েছেন বহু লোক এবং এই জয় বাংলা শ্লোগান দেয়াকে সরকার যে অপরাধ বলে গণ্য করে তার প্রমাণ হলো যারা শ্লোগান দিয়েছিলেন তাদের অনেককে পুলিশ আটক করেছে। জয় বাংলা স্বাধীন বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্রীয় শ্লোগান। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই এই শ্লোগানে সোচ্চার ছিলেন বাংলাদেশের গণমানুষ। অতএব এটি কোনো রাজনৈতিক দলের শ্লোগান নয়, এটি হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শ্লোগান। এই শ্লোগানেও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে সরকার। আর কেবল তোফায়েল আহমেদের জানাজার পর নয়, এর আগে আওয়ামী লীগের আরও কিছু নেতার জানাজার পরও এই একই রকম শ্লোগান ওঠে। এর ফলে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের আশংকায় সরকারের মনে খানিকটা যে ভীতির সঞ্চার হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। সম্ভবত দূরদর্শিতার অভাবেই তারেক বুঝতে পারছেন না যে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন তাঁর সরকারের জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দিতে পারে। কারণ জামায়েতে ইসলামি দল যে প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইছে তা রুদ্ধ হবে যদি আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়।
তোফায়েল আহমেদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান যেমন উন্মুক্ত প্রান্তরে করতে দেয়া হয়নি, তেমনি তাঁর মরদেহকে শহীদ মিনারে কিংবা জাতীয় স্মৃতি সৌধে নিতে দেয়া হয়নি। তারেক রহমান তো দূরের কথা, বিএনপি’র কোনো নেতা-কর্মীও এতে যোগ দেননি; এমনকি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যিনি ভোলায় গেলে তোফায়েল আহমেদের বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন, তিনিও সচেতনভাবেই ভুলে গেলেন তোফায়েল আহমেদকে। ক্ষমতার লোভ ও নেতার প্রতি চাটুকারিতার এ এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তারেক রহমান ভুলে গেছেন যে তাঁর ভাই কোকো যখন মারা যান, তখন বেগম জিয়ার বাসস্থানে শোক জানাতে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু রাজনৈতিক বৈরিতা পুত্রশোকের চাইতেও এতটাই গুরুত্ব পেল যে শেখ হাসিনাকে নিজ বাড়িতে প্রবেশ করতে দেননি খালেদা জিয়া। সেই তারেক রহমান আজও প্রায় একই রকম কাজ করলেন তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে। এ কথা সত্যি যে পরের দিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদকে কোণঠাসা করা হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে যারা খানিকটা ভুল পথে পরিচালিত করে তাঁর সঙ্গে প্রবীণ নেতাদের দূরত্ব বাড়াতে চেয়েছিল, তাদের ভুল কথায় শেখ হাসিনাও প্রতারিত হয়েছিলেন এবং ড. কামাল হোসেন, তোফায়েল আহমেদ কিংবা অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ানো হয়েছিল। এ সব কিছুই ছিল সেই ষড়যন্ত্রের অংশ যার শিকার হন শেখ হাসিনা স্বয়ং। তবে শেখ হাসিনা কখনই এঁদের অপমান করেননি। তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে তিনিও শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
সকলেরই অনুধাবন করার সময় এসেছে যে তোফায়েল আহমেদের যাওয়া তো নয় যাওয়া, তাঁর মৃত্যু প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতিকে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে এবং সম্ভবত আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে আরও সজীব করে তুলেছে।
