আমেরিকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নারীদের জয়-জয়কার
ফরচুন প্রতিবেদনঃ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কাজ করছেন রেকর্ডসংখ্যক নারী। চলতি বছর ফরচুনের তালিকার ১১ দশমিক ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী সিইও।
ফরচুন সাময়িকীর তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ফরচুন ৫০০ তালিকার ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নারী। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম রাজস্বভিত্তিক কোম্পানিগুলোর তালিকার ৭২ বছরের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সঙ্গে টানা চতুর্থ বছরের মতো নারী নেতৃত্বের হার ১০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
তবে এ অগ্রগতির বছরেও দায়িত্ব ছেড়েছেন বেশ কয়েকজন আলোচিত নারী সিইও। এর মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ওরাকলের সাফরা ক্যাটজ, আবাসন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ফ্যানি মের প্রিসিলা আলমোদোভার এবং চকোলেট নির্মাতা হার্শির মিশেল বাক। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের বিদায় ঘটে। বিশেষ করে প্রিসিলা আলমোদোভারের বিদায়ের ফলে ফরচুন ৫০০ তালিকায় কোনো ল্যাটিন নারী সিইও আর থাকলেন না। এছাড়া প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিষ্ঠান এসএআইসির সিইও টনি টাউনস-হুইটলিও পদ ছাড়েন। তার বিদায়ের পর কিছু সময়ের জন্য ফরচুন ৫০০ কোম্পানির মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিইওর সংখ্যা নেমে আসে মাত্র একজনে। তখন কেবল টিআইএএর প্রধান থাসুন্ডা ব্রাউন ডাকেট দায়িত্বে ছিলেন। পরে ডিটিই এনার্জির প্রধান নির্বাহী হিসেবে জয় হ্যারিস দায়িত্ব নেয়ায় সে সংখ্যা আবার বাড়ে। খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ফুট লকারের প্রধান মেরি ডিলনও আর ফরচুন ৫০০ সিইওর তালিকায় নেই। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ডিকস স্পোর্টিং গুডসের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর এ পরিবর্তন আসে।
তবে এসব বিদায়ের পরও নারী সিইওর সংখ্যা কমেনি। বরং নতুন নিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির মাধ্যমে তা আরো বেড়েছে। গত এক বছরে নিউমন্ট, টেক্সট্রন, মারফি ইউএসএ ও ডিটিই এনার্জি প্রধান নির্বাহী পদে নারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে। ফলে নারী নেতৃত্বের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। রাসায়নিক পণ্য নির্মাতা ডাউ ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী হবেন বর্তমান প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ক্যারেন এস কার্টার। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় রাসায়নিক কোম্পানির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিইও হিসেবে ইতিহাস গড়বেন। এতে ফরচুন ৫০০ প্রতিষ্ঠানে কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিইওর সংখ্যা তিনে উন্নীত হবে। অন্যদিকে ক্রীড়াসামগ্রী ও পোশাক ব্র্যান্ড লুলুলেমনও নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে নাইকির সাবেক কর্মকর্তা হেইডি ও’নিলকে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেবেন।
উল্লেখ্য, ফরচুন ৫০০ তালিকা মূলত রাজস্বের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ৫০০ কোম্পানিকে স্থান দেয়। চলতি বছরের তালিকায় দীর্ঘ ১৩ বছর পর শীর্ষস্থান হারিয়েছে ওয়ালমার্ট। প্রথমবারের মতো তালিকার এক নম্বরে উঠে এসেছে অ্যামাজন।
যদিও নারী সিইওর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, তবু তালিকার শীর্ষে নারীদের উপস্থিতি এখনো সীমিত। ফরচুনের এ বছরের তালিকায় প্রথম নারী সিইওর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান দেখা যায় ১৮ নম্বরে। যেখানে আছে স্বাস্থ্যবীমা প্রতিষ্ঠান এলিভ্যান্স হেলথ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গেইল বুদ্রো। তিনি ২০১৭ সাল থেকে কোম্পানিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল অ্যান্থেম।
নারী নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯ নম্বরে রয়েছে সেন্টিন। এর সিইও সারা লন্ডন। ২৩ নম্বরে রয়েছে গাড়ি নির্মাতা জেনারেল মোটরস, যার নেতৃত্বে আছেন মেরি বারা। এছাড়া নারী সিইও পরিচালিত উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিটিগ্রুপ, ম্যারাথন পেট্রোলিয়াম, ইউনাইটেড পার্সেল সার্ভিস (ইউপিএস), প্রগ্রেসিভ, অ্যালবার্টসন্স, জেনারেল ডাইনামিকস, টিআইএএ, ডাউ, ইউএস ব্যাংকর্প, নর্থরপ গ্রুম্যান ও অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এএমডি)।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী নেতৃত্ব বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই দক্ষ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়া। গত এক দশকে ফরচুন ৫০০ কোম্পানির নারী সিইওদের বেশির ভাগই বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত নন। তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে ধাপে ধাপে শীর্ষ পদে পৌঁছেছেন।
বিউটি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আল্টা বিউটির প্রধান নির্বাহী কেসিয়া স্টিলম্যানের অভিজ্ঞতা উল্লেখ আছে প্রতিবেদনে। তিনি ২০১৪ সালে কোম্পানিটিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরিচালন দায়িত্ব পালন করে ২০২৫ সালে সিইও হন।
তবে অগ্রগতি হলেও গতি এখনো তুলনামূলক ধীর। ২০২০ সালে ফরচুন ৫০০ তালিকার মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নারী ছিলেন। পরে এ হার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে নারী সিইওর হার ১০ দশমিক ৪ শতাংশে স্থির ছিল। এরপর ২০২৫ সালে কিছুটা বাড়ে। ২০২৬ সালে এসে তা ১১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলেও বিশ্বের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে নারী-পুরুষ সমতা অর্জনে এখনো অনেক সময় লাগতে পারে। বর্তমান গতিতে এগোলে সে লক্ষ্য অর্জনে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে।
তবু করপোরেট নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি বাড়ার এ ধারা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি।
