জনকের জন্যে শোকগাথা || হাসানআল আব্দুল্লাহ নিউইয়র্ক
“বস্তুত, বাংলাদেশের ডাক নাম শেখ মুজিব।”
নিজের কবিতায় একদা বঙ্গবন্ধুকে এভাবেই চিহ্নিত করেছিলাম। আসলে এই মহান নেতাকে যে বিশেষণেই ধরা হোক না কেন তাঁর জন্যে সেটি অপ্রতুল মনে হয়। একটি জাতি—গোষ্ঠীর আপামর মানুষের কথা, সামগ্রিক মঙ্গলের কথা, স্বাধিকারের কথা তিনি যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন এবং তা অর্জনের জন্যে যে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিলেন, আমৃত্যু অটল থেকে সেগুলো বাস্তবায়ন করে যে সফলতার চিহ্ন তিনি রেখেছিলেন তার সত্যিকার অর্থেই কোনো তুলনা হয় না।
আমরা তাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলি এবং এটি অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য সম্মান। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো বাঙালির স্বাধীনতার চিন্তায় আচ্ছন্ন। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তিনি ‘আওয়ামী লীগ’—এর সভাপতি নির্বাচিত হন, এবং ছয় দফা দাবি পেশ করেন যা ছিলো বাংলাদেশের রক্তপাতহীন স্বাধীনতা অর্জনেরই কৌশলগত ফর্মুলা। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু বার্ষিকীতে তিনি পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তখন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিলো যে একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর সব কিছু থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তা হতে দেয়া যায় না, তাই “জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি; আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।”
এর পরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস, স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর ভয়াবহতার কথা, অত্যাচার ও নিপীড়নের কথা, তিরিশ লক্ষ শহীদের কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। আজ আমরা বাংলাদেশ নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখি। অথচ কী ভয়াবহ কথা, কী মর্মান্তিক পৈশাচিকতা যে এই বাঙালিরই ক’জন কুসন্তানের হাতে তিনি সপরিবারে তাঁরই গড়া দেশে, তাঁরই বাড়িতে নির্মমভাবে নিহত হন। বস্তুত, ১৫ আগস্টের মতো ভয়াবহ দিন বাঙালি জাতির ইতিহাসে আর আসেনি। জনকের দেহের রক্তে সিক্ত এই দিনটি একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সুদীর্ঘ ফাঁদ, যে ফাঁদে পাকিস্তানিরাও বঙ্গবন্ধুকে আটকাতে পারেনি। এই দিনটি শোকের, কান্নার, আত্মসমালোচনার। সাথে সাথে সামনে এগিয়ে যাবার জন্যে নতুন শপথের। জনকের রক্তে সিক্ত এই দিনে সকল বাঙালির শপথ হওয়া উচিত দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যয়ে নতুন করে জেগে ওঠার। মন ও সমাজের আবর্জনা থেকে নিজেকে মুক্ত করার। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশই পারে জনকের স্বপ্নের পরিপূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে না, চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে না; যেখানে থাকবে না ধনী—গরীবের দৃশ্যত কোনো ভেদাভেদ, যে বাংলাদেশ ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপরে উঠে মানবিক আস্থায় হবে অবিচল। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই মিলে একটি ভ্রাতৃত্ববোধের সমাজ গড়ে তুলবে। বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে একটি সফল সমৃদ্ধ শান্তিময় দেশ হিসেবে।
জীবন যখন পর্যুদস্ত বন্ধ যখন আশা
হায়েনা যখন কেড়ে নিয়েছিলো আমার মাতৃভাষা
গ্রাস করেছিলো ধনদৌলত
রুখে দিয়েছিলো এগোনোর পথ
হুংকারে পিতা তখন আগুন দেন পশুদের গায়।
আমার পিতাকে দেখেছি আমি শেকল পরানো পায়।।
কারার পাশেই ওরা খুঁড়েছিলো পিতার জন্যে কবর
অসুস্থতায় অষুধ দেয়নি, দেয়নি পিতার খবর;
তবুও পিতাকে ছিনিয়ে এনেছি প্রাণের স্বাধীনতায়।
আমার পিতাকে দেখেছি আমি বন্দী জেলখানায়।।
অবশ্যই আমরা সেই মহান নেতাকে পাকিস্তানীদের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনতে পেরেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে কিন্তু মাত্র ক’জন নরপশুর হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারিনি। তাই ১৫ আগস্ট আমাদের শোকের দিন। নতুন করে শপথ নিয়ে নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার দিন।
২.
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখতে গেলে একদিকে যেমন বুকের পাটা গর্বে ফুলে ওঠে অন্যদিকে তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড শেল হয়ে বিঁধতে থাকে। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন এক চলমান ইতিহাস, জীবন্ত দর্শন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন এক পুরুষ, যাঁর উচ্চারণে যুগসন্ধির উন্মোচন, যাঁর নেতৃত্বে ইতিহাসের মোড় ঘুরে গিয়েছিলো। তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে বড়, একটি দরিদ্র পিছিয়ে পড়া জাতিকে গড়ে তোলার কারিগর, বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রথম স্থপতি। তিনি ছিলেন একজন আপসহীন নেতা, যিনি কখনো মাথা নত করেননি অন্যায়ের কাছে। তিনি রাজনীতি করেছেন হৃদয়ের তাগিদে, মানুষের মুক্তির আশায়। তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো সাধারণ মানুষ; ক্ষুধার্ত কৃষক, শোষিত শ্রমিক, বঞ্চিত নাগরিক। তিনি চাইতেন এমন একটি সমাজব্যবস্থা, যেখানে মানুষ থাকবে মাথা উঁচু করে, সম্মান নিয়ে। যেখানে কোনো বাঙালিকে নিজের অধিকার আদায়ের জন্যে প্রাণ দিতে হবে না।
ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন অন্যরকম। তাঁর সাহস, নেতৃত্বগুণ এবং মানুষের প্রতি দরদ তাঁকে আলাদা করে তুলেছিলো। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তিনি সোহরাওয়ার্দীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছিলেন, পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসকদের অপরিসীম অন্যায়, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্ত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান তিনি। ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠন থেকে শুরু করে ৫২—র ভাষা আন্দোলন, ৫৪—র যুক্তফ্রন্ট, ৬২—র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬—র ছয় দফা, ৬৯—এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ৭১—এর স্বাধীনতা সংগ্রাম; প্রতিটি ধাপে বঙ্গবন্ধু ছিলেন নেতৃত্বের কেন্দ্র বিন্দুতে। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির আশা—আকাক্সক্ষার উজ্জীবিত কণ্ঠস্বর। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তখনকার রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে তিনি যখন উচ্চারণ করেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম;” সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক আহ্বান ছিলো না, ছিলো সংগ্রামী বাঙালি জাতির অন্তরের ধ্বনি। তাঁর সেই দিকনির্দেশনা বদলে দিয়েছিলো ইতিহাসের গতিমুখ। তিনি যখন বলেছিলেন “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো”, তখন একদিকে যেমন কেঁপে গিয়েছিলো পাকিস্তানী জান্তার বুক, অন্যদিকে মুক্তির সাহসে টগবগে বাঙালি জেগে উঠেছিলো দেশের আনাচে—কানাচে, পাড়া—মহল্লায়, অলিতে—গলিতে, পার্কে—রেস্তোরাঁয় সর্বত্র! পেয়ে গিয়েছিলো সংগ্রামের পাথেয়।
আজকের দিনের ভয়ঙ্কর এককেন্দ্রিক নেতাদের মতো বঙ্গবন্ধু কোনো চাতুর্যপূর্ণ রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সরল, নির্ভীক এবং অকৃত্রিম। রাজনীতি ছিলো তাঁর কাছে সেবার সমান। ক্ষমতা তাঁর কাছে কোনো ভোগের বিষয় ছিলো না, বরং ছিলো মানুষের কল্যাণের জন্যে এক অঙ্গীকার। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি ছিলেন সাধারণ। তাঁর পোশাকে, ব্যবহারে, চলাফেরায় সবসময় এক ধরনের সহজতা ছিলো; যা তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে গিয়েছিলো। তিনি ছিলেন গণমানুষের নেতা, একেবারে মাটির কাছাকাছি। একটি জাতির প্রতিষ্ঠাতা, পিতাকে যতোটা সহনশীল, বুদ্ধিদীপ্ত, সাহসী, সিদ্ধান্তে অটল, নির্ভিক ও সন্তানদের প্রতি স্নেহবান হতে হয়, তিনি ছিলেন ঠিক তাই!
স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু নতুন রাষ্ট্র গঠনে মনোনিবেশ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তাঁর সামনে ছিলো বিপুল চ্যালেঞ্জ; অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন, শরণার্থীদের পুনর্বাসন, সেনাবাহিনী গঠন, ভারতীয় সেনাদের প্রত্যাবর্তন, প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো; সবকিছু যেন তাঁরই কাঁধে এসে পড়ে। দিনরাত তিনি নিরলস পরিশ্রম করেন এবং মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হন। জাতিসঙ্ঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাঙালির পরিচয় নতুনভাবে তুলে ধরেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে তিনিই প্রথম বাঙালি নেতা যিনি বিশ্ব নেতাদের কাতারে স্থান করে নিয়েছিলেন বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, আর চেতনার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে।
তাঁর স্বপ্ন ছিলো সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ; যেখানে মানুষকে মানুষ শোষণ করবে না, নিশ্চিত হবে সবার মৌলিক অধিকার। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসে যখন অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটে, সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তিনি কৃষি, শিক্ষা, শিল্প; সব খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি জানতেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল কথা ছিলো মুক্তি; কেবল ভূখণ্ডের নয়, মানুষের, চিন্তার, আত্মার। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন, তাঁর সেই সাধনা থেমে যায় এক মর্মান্তিক কালো রাতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যারা তাঁকে হত্যা করেছিলো, তারা আসলে পুরো জাতিকে পিছিয়ে দিতে চেয়েছিলো। এই নির্মমতা শুধু ব্যক্তিকে হত্যা নয়, ছিলো একটি আদর্শ হত্যার চেষ্টা। তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে তারা চেয়েছিলো ইতিহাসকে মুছে ফেলতে। কিন্তু ইতিহাস কি কখনো মুছে যায়? চেতনা কি কখনো হত্যা করা যায়? বঙ্গবন্ধু তো শুধুই একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিটি বাঙালির অন্তরের অন্তঃস্থলে লালিত এক চেতনার নাম। প্রায় দুই দশক পরে বাংলাদেশ যখন মুজিবকন্যার নেতৃত্বে উন্নয়নের পথে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলে, পদ্মা সেতু থেকে মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট; এই সবকিছুতেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটে। তাঁরই আদর্শের ধারাবাহিকতায় তাঁর কন্যা যখন জাতিকে নেতৃত্ব দেন, তখনও আমরা দেখি সেই আদর্শের বাস্তবায়ন। তাঁর দেখানো পথেই বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।
এই তো বাংলাদেশ
এগিয়ে যাচ্ছো, যাও!
এই তো বাংলাদেশ
এগিয়ে যাচ্ছো যাবে।
তোমার দু’হাতে চিরদিন এই
আমার দু’হাত পাবে।।
এই গান দিয়ে আশায় বুক বেঁধে সেই উন্নয়নকে স্বাগত জানাতে একজন সামান্য কবি হিসেবে আমিও ভুলে যাই না। অতি সাহসে ভর করে এর একটি সুরও দিয়ে ফেলি। পরিবেশন করেন কণ্ঠ শিল্পী সুব্রত দত্ত। কিন্তু ১৫ আগস্টের মতো আরো একটি কালো দিন আসে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট; একদল দেশি—বিদেশি প্রতারকের ভয়াল থাবায় সবকিছু পণ্ড হয়ে যায়।
৩.
এক ভয়ংকর মেটিকুলাস ডিজাইন স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে আরো একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ষড়যন্ত্র, নানা বিকৃতি ও বিপর্যয়ের ছায়া আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে গ্রাস করে ফেলে। এক হয়ে যায় নতুন—পুরোন সব শকুন। বর্বরতা ফিরে আসে ভিন্ন মুখোশে, ভিন্ন কৌশলে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই যারা থেমে যেতে চায়নি, তারা আজও তাঁর নাম, তাঁর স্মৃতি, এমনকি তাঁর অস্তিত্ব মুছে ফেলার খেলায় লিপ্ত! মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার সাহস রাখে একমাত্র পাকিস্তানি ও রাজাকারেরা; অবস্থাদৃশ্যে মনে হয় ঝাড়ে—বংশে ওরা বৃদ্ধি পেয়ে ওঁৎ পেতে ছিলো হায়েনার মতো মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জনকে গিলে ফেলতে। এমনকি ওদের আক্রোশ থেকে মুক্তিযোদ্ধার কবরও বাদ যায় না; যারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করে, তারা কতটা বর্বর হলে আরেক মুসলমানের কবর পুড়িয়ে দিতে পারে সেটি ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়! পুড়িয়ে দেয়া হয় হাজারো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির ঘরবাড়ি, নির্বিচারে পথে ঘাটে হত্যা করা হয়; মুজিব নগরের সমস্ত স্থাপনা, বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চারনেতার ভাস্কর্য এবং বাঙালি জাতির সূতিকাগার ৩২ নম্বর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এই সমস্ত অপকর্মে একাত্তরের সেই পরাজিত শক্তি সঙ্গী হিসেবে পায় পাকি শয়তান, রাজাকার এবং এক পিশাচকে। এদের লক্ষ্য সুস্পষ্ট; তরুণ প্রজন্মকে ভুল ইতিহাস শেখানো, পাঠ্যবই থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা, মুক্তিযুদ্ধকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলে চালিয়ে দেওয়া, শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ ছড়িয়ে একটি পশ্চাদপদ পরস্পর বিরোধী সমাজ তৈরি করা, যেখানে দিন দিন মানুষ নিঃস্ব থেকে নিঃস্ব হয়ে পড়তে বাধ্য হবে। বিদেশি দাতা সংস্থার পরামর্শে দেশ চালানোর নামে আত্মমর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে এই শাসকগোষ্ঠী চায় জাতির জন্মকথাকেই ভুল প্রমাণ করতে। তারা চায় বঙ্গবন্ধুকে “এককেন্দ্রিক শাসক” বলে ইতিহাসে কলঙ্কিত করতে; যেন এই জাতি কখনো স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেয়নি, যেন এই দেশ একদিন আচমকাই সৃষ্টি হয়েছিলো কোনো রাজনৈতিক আপসের মাধ্যমে।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে হত্যা করতে পারো, কিন্তু আমার আদর্শকে হত্যা করতে পারবা না।” আজ সেই কথাগুলো যেন অমোঘ বাণীর মতো ফিরে এসেছে। ইতিহাসে অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে, অনেক মহান নেতা নির্মমভাবে হারিয়ে গেছেন, কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন, তাঁদের দর্শন মুছে ফেলা যায়নি। এবং যতবার ষড়যন্ত্র হয়েছে, ততবারই বাঙালি অসীম সাহসে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে মানুষ মরে, আর আমরা কেবল নীরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে থাকি। আমরা চাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ; যেখানে প্রতিটি মানুষের জীবন থাকবে নিরাপদ, যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্যে, যেখানে সেনাবাহিনী হবে দেশের গর্ব, রক্তচোষা শাসকের রক্ষী নয়।
১৫ আগস্ট তাই কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি আজ আরো বেশি তাৎপর্যময়। আজকের শপথ হোক, আমাদের ইতিহাসকে কেউ যেন আর বিকৃত করতে না পারে; যেন কেউ আর বঙ্গবন্ধুর নাম, চেতনা কিংবা আত্মত্যাগকে অস্বীকার করতে না পারে। নতুন প্রজন্মকে বোঝানো ও অনুধাবন করানোর প্রয়োজন রয়েছে যে বাংলাদেশ শুধু মানচিত্র নয়, এটি একটি স্বপ্নের নাম, একটি আত্মত্যাগের নাম। আর সেই স্বপ্নের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; যিনি রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, “বাঙালি মাথা নত করে না।” আবারো বলতে চাই,
বঙ্গবন্ধু শোনো;
তোমার জন্যে আমরা এখন
পৃথিবীর দেশে দেশে
মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি।।
স্বাধীন করেছো দেশ
দিকে দিকে আজ মাতৃভাষার
আশাতীত উন্মেষ।
তোমার বজ্র হুংকারে সব
শত্রুকে তাড়িয়েছি।।
ষড়যন্ত্র হয়তো পঁচাত্তরের মতো আমাদের কিছুটা পিছে ফেলে দেবে, কিন্তু আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো। নিজেদের ভুলগুলো সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে একটি আদর্শ দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো। শক্ত হাতে ষড়যন্ত্রকারীদের বিষদাঁত ভেঙে দেবার মাধ্যমে সেই উদ্দেশ্য সফল হবে বলে বিশ্বাস করি।
