১৫ আগস্ট যে ভোরে বাংলাদেশ তার সকাল হারিয়েছিল || ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক
ভোর তখনও পুরোপুরি জাগেনি। ঢাকার জানালাগুলো অন্ধকার, রান্নাঘরে আগুন ধরেনি, সংবাদপত্র পৌঁছায়নি দরজায়, রিকশার ঘণ্টা তখনও শহরের দৈনন্দিন ছন্দ শুরু করেনি টুংটাং শব্দে। অথচ সেই নিদ্রিত নগরের একটি বাড়িতে সময় হঠাৎ তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই প্রাক্ভোরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি আর শুধু একটি পরিবারের বাসস্থান রইল না; কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তা হয়ে উঠল একটি সদ্যোজাত রাষ্ট্রের ছিন্ন ইতিহাসের ঠিকানা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের উপস্থিত সদস্যদের অধিকাংশ নিহত হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিপথগামী সৈন্যদের সামরিক অভ্যুত্থানের সহিংসতায়। সমকালীন মার্কিন কূটনৈতিক নথিতেও ১৫ আগস্টের সকালেই অভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ নথিবদ্ধ হয়েছিল। ইতিহাসে অনেক হত্যাকাণ্ড আছে; কিন্তু কিছু হত্যাকাণ্ড একজন মানুষের জীবন শেষ করার পাশাপাশি একটি দেশের ভবিষ্যত এবং তার ভাষার বাক্যের কালও বদলে দেয়। এ হত্যাকাণ্ডটি ছিল তেমনই এক হত্যাকাণ্ড, ভবিষ্যত কালের হত্যা।
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল যেন ভবিষ্যৎ কালে। ১৯৭১—এর রাজনৈতিক ভাষা ছিলÑহবে, পাব, মুক্ত হব। স্বাধীনতা তখনও পূর্ণ বাস্তবতা নয়; ছিল সম্মিলিত কল্পনার এক অনিবার্য আগামীর পথরেখা। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ভাষণকে ইউনেস্কো (টঘঊঝঈঙ) ২০১৭ সালে ‘মেমোরি অব দি ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’ (গবসড়ৎু ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ জবমরংঃবৎ)—এ অন্তর্ভুক্ত করে। সংস্থাটি উল্লেখ করে যে ভাষণটি লিখিত পাণ্ডুলিপি ছাড়াই দেওয়া হয়েছিল এবং তার অডিও ও অডিও—ভিজ্যুয়াল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। এ ভাষণটিকে তুলনা করা হয় আব্রাহাম লিঙ্কনের ‘দি গেটিসবার্গ এড্রেস’ (ঞযব এবঃঃুংনঁৎম অফফৎবংং) —এর সংগে।
১৯৭১—এ ছিল লক্ষ মানুষের সামনে একটি কণ্ঠ, বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ, যা ভাষা দিয়ে ভবিষ্যতের দরজা খুলেছিল।
১৯৭৫—এ ছিল একটি বাড়ির ভেতর বন্দুকের শব্দ, আহাজারির শব্দ, সহিংসতা দিয়ে সেই দরজা ওরা, খুনীরা বন্ধ করতে চেয়েছিল।
যে বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু ৪৬৮২ (চার হাজার ছয়শত বিরাশি) দিন জেল খেটেছেন, সেই বাংলাদেশেরই বিপথগামী পাকিস্তানী—মনোভাবাপন্ন বাংলাভাষী সৈনিকরাই বাংলাদেশের মাটিতে, নিজ বসতবাটিতে, ৩২ নম্বরে, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।
সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দুর্বল, অর্থনীতি বিপর্যস্ত। ১৯৭৪—এর বিদেশী পরাশক্তির ষড়যন্ত্রমূলক দুর্ভিক্ষ শুধু মানবিক বিপর্যয়ই সৃষ্টি করেনি, নবীন রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা ও রাজনৈতিক বৈধতাকেও কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। দুর্ভিক্ষের কারণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা রয়েছেÑখাদ্যবাজার ও বণ্টনব্যবস্থার ব্যর্থতা, মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রাষ্ট্রের ত্রাণ—সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, আর বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ।
এসব আলোচনা—সমালোচনা ইতিহাসেরই অংশ। কিন্তু ঠিক এখানেই গণতন্ত্র ও হত্যার মধ্যে একটি অলঙ্ঘনীয় নৈতিক সীমারেখা রয়েছে। একটি সরকারের ব্যর্থতা বিচারযোগ্য, একজন নেতার নীতি প্রত্যাখ্যানযোগ্য, জনগণ তার বিরুদ্ধে রায় দিতে পারে, কিন্তু হত্যা কোনো রাজনৈতিক রায় নয়। গণতন্ত্র বিচার করার অধিকার দেয়, হত্যাকাণ্ড বিচারের সম্ভাবনাটিই কেড়ে নেয়। হত্যাকারিদের যারা বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে, রক্ষাকবচ দিয়েছে, পুরস্কৃত করেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল বা অন্যন্য সামরিক অফিসার, তারাও হত্যাকারি, কিংবা হত্যায় সহায়তাকারি। তাদেরও বিচার অবশ্যম্ভাবী, শত বছর পরে হলেও।
ধানমন্ডি ৩২—এর ট্র্যাজেডি তাই কেবল একজন রাষ্ট্রনেতার হত্যাকাণ্ড নয়। সেটি ছিল একটি পরিবারের ঘরের ভেতর এবং একটি সদ্যোজাত দেশের ভেতর পরাজিত অপশক্তির রাজনৈতিক সহিংসতার প্রবেশ। নারী, সন্তান, এমনকি শিশুও সেই সহিংসতা থেকে রক্ষা পায়নি। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। ইতিহাস কখনও কখনও এমন নিষ্ঠুর আকস্মিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকেÑকেউ ভবিষ্যতের সাক্ষী হয়ে বেঁচে যায়, কারণ সেদিন সে ঘরে ছিল না, খুনীদের নাগালের বাইরে ছিল।
তখন প্রশ্নটি আর শুধুÑ‘কে শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিল?’ থাকে না। তা আরও কঠিন প্রশ্ন হয়ে ওঠেÑ পরিবারের সদস্য ছাড়া তাঁর সঙ্গে আর কী হত্যা করা হয়েছিল, অথবা হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল? সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার বিশ্বাস? বেসামরিক ক্ষমতা হস্তান্তরের নীতি? সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সেই সরল প্রত্যয় যে রাজনৈতিক মতভেদ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে? নাকি পাকিস্তান, জামাত, রাজাকার, আল—বদর ও বৈশ্বিক পরাশক্তির পরাজয়ের প্রতিশোধ?
বর্তমান লক্ষ্যভ্রষ্ট বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে উত্তরগুলো খুবই সহজ। তবে ১৫ আগস্টের পরবর্তী ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক সহিংসতার দরজা একবার খুললে তা সহজে বন্ধ হয় না। ৩ নভেম্বর আবার অভ্যুত্থান, ৭ নভেম্বর পাল্টা—অভ্যুত্থানÑকয়েক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে সামরিক শক্তির প্রভাব গভীর হয়ে ওঠে। এরপর ১৯৭৫ সালের ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত খুনীদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ দীর্ঘদিন রুদ্ধ রাখে। সেই রুদ্ধ বিষাক্ত বাষ্পই ১৯৮১ সালে এক মেজর জেনারেলেকেও হত্যা করে। ১৯৯৬ সালে সংসদ সেই অধ্যাদেশ রহিত করলে আইনি জবাবদিহিতার পথ পুনরায় উন্মুক্ত হয়। একটি রাষ্ট্রের জন্য এও এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতাÑকখনও কখনও হত্যার পরে শুধু মানুষ নয়, ন্যায়বিচারও নির্বাসনে যায়।
তবু ভবিষ্যৎ কি সত্যিই হত্যা করা যায়? ইতিহাস উত্তর দেয়, ‘না’।
গুলি দেহ থামাতে পারে কিন্তু কণ্ঠের প্রতিধ্বনি নয়; আর সে কণ্ঠ যদি হয় বঙ্গবন্ধুর কন্ঠের মত বজ্রকন্ঠ, তা আরও জোরে আকাশে—বাতাসে ভাসতে থাকে, গগন—বিদারী শব্দে, দেশপ্রেমের মন্ত্রে। ক্ষমতা স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতে পারে; কিন্তু স্মৃতি কোনো সরকার, কোনো দল, এমনকি কোনো প্রজন্মের একক সম্পত্তি নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে যেমন প্রশ্ন নেই, তেমনি তার অপার সৃষ্টি বাংলাদেশ এবং বাঙালিত্ব নিয়েও প্রশ্ন নেই। তাঁর শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা ইতিহাসই বিচার করবে। কারণ স্মরণ যদি প্রশ্নহীন হয়, তা ইতিহাস নয়—উপাসনা। আর নিন্দা যদি প্রমাণহীন হয়, সেটিও ইতিহাস নয়—প্রতিশোধ। বাংলাদেশে চলছে দ্বিতীয় ধারার সতত উন্মেষ, প্রতিশোধ।
একটি জাতি তার মৃতদের সবচেয়ে গভীরভাবে সম্মান করে তখনই, যখন সে তাদের নিয়ে সত্য বলার সাহস অর্জন করে।
অর্ধশতাব্দী পরে ১৫ আগস্টের সেই ভোর তাই আমাদের শুধু শোক শেখায় না, শেখায় গণতন্ত্রের ব্যাকরণ। একটি দেশের ভবিষ্যৎ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কিন্তু বন্দুক হাতে সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকারও কারও নেই। হত্যাকারীরা জীবন শেষ করতে পেরেছিল, রাষ্ট্রের পথ বদলে দিতে পেরেছিল, ন্যায়বিচারকে বহু বছর বিলম্বিত করতে পেরেছিল, কিন্তু যেগুলোর ওপর তারা স্থায়ী কর্তৃত্ব অর্জন করতে পারেনি, তা হচ্ছেÑসত্য, তথ্য ও স্মৃতি। তিনটিই সমস্বরে বলছে, বঙ্গবন্ধুর নেত্বৃত্বে বাঙালি স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশ নামক একটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছিল। ওরা ৩২ নম্বর ভেঙেছে কিন্তু সত্য, তথ্য ও স্মৃতি ভাঙতে পারেনি, পারবেও না।
১৫ আগস্ট একটি জাতি তার ভোর হারিয়েছিল, ভোর শেষ পর্যন্ত আসে। রেকর্ডে বেঁচে থাকা একটি কণ্ঠ আবার শোনা যায়, শোনা যাবে অযুত দিন। নতুন প্রজন্ম পুরনো বাক্যকে নতুন প্রশ্নে পড়ে; প্রশংসার পাশে সমালোচনা, শোকের পাশে অনুসন্ধান, স্মৃতির পাশে ইতিহাস উপবেশন করে। আর ১৫ আগস্টে যে বাক্যটি বন্দুকের শব্দে অসমাপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল, তার পাশে বাংলাদেশ এখনও নীরবে ভবিষ্যৎ কালের একটি ক্রিয়া লিখে চলে—
হওয়া। হয়ে ওঠা। আবারও স্বাধীন হয়ে ওঠা। ওদেরকে হঠিয়ে, বিদেয় করে।
