১৫ আগস্টের বিলাপ ও বিব্রতকর বেদনা ! আনিস আহমেদ

আগস্টের এই মধ্যমাস এমন বেদনাসিক্ত ছিল না ১৯৭৫ এর আগে, অথচ অভিশপ্ত পঁচাত্তর আমাদেরকে এতটাই আহত করেছে যে মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা যেন ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। শোককে শক্তিতে পরিণত করার আপ্তবাক্য আমরা উচ্চারণ করে থাকি বটে, কিন্তু প্রায়শই মনে হয় শোকের স্রোতে শক্তি যেন হারিয়ে যায়। অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁকে হারানোর বেদনা আজ একান্ন বছর পরও বার বার ফিরে আসে। পিতা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁরই সৃষ্ট স্বদেশ আমার; পিতার অনুপস্থিতিতে অনাথ দেশটি পিতার দেখানো পথ থেকে সরে এসেছে অনেক দূরে, বলা যায় বিপরীত মেরুতে। আর তাই পিতাকে হারানোর অর্থ এখন সেই প্রিয়পরিচিত স্বদেশকে হারানোই। কারণ যে আদর্শে গড়ে উঠেছিল স্বদেশ আমার, সেই আদর্শকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল পঁচাত্তরে যেমন তেমনই এখনও সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এখন এই একান্ন বছর পর এসে মনে হয় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শুধুই একটি ব্যক্তিকে কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্যকে হত্যা করার ঘটনা নয়, বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আদর্শকেই হত্যা করার ঘটনা। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির জনককে হত্যা করা কেবল বেদনার কথা নয়, জাতির জন্য লজ্জা এবং বিড়ম্বনার ঘটনাও বটে। 

লজ্জা রাখার জায়গা নেই আমাদের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গোটা সময়টা জুড়ে যিনি ছিলেন বাঙালির অকুতোভয় কান্ডারি তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলো বাংলাদেশেরই কতিপয় মানুষ, যাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এমন লোকও ছিল। এমন এক আশ্চর্য এবং অবিশ্বাস্য ঘটনা যা কোনো ক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। তবে এই ঘাতকদের মধ্যে যে স্বাধীনতা বিরোধীরাই লুকিয়ে ছিল সেটা ক্রমশই পরিষ্কার হয়ে যায় যখন এক নিমেষেই তারা জয়বাংলা থেকে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শ্লোগানে আসক্ত হয়ে যায়, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বকে খাটো করে দিতে তৎপর হয় এবং ক্রমশই পাকিস্তানি মনোভাবের দিকে দেশকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কেউ কেউ এমনটিও বলেন যে বঙ্গবন্ধু বাকশাল না করলে হয়ত তাঁর বিরুদ্ধে কিছু মানুষকে ক্ষুব্ধ করা যেতো না। পশ্চিমি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাকশালকে হয়ত একদলীয় শাসন ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করা যায়, কিন্তু যারা বাকশালকে কেবল একদলীয় শাসন ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন তাঁরা বাকশাল প্রতিষ্ঠার নিহিত উদ্দেশ্যকে বোঝেন না। প্রথমত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বরাবরই সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন আর এই বিশ্বাসের কারণেই তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করেন। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই আমরা বাংলাদেশে কি দেখলাম? বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে, নিজেদের সমাজতন্ত্রী বলে দাবিদার একদল উগ্রবাদী দেশে অহরহ বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস হত্যার রাজনীতি শুরু করে। সদ্য স্বাধীন দেশের নিজের পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশটিকে পঙ্গু করে দিতে তৎপর কিছু লোক যখন গণতান্ত্রিক উদারতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ সন্ত্রাস উগ্রবাদকে ছড়িয়ে দিতে উদ্যত হয়, তখনই বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেন। বাকশালকে তিনি একদলীয় নয়, সর্বদলীয় ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এই ব্যবস্থা যে সাময়িক সে কথাও উল্লেখ করেন। কিন্তু বাকশালকে কিছু লোক পঁচাত্তরের ঘটনার পক্ষে খোড়া যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে থাকেন। 

কেবল বাকশাল নয়, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকেও বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের জনপ্রিয়তাকে হ্রাস করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এখানে মনে রাখা দরকার৭৪এর দুর্ভিক্ষ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, সে বছর ফসলের ফলন এতটাই হ্রাস পায়, এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও, যে কোন ক্রমেই সেই অবস্থান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ ছিল না। তবু বাংলাদেশের এই খাদ্যাভাব যাতে দুর্ভিক্ষতে পরিণত না হয় সে জন্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পিএল ৪৮০তে স্বাক্ষর করলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে খাদ্য পাঠাতে সম্মত হয়। কিন্তু কিউবায় বাংলাদেশের পাট রপ্তানিতে অসন্তুষ্ট যুক্তরাষ্ট্র খাদ্যবাহী জাহাজ মাঝ পথেই থামিয়ে দেয়। আর এর ফলেই বাংলাদেশের খাদ্যাভাব দুর্ভিক্ষে পরিণত হয়। বস্তুত বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতেই সূক্ষ্মভাবে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা কমানোর জন্য একাধিক ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় কুড়িগ্রামের চিলমারীর বাক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণী বাসন্তীকে মাছ ধরার জাল পরিয়ে ছবি তুলে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। ছবিটি যে দুর্ভিক্ষপীড়িত তরুণীর নয় সত্যকে আড়াল করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিভিন্ন মহলের মতে, এটি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশে তৈরি একটি অতিকথন বা চক্রান্তমূলক অপপ্রচার ছিল। কাজেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগেই তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে তাঁর ভাবমূর্তিকে ক্ষুন্ন করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু কালক্রমে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে এর সবটাই ছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পেছনে যৌক্তিকতা প্রদান এবং খন্দকার মুশতাক আহমেদের দীর্ঘ লালিত খায়েশের বহিঃপ্রকাশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাজউদ্দিন আহমেদের বিরোধিতা করতে গিয়ে, খন্দকার মুশতাকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি। ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস যে মুশতাক সমর্থক বিপথগামী সেনা সদস্যরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগেই মণিকেই ওই রাতে হত্যা করে। 

একটা প্রশ্ন আমার মনে আসে, জানি উঠে আসে অন্যদের মনেও যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পেছনে যে একটা গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করেছে সে কথা আমরা জানি কিন্তু সেই রাতে বত্রিশ নম্বরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যার কারণ কি? তাঁরা তো আর দেশ পরিচালনা করছিলেন না, বাকশালও গঠন করেননি; তাহলে! আসলে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অর্থাৎ তাদের কথায় পাকিস্তান ভাঙার শাস্তি যাতে শিশু রাসেলসহ ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ উঠে আসতে না পারে। কিন্তু কথায় আছে না, ‘রাখে আল্লাহ, মারে কে বিদেশে অবস্থান করায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা সৌভাগ্যবশত এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হননি। এক সময়ে দেশে ফিরে এসে শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ান। তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বে এক সময়ের দ্বিধা বিভক্ত আওয়ামী লীগই কেবল ঘুরে দাঁড়ায়নি, ঘুরে দাঁড়ালো গোট দেশ। আমরা আবার ফিরে গেলাম একাত্তরের সেই আদর্শে যাকে প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। ১৯৮১ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর আরও ১৫ বছর সময় লেগেছিল শেখ হাসিনার সরকার গঠনে। ধৈর্যে্যর সাথে ১৫ বছর শেখ হাসিনা সরকারে বাইরে থেকেই রাজনীতি করে, ১৯৯৬ সালে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ২০০১ সাল অবধি তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, আবার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি দেশের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্ট জনসাধারণকে প্রতারণা করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। এবারও ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য ছিল এক অভিন্ন। শেখ পরিবারের কাউকেই ক্ষমতায় থাকতে দেবে না পাকিস্তানের অনুগত দালালরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে এবং তারই ধারাবাহিকতায় মূল দিচ্ছেন শেখ হাসিনাও। 

আজ ১৫ আগস্ট শোকাচ্ছন্ন বর্ষার একটি দিন যখন মেঘাচ্ছন্ন আকাশে আবৃত বাংলাদেশ। তবে বঙ্গবন্ধুর রক্তদান বৃথা যেতে পারে না, বাঙালি আবার ঘুরে দাঁড়াবে, বাংলাদেশের বিজয় মানে বঙ্গবন্ধুর বিজয়। আমরা বিশ্বাস করি সহস্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জয়ী হবেন বঙ্গবন্ধু আর সে জন্য তো আমরা জয় বাংলার সঙ্গে বলি জয় বঙ্গবন্ধু।

Related Posts