পাঁচ কৃতিজনকে সম্মাননা এওয়ার্ড প্রদান || লং আইল্যান্ডে হয়ে গেল মনোজ্ঞ বাংলাদেশ নাইট
বাঙালী প্রতিবেদনঃ রৌদ্র গুটিয়ে নিচ্ছে গ্রীষ্মের খরতাপ, সোনালি আভা চিকচিক করছে লেকের পানিতে। পাখিরা দল বেধে ফিরে যাচ্ছে ঘরে। আর লং আইল্যান্ডের বাঙালিরা তখন আইজেনহাওয়ার পার্কের হ্যারি চ্যাপিন লেকসাইড থিয়েটারের সামনের ঘাসে কেউ চাদর বা শতরঞ্জি বিছিয়ে বসেছেন, কেউ ফোল্ডিং চেয়ার খুলে। কারো হাতে ঝালমুড়ি, সিঙ্গারা বা সামুচা, কারো হাতে কেবলই চায়ের কাপ। গত রবিবার বাংলাদেশ হেরিটেজ ইনক আয়োজিত ন্যাসাউ কাউন্টি এক্সিকিউটিভের অফিসের উদ্যোগে এ বছরের বাংলাদেশী আেরিকান নাইট উদযাপনের শুরুটি ছিল এই রকম। প্রতি বছর এই অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষায় থাকেন লং আইল্যান্ডের বাঙালিরা। সে জন্য সন্ধ্যার আগেই দর্শকে ভরে যায় উন্মুক্ত সবুজ মাঠ। মাঠের অপর প্রান্তে ঢাকা রেস্টুরেন্ট সাজিয়ে বসেছে বিকেলের স্ন্যাকস, আর গোটা দশেক বুটিক স্টলে চলছে শাড়ি সালোয়ার কামিজ, পাঞ্জাবি আর ইমিটেশন গহনা বিক্রি।
শুরুতেই লং আইল্যান্ড মুসলিম সোসাইটির বাংলা স্কুলের প্রায় ৩০ জন শিশু শিক্ষার্থী বাংলাদেশ আর আমেরিকার ন্যাশনাল এ্যানথেম পরিবেশন করে। আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসকে স্মরণ করে এই দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ডা. সাঈদা হোসেন মৌ বলেন, আমরা এখানে সমবেত হয়েছি মানবতার জয়গান উদযাপনের উদ্দেশে। তিনি চমৎকারভাবে বলেন, আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং সীমান্ত অতিক্রম করে আমরা সকলে মিলে আমাদের মানবতা, মর্যাদা সুবিচার ও আশাকে তুলে ধরতে পারি। এটাই আমাদের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেককে সংযুক্ত করবে, গড়ে তুলবে শক্তিশালী কম্যুনিটি এবং সফল নতুন প্রজন্ম। ডা. মৌ বলেন, বাংলাদেশী হিসাবে আমরা এই সত্যের পতাকাকে তুলে ধরছি প্রতিনিয়ত। আজকের অনুষ্ঠানেও সেই মহান আদর্শকে তুলে ধরা হবে বিভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। তবে তিনি সবকিছুর উর্ধে মানবতার পতাকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এর পরপরই এই অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য অনুসারে লং আইল্যান্ডের পাঁচজন কৃতি বাংলাদেশীকে ন্যাসাউ এক্সিকিউটিভ ব্রুস ব্লেকম্যানের সাইটেশন সম্মাননা প্রদান করেন তার প্রতিনিধি ন্যাসাউ কাউন্টির ডিপার্টমেন্ট অব পার্কস, রিক্রিয়েশন এন্ড মিউজিয়মের ডেপুটি কমিশনার মাইকেল রাইনহার্ট এবং অফিস অব এশিয়ান আমেরিকান এ্যাফেয়ার্সের মেং লি। সম্মাননা প্রাপ্তরা হলেন সংগীত শিল্পী ও শিক্ষক অনুপ বড়–য়া, বিশিষ্ট এটর্নি এবং মূলধারার রাজনীতিক মঈন চৌধুরী, বিশিষ্ট কম্যুনিটি লিডার এটর্নি নাফিসা আহমেদ, শিক্ষক নারী অধিকারকমীর্ মিলাদুন নাহার এ্যানি এবং আইটি প্রফেশনাল ও কম্যুনিটি লিডার সোহেল রানা। বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে তারা এই সম্মাননা গ্রহণ করেন।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বাংলাদেশ হেরিটেজের চেয়ারম্যান জাকি হোসেন এই আয়োজনকে সফল করার জন্য যারা কঠোর পরিশ্রম করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানান। এদের মধ্যে অন্যতম রাহাত হোসেন নাজু, মিজান রহমান। এছাড়াও যারা স্পন্সর, মঞ্চসজ্জায়, সাউন্ড নিয়ন্ত্রণ সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সঞ্চালনায় ফিরে এসে ডা. সাঈদা হোসেন মৌ দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেন আমরা ঘৃণার পরিবর্তে মানবতা, বিভক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যের জয়গান গাইতে চাই।
সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতেই প্রিয়া ড্যান্স একাডেমির দশ কিশোরী বর্ণিল কস্টু্যম পরে পরিবেশন করে দৃষ্টিনন্দন নৃত্য। দ্বিতীয় দ্বৈত নৃত্যে অংশ নেন প্রিয়া ডায়েস নিজে। পরে একটি একক নৃত্য পরিবেশন করেন অতিথি শিল্পী রিমঝিম।
বাংলাদেশী—আমেরিকান নাইটের বিশেষ আকর্ষণ ছিল লং আইল্যান্ডের ব্যস্ত সংগঠন শিল্পাংগনের আয়োজনে একটি আলেখ্য। এই আলেখ্যে ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অভিনয়, আবৃত্তি ও গানের মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে বিশেষভাবে সংযুক্ত ছিল ১৯৭১ সালের দুটি ঘটনা। একটি ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ, অপরটি কবি এ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। এই দুই পর্বে জর্জ হ্যারিসনের গিটার নিয়ে ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গান পরিবেশন এবং কবিতা আবৃত্তির সাথে শরণার্থীদের অসহনীয় কষ্টের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কাটে। শিল্পাংগনের এই সুন্দর আলেখ্যটির লেখক ও নির্দেশক ড. নজরুল ইসলাম।
শ্বাসরুদ্ধকর এই আলেখ্যের পর মঞ্চে আসেন এই সন্ধ্যায় গ্রে স্যুট পরে ফিচারড শিল্পী বাংলাদেশ থেকে আগত রেশমী মির্জা। এই ফিউশন শিল্পী প্রায় এক ঘন্টা বাংলাদেশের জনপ্রিয় গান একটির পর একটি গেয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। এক পর্যায়ে তিনি মঞ্চ থেকে নেমে দর্শকদের মাঝে এসে তাদের নিয়ে গান করেন। লং আইল্যান্ডের সংস্কৃতি কমীর্রা তার সাথে কণ্ঠ মেলান। ফলে বাংলাদেশী—আমেরিকান নাইট ২০২৬ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠান যখন শেষ হয়, তখন চারিদিকে ঝিঁঝিঁ পোকা জেগে উঠেছে। বাংলাদেশীরা একটি আনন্দঘন সন্ধ্যা উদযাপন শেষে ঘরে ফিরে যান। আর ধন্যবাদ জানাতে থাকেন এমন গোছানো, সুশৃঙ্খল, প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান আয়োজনের নেপথ্য ব্যক্তিদের। সেই সাথে শব্দ নিয়ন্ত্রক নিবিড় খানকে।
উল্লেখ্য আইজেনহাওয়ার পার্কে বাংলাদেশ নাইট প্রথম আয়োজিত হয় ২০০৭ সালে। তারপর থেকে প্রতিবছর সামারে আয়োজিত হচ্ছে। মাঝে কোভিডের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে হয়নি।
