বাংলাদেশের জলাবদ্ধতার জলতাত্ত্বিক গতিবিদ্যা—১ || ড. আনিস রহমান  পেনসিলভেনিয়া

সারসংক্ষেপ

উপস্থাপিত নিবন্ধটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্যা এবং প্রধান প্রধান শহরগুলোর তীব্র জলাবদ্ধতা সংকটের পেছনের ভূতাত্ত্বিক জলতাত্ত্বিক কারণগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সাথে, অতীতে গৃহীত পানি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে আধুনিক অত্যন্ত বাস্তবমুখী কিছু সমাধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভূমিকা: বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্যা বদ্বীপীয় সংস্থান: একটি ভূতাত্ত্বিক ভূসংস্থানিক রূপরেখা

বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে বৃহত্তম সর্বাধিক সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যা ভৌগোলিক ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত বন্যাপ্রবণ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পলল সমভূমি এবং প্লাবনভূমি দ্বারা গঠিত, যা মূলত পদ্মা (গঙ্গা), ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা (এইগ) নামক তিনটি প্রকাণ্ড নদী অববাহিকার মোহনায় অবস্থিত। দেশের ভূসংস্থানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর অত্যন্ত কম গড় উচ্চতা; সমগ্র ভূখণ্ডের প্রায় দুইতৃতীয়াংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র মিটারেরও কম উচ্চতায় অবস্থিত। এই অনন্য সংবেদনশীল ভৌগোলিক বিন্যাসের ফলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে হিমালয় পর্বতমালা থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পানি পলি দেশের নদীপ্রণালীগুলোকে উপচে ফেলে এবং বিস্তীর্ণ সমতলকে প্লাবিত করে।

ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশের প্লাবনভূমি গঠনপ্রক্রিয়াটি নদীগুলোর বার্ষিক পলি সঞ্চয়ন এবং প্লাবন চক্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গঙ্গাব্রহ্মপুত্রমেঘনা নদী অববাহিকা সম্মিলিতভাবে প্রায় . মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিষ্কাশন করে এবং প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে প্রায় ,১২০ ঘন কিলোমিটার সুপেয় পানি এবং প্রায় ,০৬০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে আসে। এই বিপুল পরিমাণ পলির দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয়নই দেশের অত্যন্ত উর্বর পলিমাটি এবং নতুন নতুন চরাঞ্চল সৃষ্টি করেছে। ফলে, দেশে বন্যা কেবল একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা বা দুর্যোগ নয়, বরং এটি বদ্বীপের ভূতাত্ত্বিক অস্তিত্ব রক্ষা এবং ভূমির উর্বরতা ধরে রাখার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় চক্র। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন, উজানে অনিয়ন্ত্রিত মানবিক হস্তক্ষেপ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এই প্রাকৃতিক চক্রটি একটি ভয়াবহ দীর্ঘস্থায়ী মানবিক এবং অর্থনৈতিক সংকটে রূপান্তরিত হয়েছে।

সমতল ভূমির অতি মৃদু ঢাল (এবহঃষব ঝষড়ঢ়ব) এবং ধীর নিষ্কাশন ক্ষমতার কারণে দেশের নিষ্কাশন প্রণালী অত্যন্ত সংবেদনশীল। বর্ষাকালে যখন গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদের সর্বোচ্চ প্রবাহ প্রায় একই সময়ে ঘটে, তখন তাদের সম্মিলিত বিশাল স্রোত পদ্মা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীর মোহনায় এসে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয়। সমুদ্রের জোয়ারের পানির উচ্চতা এবং বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের কারণে নদীর পানি নিষ্কাশনের গতি অত্যন্ত ধীর হয়ে যায়, যা জলতাত্ত্বিক পরিভাষায়ব্যাকওয়াটার এফেক্ট’ (ইধপশধিঃবৎ ঊভভবপঃ) বা পশ্চাৎমুখী পানির চাপ সৃষ্টি করে। এই পশ্চাৎমুখী চাপ নদীর পানিকে তীরের বাইরে ঠেলে দেয় এবং প্লাবনভূমিতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার জন্ম দেয়। বদ্বীপীয় গঠনের এই সংবেদনশীলতা এবং জলতাত্ত্বিক ব্যবস্থার জটিলতা বুঝতে হলে দেশের ওপর ক্রিয়াশীল ভৌত শক্তি এবং বায়ুমণ্ডলীয় গতিবিদ্যাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

পৃথকভাবে নদীগুলোর অবদান বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

গঙ্গা নদী অববাহিকা: এটি প্রায় ,০৮০,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিষ্কাশন করে এবং প্রতি বছর প্রায় ৫০০ ঘন কিলোমিটার সুপেয় পানি ৫০০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে আনে। এই অববাহিকাটি ভারত, নেপাল, চীন এবং বাংলাদেশ এই চারটি দেশের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। 

ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকা: এই নদীটি প্রায় ৫৭৩,০০০ বর্গ কিলোমিটার অববাহিকা অঞ্চল থেকে বার্ষিক প্রায় ৬১০ ঘন কিলোমিটার পানি নিষ্কাশন করে, যা নদীগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি সমানভাবে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে এবং চীন, ভারত, ভুটান বাংলাদেশ এই দেশগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। 

মেঘনা নদী অববাহিকা: তুলনায় ছোট হলেও, এই অববাহিকাটি ৮২,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি বার্ষিক প্রায় ১০ ঘন কিলোমিটার সুপেয় পানি ৬০ মিলিয়ন টন পলি পরিবহন করে এবং এর ভৌগোলিক বিস্তার মূলত ভারত বাংলাদেশ জুড়ে। 

সম্মিলিত (এইগ): গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা অববাহিকাযাকে সম্মিলিতভাবে জিবিএম (এইগ) অববাহিকা বলা হয়এই তিনটি নদী ব্যবস্থা মোট ,৭৩৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং প্রতি বছর প্রায় ,১২০ ঘন কিলোমিটার সুপেয় পানি ,০৬০ মিলিয়ন টন পলি বঙ্গোপসাগরের দিকে পরিবাহিত করে। চীন, নেপাল, ভারত, ভুটান, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশএই ছয়টি দেশ সম্মিলিতভাবে এই বিশাল অববাহিকা ব্যবস্থায় অংশীদার হিসেবে রয়েছে। 

Related Posts