সোশ্যাল মিডিয়া শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষয়ের কারখানা || ড. জীবন বিশ্বাস
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে একেবারে শুরুতে যখন এক অভিনব প্রযুক্তি—স্থাপত্য হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছিল, বিশ্ব তখন সেটিকে মানবিক সংযোগের এক মুক্ত বাতায়ন বলেই ধরে নিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই প্রযুক্তি ভৌগোলিক সীমানা মুছে দিয়ে শিশুদের শিক্ষা, সৃজনশীলতা ও নতুন প্রজন্মের সন্ধান দেবে। অথচ এই আকর্ষণীয় ডিজিটাল প্রাসাদের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল এক ভিন্ন ব্যবসায়িক দর্শন যা শিশুর কল্যাণের উদ্দেশে তৈরি কোনো মৈত্রী ভবন নয় বরং মানুষের মনোযোগ হরণের এক বাণিজ্যিক আড়ত। ব্যবহারকারী যত দীর্ঘ সময় পর্দার নীল আলোয় চোখ আটকে রাখবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুলিতে জমা হবে তত বেশি আচরণগত উপাত্ত ও বিজ্ঞাপনের অর্থ। আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মসংযম ও ভালো—মন্দের সূক্ষ¥ হিসাব কষার ক্ষমতা যাদের এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি, সেই কোমলমতি শিশু—কিশোরদের এই অদৃশ্যমান জালে আটকে ফেলা এক অদ্ভুত মনোস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থ থেকে বিত্ত, বিত্ত থেকে আরও বিত্ত উৎপাদনই এখন মুখ্য। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
এই পটভূমিতে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্য়্যাপ এবং থ্রেডস—এর প্যারেন্ট কোম্পানি মেটা’র বিরুদ্ধে নিউ মেক্সিকোর ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে ঘোষিত ঐতিহাসিক রায়টিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর আর্থিক দণ্ড হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। এটি মূলত প্রযুক্তির নকশাজনিত ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহিতার এক বলিষ্ঠ মাইলফলক। ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড মেটাকে শিশু—কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষতি সামলাতে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিকার তহবিলে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর আগেই জুরি আদালত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ানি জরিমানা আরোপ করেছিল। ফলে এই মামলায় মেটার মোট আর্থিক দায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৪২ মিলিয়ন ডলারÑযা শিশুদের ওপর ডিজিটাল মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত মামলাগুলোর মধ্যে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিচারিক দণ্ড। যদিও মেটা এই রায় প্রত্যাখ্যান করে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবু এই বিচার এক ঐতিহাসিক সত্যের উন্মোচন ঘটিয়েছে।
২০২৩ সালে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস যখন মামলাটি দায়ের করেন, তখন অভিযোগগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী। মেটা তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে, অতিরিক্ত ব্যবহার উৎসাহিত করেছে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নিপীড়ন ও শিকারিদের সামনে অরক্ষিত অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। দুই পর্বের বিচার শেষে জুরি মেটাকে ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ লঙ্ঘনে দোষী সাব্যস্ত করে। পরবতীর্তে বিচারক বিডশেইড সিদ্ধান্ত দেন, এসব ক্ষতি সমাজে এক ধরনের বিষাক্ত জন—উপদ্রব সৃষ্টি করেছে। আদালতের দেওয়া স্মরণীয় উপমাটি এই সংকটের ভয়াবহতা সন্দেহাতীতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেÑ মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যেন এক একটি শিল্প কারখানা, তাদের পরিবেশিত বিষয়বস্তু হলো কারখানার উৎপাদিত পণ্য, আর শিশুদের মানসিক বিকৃতি ও যৌন শোষণ হলো সেই কারখানার নির্গত বিষাক্ত দূষণ। এই দূষণ একটি মুঠোফোনের ডিসপ্লেতে বন্দি থাকে না; তা পরিবারের বৈঠকখানা ও শ্রেণিকক্ষে ছড়িয়ে পড়ে, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বুকে দীর্ঘশ্বাসের জন্ম দেয় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বিরাট বোঝা বাড়ায়।
নির্ধারিত ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের তহবিলের মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার চিকিৎসার জন্য, ৯০ মিলিয়ন স্ক্রিনিং ও মূল্যায়নে, ৩৩ মিলিয়ন প্রতিরোধ ও সচেতনতায়, ১৫ মিলিয়ন রেফারেল সমন্বয়ে এবং ৯ মিলিয়ন ডলার বাস্তবায়নে বরাদ্দ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আদালত আগামী পাঁচ বছরের জন্য মেটা’র জন্য অবশ্য—করণীয় কিছু জরুরি সংস্কারও আরোপ করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী বয়স যাচাইকরণ ব্যবস্থা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত রাখা, অপরিচিতদের সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগ বন্ধ করা, যৌন ব্ল্যাকমেলের সতর্কবার্তা এবং নিউ মেক্সিকো স্টেটে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে মাসে সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টার সময়সীমা নির্ধারণ করা। তবে বিচারালয়ের এই ওষুধ রোগের মূল উপশম ঘটাতে পারলেও সংক্রমণের আসল কলকব্জা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি। আদালতের পক্ষে অ্যালগরিদম নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি, কারণ তা আইনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই সীমাবদ্ধতাই প্রমাণ কেও, কেবল বিচারালয় দিয়ে এই সর্বগ্রাসী ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়, প্রয়োজন ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য সর্বাত্মক আইন প্রণয়ন।
জনস্বাস্থ্যের তথ্য বিচার করলে দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেলের ২০২৩ সালের তথ্য অনুসারে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী আমেরিকান কিশোর—কিশোরীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই সামাজিক মাধ্যমের মোহে বন্দি। দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটানো কিশোরদের মানসিক হতাশা ও উদ্বেগের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। অন্যদিকে, পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষা জানায়, ২০২৪ সালে ৪৬ শতাংশ আমেরিকান কিশোর প্রায় সারাক্ষণ অনলাইনে যুক্ত ছিলÑএক দশক আগে যা ছিল মাত্র ২৪ শতাংশ। অবশ্য এই অন্তর্জালই যে প্রতিটি মানসিক অবসাদ, খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি বা আত্মপীড়নের একমাত্র কারণ, তা নয়। পারিবারিক বন্ধন ও আর্থিক সংগতির অভাব, সামাজিক বৈষম্য কিংবা বিদ্যালয়ের চাপও সমানভাবে দায়ী হতে পারে। কিন্তু কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন নিয়মিত কোটি কোটি কিশোরের অবচেতন মন নিয়ে অনৈতিক আচরণগত পরীক্ষা চালায়, তখন সুনির্দিষ্ট কার্যকারণের অস্পষ্টতাকে নিষ্ক্রিয়তার ঢাল বানানো অনুচিত।
ক্ষতির আসল বিষ লুকিয়ে রয়েছে প্ল্যাটফর্মগুলোর গোপন নকশার ভেতরে। সুপারিশকারী অ্যালগরিদম একজন পথহারা শিশুকে বারবার ঠেলে দেয় বিষণ্ণতা, চরম দেহভাবমূর্তিজনিত হীনমন্যতা বা সামাজিক তুলনার অতল গহ্বরে। তথাকথিত ‘লাইক’, অনুসারীর সংখ্যা আর নোটিফিকেশনের লাল বাতি সামাজিক স্বীকৃতিকে রূপান্তর করেছে এক মনোস্তাত্ত্বিক মাদকে। অন্তহীন স্ক্রল ব্যবহারের মানসিক বিরতিগুলোকে মুছে দেয়, আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) শিখে নেয় কীভাবে কিশোর মনকে একটানা বন্দি রাখা যায়। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে আসল বিপদের জন্ম হয় প্ররোচনামূলক নকশা, মানসিক দুর্বলতা, ক্ষতিকর বিষয়বস্তু ও অনলাইনের শিকারিদের যৌথ উপস্থিতিতে।
আইনের আদালতগুলো এখন ধীরে ধীরে এই রূপকল্প বুঝতে পারছে। ২০২৬ সালের মার্চে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের ক্ষতিকর নকশার জন্য মেটা ও গুগলকে দোষী সাব্যস্ত করে একজন তরুণীকে ৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের রায় দেয়, যার মধ্যে মেটার দায় ৪.২ মিলিয়ন এবং গুগলের ১.৮ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তীতে ১০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের নবম সার্কিট আপিল আদালত প্রায় ৩,০০০ ফেডারেল মামলা চালিয়ে যাওয়ার আইনগত বৈধতা প্রদান করে। এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল অন্যের বক্তব্য প্রকাশের নিষ্ক্রিয় আশ্রয়দাতা হতে পারে না; আর তাই তারা সেকশন ২৩০ ধারার সুযোগ নিয়ে নিজেদের মনোস্তাত্ত্বিক স্থাপত্যের দায়ও কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না।
ব্যবহারকারীর প্রতিটি মন্তব্যের দায় প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো হয়তো যুক্তিযুক্ত নয়, কিন্তু মনোযোগ ধরে রেখে মুনাফা কামানোর উদ্দেশে যেসব আচরণগত ফাঁদ প্রকৌশলীরা তৈরি করেছেন, তার দায় থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান অব্যাহতি পেতে পারে না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের তৈরি আর্টিফিশিয়াল অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার ভার একাকী একটি শিশুর ওপর ছেড়ে দেওয়া কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। রাষ্ট্র ও আইনপ্রণেতাদের উচিত অবিলম্বে কঠোর জাতীয় নীতিমালা, স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিশানা করে বিজ্ঞাপন বাণিজ্যের স্থায়ী অবসান ঘটানো। শৈশবকে যখন বাণিজ্যিক মুনাফার কাঁচামালে রূপান্তর করা হয়, তখন সেই ডিজিটাল বিষবৃক্ষের রোপণকারীদেরই সমাজের এই অপূরণীয় ক্ষতের পূর্ণ দায় বহন করতে হবে।
