স্মৃতির ক্যানভাসে তুরস্ক আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি
প্রতীক্ষার প্রহর গুনে অবশেষে সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল অটোমান সাম্রাজ্যের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ভূমিতে। আট প্রিয় বন্ধুর এক নিখাদ মিলনগাথাÑচারজন আমরা সুদূর আমেরিকার কর্মব্যস্ত জীবন থেকে ডানা মেলেছিলাম, আর বাকি চারজন এসেছিলেন জন্মভূমি বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশ থেকে আসা সেই বন্ধুদের দলেই ছিল আমার ছোটবেলার বন্ধু আমিরুল; তুর্কি ভাষায় তার সাবলীল দক্ষতার সুবাদে সে—ই হয়ে উঠেছিল আমাদের মূল গাইড, যার উষ্ণ সাহচর্য পুরো পথচলাকে করে তুলেছিল দুশ্চিন্তাহীন।
ইস্তাম্বুলের মাটিতে পা রাখতেই যেন ইতিহাসের ধূসর পাতাগুলো একে একে জীবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করল। বাইজেন্টাইন ও অটোমান সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি প্রায় দেড় হাজার বছরের সুপ্রাচীন আয়া সোফিয়ার বিশাল গম্বুজ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অটোমান সুলতানদের প্রশাসনিক কেন্দ্র ও ক্ষমতার প্রতীক ঐতিহাসিক তোপকাপি প্যালেসের আভিজাত্য আর সম্রাট প্রথম আহমেদের নির্মিত ছয়টি মিনার বিশিষ্ট সতেরো শতকের স্থাপত্য বিস্ময় ‘নীল মসজিদ’ (ইষঁব গড়ংয়ঁব)—এই তিনের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে যখন আমরা আট বন্ধু একই লাল—সাদা তুর্কি ফুটবল জার্সিতে হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম, তখন সময়ের ব্যবধান ঘুচে শৈশব ও কৈশোরের আড্ডা যেন ফিরে এসেছিল নতুন রূপে। গোধূলির আলোয় বোসফরাস প্রণালীর বুকে যখন আমাদের নৌকা ভেসে চলল, দুই তীরে এশিয়া ও ইউরোপের দিগন্তজোড়া রূপ, সুপ্রাচীন মিনারের ছায়া আর আধুনিক শহরের আলো ঝলমলে দৃশ্য আমাদের বুঁদ করে রেখেছিল এক মায়াবী আবেশে।
ইস্তাম্বুলে আমাদের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত মুহূর্তটি ছিল মহান সুফি সাধক ও দার্শনিক মৌলানা জালালউদ্দীন রুমির দর্শনে স্নাত ‘হোয়ার্লিং ডারভিশ’ বা সুফি নৃত্যের মুখোমুখি হওয়া। এটি কোনো সাধারণ শারীরিক পরিবেশনা নয়, সুফি পরিভাষায় এটি ‘সেমা’ (ঝবসধ), অর্থাৎ আত্মার পরমেশ্বরের পানে এক পবিত্র ঊর্ধ্বগমন। সাদা আলখাল্লা আর উঁচু টুপি পরা সাধকরা যখন বাঁশির একতার সুরের সাথে ছন্দ মেলাচ্ছিলেন মনে হচ্ছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নক্ষত্রপুঞ্জ যেন নিজ নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। এই ঘূর্ণন পার্থিব অহং ও মোহ ত্যাগ করে পরমাত্মায় বিলীন হওয়ার প্রতীক। তাদের এক হাত আকাশের দিকে প্রসারিত—ঐশ্বরিক কৃপা গ্রহণের সংকল্পে আর অন্য হাত মাটির দিকে—সেই অনন্ত ভালোবাসা পৃথিবীবাসীর মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারে। বাদ্যের মূর্ছনা আর সুফি ঘূর্ণন আমাদের হৃদয়ে এক পরম প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক ভাবের সঞ্চার করেছিল।
এরপর শুরু হলো আমাদের রোমাঞ্চকর ও দীর্ঘ এক রোড ট্রিপ। ইস্তাম্বুল থেকে কাপাডোকিয়ার দূরত্ব বাসে প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টার হলেও বন্ধুদের আড্ডা আর জানালার ওপারে বদলাতে থাকা ভূপ্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে ক্লান্তি শব্দটি পথ হারিয়েছিল। গভীর রাতে—ঠিক বারোটা নাগাদ যখন আমরা কাপাডোকিয়ায় পা রাখলাম, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা সুপ্রাচীন কেভ হোটেল বা পাহাড় কেটে তৈরি গুহাবাসগুলোর গৃহকোণ থেকে ভেসে আসছিল মৃদু সোনালী আলো। মনে হচ্ছিল কোনো রূপকথার কল্পকাহিনীর পাতায় ভুল করে হেঁটে এসেছি। প্রকৃতির এক অবিশ্বাস্য নিস্তব্ধতায় ঘেরা সেই কেভ হোটেলে কাটে আমাদের দুটি রাত।
কাপাডোকিয়া কেবল ওপর থেকেই সুন্দর নয়, এর মাটির নিচে ও পাহাড়ের পেটে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য বেঁচে থাকার গল্প। এখানকার সুপ্রাচীন কেভ বা ভূগর্ভস্থ শহরগুলোতে আমরা একটা দারুণ ট্যুর নিয়েছিলাম। গাইড থেকে জানতে পারলাম—প্রথম থেকে চতুর্থ শতকে (বিশেষ করে প্রথম ও তৃতীয় শতাব্দীতে) রোমান সাম্রাজ্যের বহুশ্বরবাদী সম্রাটদের ভয়াবহ ধর্মীয় নির্যাতন ও আক্রমণের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কীভাবে আদি খ্রিস্টানরা এই পাহাড় কেটে গুহা ও মাটির নিচে বিশাল নগরী তৈরি করে লুকিয়ে থাকতেন। রোমানদের সম্রাট পূজা ও দেব—দেবীর আরাধনা অস্বীকার করায় খ্রিস্টানদের ওপর নেমে এসেছিল এই চরম নির্যাতন। শুধু যে আত্মগোপন করেছিলেন তা—ই নয়, এই পাথুরে গুহার ভেতরেই তারা খোদাই করে তৈরি করেছিলেন নিজেদের প্রার্থনার স্থান বা আন্ডারগ্রাউন্ড চার্চ! আজও সেই অন্ধকার পাথরের গায়ে সুপ্রাচীন ধর্মীয় চিত্র ও চার্চের নিদর্শন টিকে আছে, যা দেখে মানবজাতির বিশ্বাস ও টিকে থাকার অদম্য সংগ্রাম উপলব্ধি করে অবাক হতে হয়।
পরদিন খুব ভোরে শুরু হলো কাপাডোকিয়ার আরও এক জাদুকরী অধ্যায়। আকাশে তখন শত শত রঙিন হট এয়ার বেলুন উড়ছে, আর ঠিক তখনই বিশাল সেই বেলুনের ঝুড়িতে চেপে আমরাও ডানা মেললাম মেঘের দেশে। দিগন্ত ছুঁয়ে যখন ভোরের প্রথম সূর্যোদয় দেখা দিল, আর ওপর থেকে কাপাডোকিয়ার সেই অবিশ্বাস্য পাথুরে পাহাড়ের ওপর আলোর খেলা ছড়িয়ে পড়ল, সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি আর চোখজুড়ানো রূপ আমাদের স্মৃতিপটে চিরকালের জন্য রূপালি ফ্রেমে বাঁধাই হয়ে রইল।
কাপাডোকিয়ার মুগ্ধতা বুকে নিয়ে আমাদের যাত্রা প্রসারিত হলো সমুদ্র আর পাহাড়ের যুগলবন্দিতে রূপসী শহর আনাতালিয়ার দিকে। আনাতালিয়ার কোলে অবস্থিত ঐতিহাসিক অ্যাসপেন্ডোস থিয়েটার দেখার অনুভূতি ছিল এককথায় রোমাঞ্চকর। প্রায় একশো পঞ্চান্ন খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের রাজত্বকালে স্থপতি জেনোর জাদুকরী নকশায় গড়ে উঠেছিল এই বিস্ময়। এটি আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুসংরক্ষিত রোমান থিয়েটারগুলোর একটি। প্রায় বিশ হাজার দর্শক আসনবিশিষ্ট এই পাথুরে স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় জাদুকরী দিক হলো এর অবিশ্বাস্য শব্দপ্রকৌশল (অপড়ঁংঃরপং)। সুউচ্চ মঞ্চ আর সিঁড়ির গায়ে ধ্বনির এমন অপূর্ব প্রতিফলন ঘটে যে, মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাতে তালি দেওয়ার শব্দও ওপরের প্রান্তে বসা দর্শক স্পষ্ট শুনতে পান।
দুই হাজার বছরের পুরনো সেই পাথুরে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আমরা আট বন্ধু যখন সুর মেলালাম আমাদের জন্মভূমির গানে, তখন মনে হলো, শিল্প ও সুরের তো কোনো দেশী—বিদেশী সীমানা থাকে না! বাংলার সুর প্রতিফলিত হচ্ছিল রোমান ইতিহাসের বিশাল দেয়ালে। আর সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হলো যখন বন্ধু আমিরুল, তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নাট্যচর্চার স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে, এই মহাজাগতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে মহাকবি কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ নাটক থেকে একক সংলাপ আবৃত্তি করল। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, নিথর প্রাচীন পাথরগুলো যেন হাজার বছরের ঘুম ভেঙে আবারও শিল্পের স্পর্শে জেগে উঠেছে।
ইতিহাসের গভীরে আরও এক ধাপ প্রবেশ করতে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল প্রায় আট হাজার বছরের মহাকাব্য বুকে ধারণ করে থাকা সুপ্রাচীন নগরী ইফেসাস। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের এশিয়া প্রদেশের এই সমৃদ্ধ রাজধানী ও বন্দরনগরীর মার্বেল বাঁধানো পথ, সুউচ্চ স্তম্ভ আর হেড্রিয়ান মন্দিরের অলঙ্কৃত কারুকাজ আমাদের অতীতের মহিমান্বিত গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
পাঠকের সুবিধার্থে ইফেসাসের ইতিহাসের পাতাটি একটু উল্টানো যাক। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪ অব্দে পারস্য শাসন থেকে ইফেসাসকে মুক্ত করেন মহাবীর সেকান্দার (অ্যালেকজান্ডার দ্য গ্রেট)। ইফেসাসে পদার্পণ করার পর প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম ‘টেম্পল অব আর্টেমিস’—এর অসম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ দেখে তিনি তা নিজ অর্থায়নে সমাপ্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে দূরদর্শী ইফেসাসবাসীরা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। সম্রাটকে দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে তারা বলেন—‘এক দেবতার পক্ষে কি অন্য দেবতার উপাসনালয় নির্মাণ করা মানায়?’ বাহ্যিকভাবে তোষামোদ মনে হলেও, তাদের আসল কৌশল ছিল একজন বিশ্ববিজয়ী সম্রাটের অনুগ্রহ ও ঋণের শিকলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব না বিকিয়ে দেওয়া।
পরবর্তীকালে খ্রিস্টীয় সতেরো অব্দে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ইফেসাস শহরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তবে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জন্ম নেয় নগরটি। সেযুগের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আরিস্টিওসহ বহু জ্ঞানীর মতে, ইফেসাস দ্রুতই পুরো এশিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং দর্শন চর্চার শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান দর্শন চর্চাকেন্দ্র এবং বিখ্যাত সেলসাস লাইব্রেরি আজও সেই সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
ইফেসাসের এই মহিমান্বিত অতীত পেরিয়ে আমরা গিয়েছিলাম তার কাছেই এক নির্জন পাইন বন ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ‘হাউস অব দ্য ভার্জিন মেরি’তে। বিশ্বাস করা হয়, যিশু খ্রিস্টের তিরোধানের পর মাদার মেরি তাঁর জীবনের শেষ প্রায় আটটি বছর এই শান্ত, নিভৃত প্রাঙ্গণেই কাটিয়েছিলেন। স্থানটির আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য ও নিরিবিলি পরিবেশ আমাদের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল এক পরম প্রশান্তিতে।
ভ্রমণের শেষভাগে ইজমিরে এজিয়ান সাগরের উপকূলে দাঁড়িয়ে দিগন্তে সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে মিলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করা আর সমুদ্রের স্নিগ্ধ বাতাসে রাতভর মেতে থাকা আড্ডার মুহূর্তগুলো ছিল বড্ড অমলিন। ইস্তাম্বুলে ফেরার পর মামুন ও রোজী আমাদের দুদিন আগেই বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেয়। ওদের বিদায়ে মনটা কিছুটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। আটজনের কোলাহলময় দলটি হঠাৎ ছোট হয়ে গেলেও আমাদের স্মৃতির থলেটি কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। বিদায়ের শেষলগ্নে ভোরে ইস্তাম্বুলের নিঝুম রাস্তায় নির্জনতা উপভোগ করা, শতবর্ষী গ্র্যান্ড বাজারের অলিগলিতে ইতিহাসকে ছোঁয়া, আর বোসফরাস পেরিয়ে এশীয় অংশে অশোকের চমৎকার আতিথেয়তায় নৈশভোজÑসব মিলিয়ে ট্রিপটির শেষটা হয়েছিল দারুণ এক মধুর পরিসমাপ্তিতে।
তুর্কি কফির গাঢ় সুবাস, এজিয়ানের বাতাস, রুমির সুফি সুর আর হাজার বছরের ইতিহাস সাথে নিয়ে আমরা চারজন আবার আমেরিকার পথে পা বাড়ালাম। ভৌগোলিক দূরত্ব আবার আমাদের আলাদা করবে ঠিকই, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো এই দিনগুলো অনন্তকাল হৃদয়ে আলো ছড়াবে। আবার কোনো এক অচেনা শহরে, কোনো এক নতুন প্রভাতে আমাদের দেখা হবেÑএই বিশ্বাস নিয়ে বিদায়, প্রিয় তুরস্ক!
