অশুভ মেঘ কেটে যাবেই
মানুষ কতটা পাল্টেছে? শারীরিকভাবে যে পাল্টায়নি, তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় ৫০০ বছর আগে বা পরের মিকেলএঞ্জেলোর ডেভিড ভাস্কর্য আর বাতিচেল্লি বা জিওরাজিয়োনির স্লিপিং ভেনাসসহ ভেনাসের অন্য চিত্রকর্ম দেখলে। তখনও নারী ও পুরুষের দেহ সৌষ্ঠব্য সুন্দর ছিল। সেটা অবশ্য খুব একটা জরুরী নয়, জরুরী হচ্ছে মন ও মননে কতটা পাল্টেছে তা দেখা ও উপলব্ধি করা। ইয়োরোপে রেনেসাঁ বা ক্লাসিকেল যুগের আগেও শাসকদের মনঃপুত হয়নি এমন কথা বলার জন্য নামী মানুষদের হত্যা করা হয়েছে, আগুনে ছুঁড়ে মারা হয়েছে, বা গ্যালিলিওর মত কারান্তরালে আটক করে রাখা হয়েছে। যীশু খৃস্ট তো শুভবোধ ও সত্যই প্রচার করেছিলেন, তাকে কী নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে সে কথা সকলেই জানেন। আজও কি একইভাবে অন্য মতাবলম্বীকে হত্যা করা হচ্ছে না? আজও কি অন্য মতাবলম্বীকে জেলে ঢোকানো হচ্ছে না? না শুধু বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে না, পৃথিবীর কম বেশি সব দেশেই এমন ঘটনা ঘটছে। এমন কি আমেরিকার মত দেশেও। তবে বাংলাদেশের মত অসহিষ্ণু মতাদর্শের মানুষদের দেশে একটু বেশি।
পৃথিবীতে আজ সীমান্ত আছে ঠিক। সীমান্তের তারকাঁটার বেষ্টনি আছে, কোথাও সুউচ্চ প্রাচীর আছে। এসবই মানুষকে আটকানোর জন্য। কিন্তু মানুষেরই তৈরি প্রযুক্তি মানবসমাজকে তথ্য প্রযুক্তির মহাসড়কে তুলে দিয়েছে। এই মহাসড়ক সীমান্তের তারকাঁটা বা দেয়াল দিয়ে আটকানো যায় না। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কী ঘটছে তা আমেরিকায় বসেও দেখা, শোনা ও জানা যায়। ফলে প্রায় প্রত্যেকটি দেশ প্রত্যেকটি দেশের সাথে সংযুক্ত। গুগল নামক সার্চ ইঞ্জিন দিয়ে ফোন থেকেই পাওয়া যায় যাবতীয় তথ্য। আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নামক প্রযুক্তি যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
মানুষ যখন এইভাবে দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে, তখন মানুষই আবিষ্কার করছে মানব সমাজের নতুন দেয়াল। তারা জানতে পারছে কোন্ ব্যক্তি ক্ষমতা, অর্থ ও ধর্মের লেবাস পরে অপরাধ করছে, জানা হয়ে যাচ্ছে কোথায় কী অপরাধ হচ্ছে।
একদা পৃথিবীর অনেক দেশে নারী—শিশু জন্ম নেয়ার পর হত্যা করা হতো। এমন অমানবিক অনাচার যে পৃথিবীতে বেশিদিন স্থায়ী হয় না সে কথা জানা সত্ত্বেও এই অনাচার বন্ধ হয়নি। এত বছর পর তা চলছে অন্য পন্থায়। গাজায় হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, যাতে তারা বড় হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে। শুধু গুলি করে, মিসাইল—মর্টার—বোমা ছুঁড়ে হত্যা নয়, এখন মানসিকভাবে হত্যা করা হচ্ছে। ড্রাগের অবাধ গতিধারা সৃষ্টি করে তরুণদের ধ্বংস করা হচ্ছে। অর্থ চুরি, ব্যাংক লুট এবং নানা অন্যায়ের মধ্য দিয়ে অর্থবিত্ত বাড়ানোর নেশায় ছুঁড়ে ফেলে নৈতিকতা নিঃশেষ করা হচ্ছে।
অনেক আগে ঘটনা যে দেশে ঘটত, সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকত, দেশের বাইরে যেত না। ফলে কোথায় কোন্ দেশে কত নিষ্ঠুর গণহত্যা হয়েছে তার অনেক খবর অন্য দেশের মানুষ খুব কমই জানতে পারত। কিন্তু আজ আর তা গোপন থাকছে না। মানুষ জানতে পারছে কোথায় কী নিষ্ঠুরতা চলছে, কোথায় এ যুগের মবতন্ত্রের মাধ্যমে ‘অপ্রিয়’ মতামতের ব্যক্তিদের হত্যা করা হচ্ছে, কোথায় গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, কোথায় কে কাকে ট্রেনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করছে।
গণতন্ত্রের মূল কথা সহিষ্ণুতা। অন্যের মতামত পছন্দ না হলেও তার মতামতকে দমন করা যাবে না। কিন্তু পৃথিবীতে এই সহিষ্ণুতা কত মানুষের আছে? নেই বলেই আজো প্রকৃত গণতন্ত্র কোথাও নেই। আমেরিকার গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো, সরকারের তিনটি উইং, তারা স্বাধীন। এটা হচ্ছে এক ধরনের বাধ্যবাধকতা। হয়ত এটাই বাস্তবতা।
খেলার মাঠে হোক আর সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রে হোক, আর ঘরে হোক সর্বত্রই ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা এবং শক্তির কারণে অন্যকে মেরে—কেটে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানোর নিম্ন রুচির প্রকাশ ঘটে চলেছে। একবিংশ শতকে মানুষের উন্নয়নের, এগিয়ে যাওয়ার ও বিকাশের যে পরাকাষ্ঠা তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা ছিল অনেক মানুষের, তাকে ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাসীনরা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ড্যামেজ করে চলেছে।
এই অবাধ তথ্য প্রবাহের প্রযুক্তিতে সবচেয়ে বেশি অভ্যস্ত নতুন প্রজন্ম। তাদের কাছ থেকে কিছুই আড়াল করা সম্ভব নয়। যখন পৃথিবী জুড়ে এইসব অমানবিক ঘটনাসমূহ, এই রকম শিশু হত্যা, ইমিগ্রেশনের নামে শিশুদের বন্দি করা, পথে—ঘাটে গুলি করে শিশু—কিশোরদের হত্যা, কিশোর গ্যাং নামে নতুন গ্যাং তৈরি করে রাজনৈতিক ঘেরাটোপে একটি প্রজন্মকে নিঃশেষ করে দেয়া, স্কুল, কলেজ ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়ার মান নামিয়ে দেয়া, মুক্তচিন্তা, পরমত সহিষ্ণুতার চর্চাকে ধ্বংস করার মত অবিমৃষ্যকারিতা যেভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে গ্রাস করছে, তাতে দুশ্চিন্তার বিপুল কারণ তৈরি হয়েছে। কারণ এই প্রজন্ম যখন তারুণ্যে প্রবেশ করবে, তখন শুধু চাকরির বাজার অনিশ্চিত হবে তাই নয়, তখন তারা সুস্থ মানসিক অবস্থায় জীবন চালাতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রচন্ড অনিশ্চয়তার আলামত দেখা যাচ্ছে। আজ যখন অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সে দেশের শক্তি ও ক্ষমতার বলে ধরে আনা হয়, তা শুধু একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত নয়, তা মানবাধিকারেরও চরম অবমাননা। এই ঘটনায় কোনো ক্ষমতাবান রাষ্ট্রপ্রধান হয়ত একজন অসাধু রাষ্ট্রপ্রধানকে শাস্তি দিলেন, কিন্তু এই শাস্তি দেয়ার অন্য কোনো পন্থা ছিল কিনা তা ভেবে দেখা উচিত ছিল। কারণ এই ঘটনা নতুন প্রজন্মের সদস্যরা কোনোভাবেই সহজে গ্রহণ করবে না।
আমরা প্রায়শই নতুন প্রজন্মকে আমাদের আগামী, আমাদের ভবিষ্যত কান্ডারি হিসাবে চিহ্নিত করি, কিন্তু তাদের মনে কী অভিঘাত তৈরি করছি তা ভাবছি না। তাই ভবিষ্যত নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা মেরামত করার কোনো শর্টকাট পথ দেখা যাচ্ছে না। তবুও হাল ছাড়লে চলবে না। নিশ্চয় কোনো মেঘই দীর্ঘদিন জমাট বেঁধে আকাশকে ঢেকে রাখে না। এই অশুভ মেঘও অবশ্যই কেটে যাবে।
