ভারতের বিএনপি ফ্যাক্টর || মফিজুল হোসাইন
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন দিবসে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবনকে ‘জুলাই যাদুঘর’ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধন করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ডঃ ইউনুসকে বিশেষ সম্মান দেয়ায় এক নতুন জল্পনার জন্ম দেয়। ওদিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই দিনে দিল্লিস্থ বিদেশী সাংবাদিক ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি একটি অডিও ভাষণ দেন, যেখানে আমেরিকার ভার্জিনিয়া থেকে তার পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। শেখ হাসিনাকে ভাষণ দিতে দেওয়ায় বিএনপি সরকার ভারতের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ভারত সরকার প্রথমে জানায় এটি একটি প্রাইভেট ঘটনা, তাতে ভারত সরকারের কোনো হাত নেই। কিন্তু ঢাকা সেটা মানতে রাজি নয়। সম্পর্ক আরো নেতিবাচকের দিকে যেতে থাকলে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। শুধু তাই নয়, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানও ঢাকায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে বৈঠক করে ফিরে যান। কেন ভারত এত উদ্বিগ্ন, বিএনপির করণীয় এবং আওয়ামী লীগ নিয়ে ছোট্ট একটি বিশ্লেষণ।
ভারত: বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় একসময় আওয়ামী লীগকে রাখতে চাইলেও এখন ভারত সেভাবে আর ভাবে না। তাছাড়া, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ব্যাপক ভারত বিরোধী মনোভাব উপলব্ধি করে সে দেশের প্রথমসারির গণমাধ্যমগুলো মোদি সরকারের সমালোচনায় মুখরিত ছিল। সে কারণেই ডঃ ইউনুস এবং পরবর্তীতে তারেক রহমানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমনকি তারেক রহমানকে খুশী করতে তার মায়ের মৃত্যুর সময় অতিরিক্ত পথ হেঁটেছে। কিন্তু ভারত তার কাংখিত সাড়া পায়নি। ঢাকার দিকে তাদের সতর্ক দৃষ্টি থাকলেও তাদের বৃহৎ দৃষ্টি পাকিস্তানের দিকে। চীনের চেয়ে পাকিস্তানকে তারা বেশি নিরাপত্তা হুমকি মনে করে। তাদের আরো বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়েছে অতি সম্প্রতি, গত ৬ আগস্ট, সৌদি আরবের মক্কায় পাকিস্তান, তুরস্ক, এবং সৌদিআরব একটি সামরিক জোট গঠন করে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করা, এই জোট ভারতের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন করতে পারে। চুক্তির একটি ধারা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ এর মতো, অর্থাৎ একটি দেশ আক্রান্ত হলে অপর দেশগুলোও আক্রান্ত হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। ঐ জোটে পাকিস্তান ও তুরস্কের রয়েছে প্রযুক্তি আর জনবল, এবং সৌদি আরবের অর্থ, এটাই এ মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। অবশ্য ভারতও ইসরাইল, গ্রীস, সাইপ্রাস, আরব আমিরাত সহ সামরিক জোট গঠনের পাল্টা চেষ্টা করছে।
ওদিকে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের অবনতি। অবশ্য এটা পেন্টাগনের পরিকল্পনা না ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব ছক, বলা মুশকিল। আমেরিকা এখন চীন মোকাবেলায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের চিন্তা থেকে সরে এসেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা ডক্ট্রিনে এ কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তারা তাদের ইন্দো—প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নাম পরিবর্তন করে শুধু প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি রেখেছে এবং চার দেশীয় জোট (আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত) কোয়াড গঠনে এখন আর আগ্রহী নয়। ফলে ভারতের সামরিক গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে।
চীনও ভারতকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। এক সময় তারা আমেরিকার সাথে সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলো। এখন সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চাইলেও চীনের আস্থা পেতে ভারতকে আরো সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। তবে চীন বসে নেই, তারা ভারতের দিকে দৃষ্টি দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাজাচ্ছে।
বাংলাদেশ সহ কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব একটা ভালো নেই। এরকম একটি অবস্থায়, ভারতের একমাত্র চাওয়া পাকিস্তান বা ত্রিদেশীয় জোট ঢাকায় যেন কোনো ঘাঁটি স্থাপন করতে না পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি জায়গায়, যেখান থেকে ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া সম্ভব। ঢাকা থেকে এরকম কোনো ইঙ্গিত পেলে ভারত বাংলাদেশের জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত। কিন্তু ঢাকার সাড়া মিলছে না। ডঃ ইউনুস সরকারের চেয়ে বিএনপির সরকার ভারতের প্রতি নমনীয় থাকলেও কাংখিত কিছু না পেয়ে তারাও তাদের মতো করে গুটি সাজাচ্ছে। কিছুদিন আগে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ দখলের পরই তসলিমা নাসরিনকে কলকাতায় ফিরিয়ে এনে রাজকীয় সংবর্ধনা দেয়। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তসলিমার গলায় গেরুয়া পট্টি বেঁধে দেন। তসলিমাও বিজেপির কানে মধু ঢেলে দিয়ে মুসলিম বিরোধী একগাদা বক্তব্য দেন। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ তাদের আরেকটি গুটি। শেখ হাসিনার দিল্লি ভাষণের আয়োজক নেতারা প্রচার করেছিলেন যে শেখ হাসিনা সশরীরে উপস্থিত থাকবেন, কিন্তু বিএনপির তীব্র প্রতিক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার সেটা বাতিল করে শুধু অডিও ভাষণের অনুমতি দেয়। শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয় কিছুটা বিক্ষুব্ধ হয়েই সম্ভবত তার বক্তব্যে ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভারত এখনো চুপ করে থাকলে বাংলাদেশ মৌলবাদীদের দেশ হয়ে যাবে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এখনো সব আশা ছেড়ে দেয়া হয়নি, সে জন্যই ৯ আগস্ট, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাথে এক সাক্ষাতের শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এক সঙ্গে বসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, তার এ কথার তাৎপর্য অনেক গভীর, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে এখন বিজেপি সরকার, তিস্তা সহ অন্যান্য সব সমস্যা সমাধানের এখন উপযুক্ত সময়।
বিএনপি: এ দলটি গঠন করার পর থেকে এত ভালো সময় বিএনপি আর কখনো উপভোগ করেনি। তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সবসময় কিছু না কিছু অস্বস্তিতে রাখতো দলটিকে। আবার, বর্তমানে বিএনপি এটাও মনে করে না শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে একটি ভাষণ দিলে বা শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিরাট কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। তবে ভারতের পক্ষে অনেক কিছুই সম্ভব, সেটাও তারা বোঝে, তসলিমা নাসরিন, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাভাষীদের পুশব্যাক ছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রচুর ভারতীয় লোকজন আছে বলে মনে করা হয়। আবার জনমতকে উস্কে দিতেও এতটা প্রতিক্রিয়া দেখানো হতে পারে, বর্তমানে ভারত বিরোধী মনোভাব বাংলাদেশে ব্যাপক।
ভূ—রাজনীতিতে তারেক রহমানের কোনো নির্দেশনা আছে কি না বলা কঠিন, কারণ তারেক রহমানের বর্তমান মাইল্ড চরিত্র, এবং খুবই উত্তেজনা ও গুরুত্বপূর্ণ দু’টি অংশের দিকে গভীর পর্যালোচনা না করে একদিকে ঝুঁকে যাওয়া, তার চরিত্রের সঙ্গে যায় না। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোন দেশের লোক, সেটা আর গোপন নেই।
গভীর পর্যালোচনা না করে নবগঠিত ত্রিদেশীয় সামরিক জোট বা পাকিস্তানপন্থীদের দিকে ঝুঁকে যাওয়া দেশের জন্য মঙ্গল নাও হতে পারে। ঐ তিন দেশের মধ্যে একমাত্র সৌদি আরব ছাড়া অর্থনৈতিক ভাবে কেউই সমৃদ্ধ নয়, দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে যাবার ঝুঁকিও বাড়বে। অন্যদিকে আর কিছু না হোক, ভারতের কাছ থেকে খাদ্য নিরাপত্তার সহায়তা, পানি বন্টন, সীমান্ত সমস্যা সমাধান করা সহজ হবে। তারেক রহমানের সরকার যদি ভারতের নিরাপত্তার হুমকিতে কোন সহায়তা না করে, নিশ্চিত করা বলা যায় ভারত হাসিনাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না। আবার তারেক রহমান সরকারকে এটাও মনে রাখতে হবে, আমেরিকা—পাকিস্তান প্রেম ক্ষণস্থায়ী, আমেরিকা—ভারত সম্পর্কের মুল আর্কিটেক্ট ইহুদি লবি, তারা সক্রিয়, যে কোন সময় বাংলাদেশ নীতি পরিবর্তন হতে পারে।
আওয়ামী লীগ: সময়টা আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন, সেটা মাথায় রেখেই আওয়ামী লীগকে এগুতে হবে। পুরনো আওয়ামী লীগের কিছু সুবিধাভোগী নেতা যেসব আবোল তাবোল বলেন যেমন, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ৯০%, হাসিনা নামলে বিএনপি, জামাত, এনসিপি ভেসে যাবে, তারেক পালানোর পথ খুঁজে পাবে না, ইত্যাদি পরিহার করে দলকে নতুন করে সাজাতে হবে, গুম খুনের বিষয় স্বীকার করে অনুশোচনা করতে হবে, সকল প্রকার প্রতিহিংসা ভুলে গিয়ে দেশ এগিয়ে নিতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আওয়ামী লীগকে আরো উপলব্ধি করতে হবে রাজনৈতিক ময়দানে লড়াই করার মতো শক্তি তাদের নেই, তাদের আমলে দুটি নির্বাচনে কারচুপির জন্য নতুন জেনারেশন তাদের প্রতি বিতশ্রদ্ধ, বাপ দাদারা আওয়ামী লীগ করতো বলে এ যুগের ছেলেমেয়েরা তাই করবে, সেই দিন নেই। শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ৫ আগস্ট তার বক্তব্যে ভারতকে বাংলাদেশে যে হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন, তা অপ্রত্যাশিত ও নিন্দনীয়, এসব মন্তব্য তাকে এবং তার দলকে আরো পিছিয়ে দেবে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বয়স, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক অবস্থান, কোনটাই আওয়ামী লীগকে সহায়তা করার মতো অবস্থানে নেই। সবচাইতে বড় বিষয় বিএনপি বা অন্যান্য দলগুলোর সাথে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা বেশ কঠিন।
