গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— বাইশ রূপালী পর্দার প্রথম সুর—সম্রাজ্ঞীঃ শিল্পী কানন দেবী
জীবন বিশ্বাসঃ সেলুলয়েডের ধূসর ফ্রেমে যখন ছায়ারা প্রথম কথা বলতে শিখল, তখন সে এক অদ্ভুত ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুহূর্ত। সেই ধূসর সময়টিতে অন্দরমহলের কঠিন ঘেরাটোপ আর পরাধীন সমাজের রক্তচক্ষু ডিঙিয়ে রূপালী পর্দায় এক নারী এসে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁর চোখের চাহনিতে ছিল প্রখর আত্মবিশ্বাস আর কণ্ঠে ছিল এক উন্মুক্ত ঝরনার স্বতঃস্ফূর্ত বেগ। তিনি কেবল চিত্রনাট্যের সংলাপ মুখস্থ করে রূপালী পর্দায় অভিনয় করেই থেমে থাকেননি বরং নিজ হাতে সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে সেই আলো—ছায়ার রাজত্বে নিজের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যে যুগে নারীশিল্পীর নাম জনসমক্ষে উচ্চারণ করাকেও সুশীল ভদ্রসমাজ একপ্রকার গর্হিত অপরাধ বলে গণ্য করত, সেই অনাচারের সময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম অবিসংবাদিত রাজরানি। তাঁর গায়কিতে যে কেবলমাত্র মিষ্টি সুরের মেদুরতা ছিল তা নয়, ছিল এক স্বাধীন মননের প্রদীপ্ত আত্মঘোষণাওÑযেখানে প্রতিটি তান আর প্রতিটি মীড় এক একটি অবাধ্য ও সংগ্রামশীল জীবনের জয়ধ্বনি দিত।
১৯১৬ সালের ২২ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই সুর—সম্রাজ্ঞীর পিতৃদত্ত নাম ছিল কাননবালা। মাতা রাজবালা দেবী এবং পালক পিতা রতনচন্দ্র দাসের অতি সাধারণ আশ্রয়ে শৈশব শুরু হলেও, পিতার আকস্মিক প্রয়াণে মা ও ছোট্ট কাননের জীবনে নেমে আসে চরম অমানিশা ও বেঁচে থাকার নির্মম সংঘাত। কিন্তু নিয়তির সেই নির্মম পরিহাসকে পেছনে ফেলে, মাত্র দশ বছর বয়সে ১৯২৬ সালে শুভানুধ্যায়ী তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় ‘মদন থিয়েটার্স’—এর ‘জয়দেব’ নামক নির্বাক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে যে শিশুকন্যাটির রূপালী পর্দায় প্রথম পদার্পণ ঘটেছিল, তিনিই পরবর্তীতে নিজের অদম্য মেধা ও একনিষ্ঠ সাধনায় রূপান্তরের এক মহাকাব্য রচনা করেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, অভাবনীয় জনপ্রিয়তা, নিজস্ব চলচ্চিত্র প্রযোজনা, সমাজসেবা এবং ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ অর্জনের পর ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই কলকাতায় এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। কানন দেবীর জীবনবৃত্তান্তের ভেতরে এই শুরু ও শেষের মেলবন্ধন মূলত এই ঐতিহাসিক সত্যকেই প্রমাণ করে যে, দারিদে্র্যর অন্ধকারে নিমজ্জিত এক অসহায় শিশুকন্যাও আত্মমর্যাদা ও সাধনার বলে একটি বিশাল দেশের সংস্কৃতি—মানচিত্রে নিজেকে অমর করে তুলতে পারে।
নির্বাক যুগ থেকে সবাক চলচ্চিত্র ও কানন দেবীর উত্থান
বাংলা সিনেমার প্রারম্ভিক পর্বে একজন নারীর অভিনয় বা গান গাওয়াকে সমাজ কখনো সহজভাবে গ্রহণ করেনি। প্রথাগত কোনো ট্রেনিং স্কুল বা অভিনয় একাডেমি তখন ছিল না। কাননবালাকে নিজের চোখ, কান ও অন্তর্নিহিত অনুভূতিকে তীক্ষè করে অভিনয় ও গায়কির জটিল ব্যাকরণ শিখতে হয়েছিল। নির্বাক যুগের ‘শঙ্করাচার্য’, ‘ঋষির প্রেম’, ‘বিষ্ণুমায়া’ কিংবা ‘প্রহ্লাদ’—এর মতো ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সেলুলয়েডের ভাষা আয়ত্ত করেন। তবে সবাক চলচ্চিত্রের আগমনে যখন সুর ও সংলাপের মেলবন্ধন ঘটল, তখন ‘জোর বরাত’, ‘মা’ কিংবা ‘মনোময়ী গার্লস স্কুল’—এর অভূতপূর্ব সাফল্য তাঁকে এনে দিল নতুন এক পরিচয়। এরপর তিনি যুক্ত হলেন তৎকালীন বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘নিউ থিয়েটার্স’—এর সঙ্গে। ‘মুক্তি’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘সাথী’, ‘স্ট্রিট সিঙ্গার’, ‘সাপুড়ে’, ‘পরাজয়’ ও ‘অভিনেত্রী’—র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি সাধারণ ‘কাননবালা’ থেকে রূপান্তরিত হলেন স্বমহিমায় প্রদীপ্ত ‘কানন দেবী’তে। এই নাম পরিবর্তন কেবল কোনো ব্যবসায়িক তকমা ছিল না, এটি ছিল একজন নারীশিল্পীর সামাজিক আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আভিজাত্যের রাজকীয় সিলমোহর।
সুরের গুরুগৃহ, রাগসংগীত ও দ্রুত লয়ের কারিগরি
কানন দেবীর গায়কির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি কণ্ঠের ভেতর দৃশ্যের শরীর ও আবহ তৈরি করতে পারতেন। সে যুগে আধুনিক প্লেব্যাক প্রযুক্তির সহজ সুবিধা ছিল না। পর্দায় নিজে অভিনয় করতে করতেই গাইতে হতো, আর সেই জীবন্ত গায়নে ধরে রাখতে হতো চরিত্রের সূক্ষ¥তম আবেগ। প্রথম জীবনে প্রথাগত শাস্ত্রীয় তালিম না থাকলেও, নিজের ভেতরের ঘাটতিকে তিনি তীব্র সাধনায় জয় করেছিলেন। লক্ষেèৗর ওস্তাদ আল্লারাখা খাঁর কাছে মার্গসংগীতের তালিম, মেগাফোন গ্রামোফোন কোম্পানিতে গাওয়ার সুবাদে সঙ্গীতাচার্য ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে স্বরের সুসংহত অনুশীলন, অনাদি দস্তিদারের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা, ধীরেন্দ্র মিত্রের কাছে বৈষ্ণব কীর্তনের ভাবাবেগ এবং কাজী নজরুল ইসলামের কাছ থেকে সরাসরি নজরুলগীতির মায়াবী রস আস্বাদন করে তিনি তাঁর কণ্ঠকে বহুস্বরে সমৃদ্ধ করে তোলেন। এর ওপর নিউ থিয়েটার্সের সংগীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়ালের জহুরির মতো চোখ ও সুর—পরিচর্যা তাঁর কণ্ঠকে দান করেছিল এক অবিশ্বাস্য গতি ও স্ফটিকস্বচ্ছ স্পষ্টতা। দ্রুত লয়ে গান গাওয়ার মতো দুরুহ কৌশল তিনি যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামলাতেন, তা তখনকার দিনে ছিল একেবারেই অভূতপূর্ব।
সেলুলয়েডের সুর—চিত্র ও নারীর কণ্ঠের স্বাধীনতা
কানন দেবীর গান কেবল ছবির অলংকার ছিল না, তা ছিল চরিত্রের ভেতরের আত্মপ্রকাশ। ‘আমি বনফুল গো’ গানটির মধ্য দিয়ে যখন তিনি পর্দায় ভেসে উঠতেন, তখন মনে হতো প্রকৃতির উদ্দাম চঞ্চলতা কোনো এক মানবীর রূপ নিয়ে কথা বলছে। আবার ‘তুফান মেল যায়’ গানটি শুনলে মনে হয়, তা কেবল একটি চটুল জনপ্রিয় সুর নয়, বরং সেটি এক আধুনিক, স্বাধীন ও গতিশীল নারীর নগর—সংস্কৃতিকে জয় করার অদম্য উল্লাস। ‘কথা কইবে না বউ’ গানে নজরুলীয় যে রসাশ্রয়ী কৌতুক ও অভিনয়ের সংমিশ্রণ দেখা যায়, তা বাংলা গানের ইতিহাসে এক বিরল সম্পদ। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গানে নারী চরিত্রটি কেবল নিছক কোনো অবলা প্রেমিকা হয়ে থাকেনি; সে প্রশ্ন করেছে, হেসেছে, রাগ প্রকাশ করেছে এবং নিজের সামাজিক অস্তিত্বকে সগৌরবে ঘোষণা করেছে।
শ্রীমতী পিকচার্স ও সমাজসেবার অলকানন্দা
কানন দেবীর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে প্রজ্ঞাময় দিকটি প্রকাশ পায় তাঁর সামাজিক ও পেশাগত স্বাধীনতায়। পুরুষশাসিত স্টুডিও ব্যবস্থার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৪১ সালে তিনি নিউ থিয়েটার্সের বাঁধাধরা চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে আসেন এবং একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে নিজের শর্তে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি গড়ে তোলেন নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘শ্রীমতী পিকচার্স’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নারীকেন্দ্রিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি প্রমাণ করেন যে নারী কেবল সেলুলয়েডের পর্দায় আলো ছড়ানোর পুতুল নয়, তিনি পুরো শিল্পমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয়ারও ক্ষমতা রাখেন। ১৯৬৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে এবং ১৯৭৬ সালে লাভ করেন চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার। জীবনের শেষভাগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহিলা শিল্পী মহল’—যেখান থেকে দুস্থ ও অসহায় প্রবীণ নারীশিল্পীদের নিয়মিত আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদান করা হতো। নিজের অতীতের তিক্ত সংগ্রামকে তিনি রূপান্তর করেছিলেন অন্য নারীদের পাশে দাঁড়ানোর পরম সহানুভূতিতে।
কানন দেবীর গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গান
১। আমি বনফুল গো, ২। যদি আপনার মনে মাধুরী, ৩। তুফান মেল যায়, ৪। হারা মরু নদী, ৫। ফেলে যাবে চলে, ৬। শ্যামলের প্রেম যেন, ৭। আকাশে হেলান দিয়ে, ৮। কথা কইবে না বউ, ৯। সে নিল বিদায়, ১০। কোন প্রভাতের মনের রঙ্গে, ১১। লাগুক দোলা, ১২। যদি ভালো না লাগে, ১৩। রাই বিনোদিনী দোলে, ১৪। ওগো সুন্দর মনের গহনে, ১৫। সখী কে বলে পিরীতি ভালো, ১৬। সজল নয়ন করি পিয়া পথ, ১৭। অঙ্গনে আওয়াব যখন রসিয়া, ১৮। রতিসুখসারে গতিমভিসারে, ১৯। তোমারে হারাতে পারি না, ২০। সোনার হরিণ আয় রে আয়, ২১। রাখাল রাজারে, ২২। পায়ে চলার পথের কথা, ২৩। ঘর যে আমায় ডাক দিয়েছে, ২৪। প্রেম ভিখারি প্রেমের যোগী, ২৫। মোর মনের কথা শুনে যেও।
পরিশেষ
শিল্পের ইতিহাসে স্থান করে নেয়া আর কোনো একটি সম্পূর্ণ যুগের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মধ্যে রয়েছে প্রকাণ্ড ফারাক। কানন দেবী ছিলেন বাংলা বিনোদন জগতের সেই দ্বিতীয় ধারার প্রতিনিধি, যিনি রূপালী পর্দার ছায়া—শরীরে প্রথমবারের মতো প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সুরকে করে তুলেছিলেন নারীর আত্মপ্রকাশের এক অনমনীয় হাতিয়ার। যে সময় অন্ধকার আড়াল থেকে এসে সমাজপতিরা নারীকে শৃঙ্খলিত রাখতে চাইত, সেই সময় তিনি নিজের মেধা, অনমনীয় জেদ আর কণ্ঠের জাদুতে নির্মাণ করেছিলেন এক স্বাধীন রাজপাট। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে সত্যিকারের আলো বাইরে থেকে আসে না, তা জন্ম নেয় শত লাঞ্ছনা ও দারিদে্র্যর ভেতর থেকে গড়ে তোলা এক আত্মমর্যাদাপূর্ণ আত্মিক অনল থেকেÑযার প্রদীপ্ত শিখা বাংলা সুরের আকাশে অনন্তকাল অমলিন হয়ে জ্বলবে।
