তারেক মাসুদ স্মরণঃ ‘মাটির ময়না’র সামাজিক ইতিহাসের সন্ধানে
মাসুদ পারভেজঃ একদা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রসঙ্গক্রমে তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস নাই।’ প্রশ্ন জাগে, তবে কি সত্যি বাংলার ইতিহাস নাই, নাকি সেটা কথার কথা? একসময় যে—ইতিহাস শুধু রাজরাজড়ার কর্মকাণ্ডের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল, সময়ের পরিক্রমায় সে নিম্নবর্গকে তার ঘরে ঠাঁই দিল।
এই যে ইতিহাসচর্চার বাঁকবদল তার প্রকৃত রূপটা লক্ষ করা যায়, শিল্পসাহিত্যের দিকে নজর দিলে। অর্থাৎ সাধারণের ভাষ্য ও চরিত্র কতোটা ঐতিহাসিক হয়ে উঠেছে শিল্পসাহিত্যে—এটা চর্চার রূপটাই এক্ষেত্রে প্রামাণ্য দলিল, যার সাপেক্ষে অনুসন্ধান করা যায় সামাজিক ইতিহাস। এই সামাজিক ইতিহাসের রেপ্রিজেন্টেশন তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে অনুসন্ধান করার উদ্দেশে এই লেখা।
তারেক মাসুদের আত্মজৈবনিক লেখা ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তাঁর শৈশব কেটেছে মাদ্রাসায়। তারেককে মাদ্রাসায় পড়ানোর এই সিদ্ধান্ত ছিল একান্তই তাঁর বাবার। যদিও তাঁর পারিবারিক কাঠামো ছিল শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা। তো এই পরিবারের একজন শিশুকে কওমি মাদ্রাসায় পড়তে পাঠানোর সিদ্ধান্তটা খেয়াল করা দরকার। এ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলেন:
‘আমি জীবনে প্রায় পাঁচ—ছয়টা মাদ্রাসায় পড়েছি। এই ছোটাছুটির একটা নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। আসলে আমার বাবা তাবলিগ করতেন। এখনো করেন। যেহেতু বেশ বয়স এখন। প্রায় ৯৪ বছর বয়স। খুব একটা নিজে তাবলিগে ছোটাছুটি করতে পারেন না। কিন্তু তিনি আমাকে মাদ্রাসায় দিয়ে, কোনো একটা মাদ্রাসায় দিয়ে বিশেষ করে প্রথমে ঢাকার মাদ্রাসায়, তিনি আমার ব্যাপারে খুবই উচ্চাভিলাষী ছিলেন যে, আমি বড় আলেম হব। তো আমাকে ঢাকায় কোনো মাদ্রাসায় দিয়ে তিনি তিন চিল্লায় চলে যেতেন দেশের বাইরে। তিন চিল্লা শেষে ফিরে সরাসরি এয়ারপোর্ট থেকে তিনি মাদ্রাসায় আসতেন বা লালবাগ মাদ্রাসায় আসতেন। এসে দেখতেন, তার ছেলে ওখানে নেই। কাণ্ডটা ছিল যে, আমাদের বৃহত্তর পরিবারে আমার বাবাই শুধু নাটকীয়ভাবে আসলে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বৃহত্তর পরিবার আসলে খুবই সেক্যুলার এবং গানবাজনার এবং সংস্কৃতিমনা পরিবার। ফলে বাবার সবচেয়ে ছোট ভাই, অন্য ভাইয়েরা, আমার চাচাতো ভাইবোনেরা, তারা সব ঢাকায় থাকে। আমার বাবা যখন আমাকে দিয়ে চলে যেত। যাওয়ার প্রায় এক মাসের মধ্যেই ওরা আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসত। ফলে শেষের দিকে আমার বাবা বুঝতে পারল যে তাদের রেঞ্জের বাইরে আমাকে যেতে হবে। সেজন্য আমাকে দূরবর্তী, ধরেন যশোরের কোনো মাদ্রাসায়, ঘোপেরডাঙ্গা মাদ্রাসায়, অথবা ওই যে বললাম বোয়ালমারী বাহিরদিয়া মাদ্রাসায় যেখানে আসলে বারো মাইলের মধ্যে কোনো দোকান নেই। অর্থাৎ হেঁটে যেতে হতো। ফলে তিনি এরকম জায়গায় আমাকে রেখে আসতে শুরু করলেন, যেখানে তাঁর ভাইয়েরা আমাকে উদ্ধার করতে পারবে না। তো এই বিচিত্র কারণে আমাকে একাধিক মাদ্রাসায় পড়তে হয়েছে।’
এখানে তারেক মাসুদের বাবার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছেলে বড় আলেম হবে। তাঁর বাবার এই আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বিশেষ সময়ে যখন তিনি পাকিস্তান নামক ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের নাগরিক। ফলে তাঁর ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষায় আলেম বানানোর যে আকাঙ্ক্ষা তা শুধু ব্যক্তিক নয়, একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের বিশেষ একটি দিকও বটে। কারণ রাষ্ট্র যখন তার ধর্মভিত্তিক আইডেনটিটি গলায় ঝুঁলিয়েছে তখন তার নাগরিক সেদিকে ঝুঁকবে সেটাই স্বাভাবিক প্রবণতা। তবে এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের বিষয়টিতে আরও কিছু সংযুক্তি ঘটে। যেমন তারা নিজের কৃতকর্মের পাপবোধ থেকে মুক্তির আশায় সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়াতে পাঠায় যেন পরকালে এই সন্তানের উসিলায় তার মুক্তি ঘটে। আর বাঙালি মুসলমানের দরিদ্র কৃষকসত্তা সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায় কারণ যেহেতু সে ইহকালে অভাব অনটনে থাকে তাই সে যেন পরকালে এই আলেমের বাপ হিসেবে আরাম আয়েশে ভরা মর্যাদাপূর্ণ স্থান পায়।
বাঙালি মুসলমানের এই আকাঙ্ক্ষা ঐতিহাসিক এবং একই সঙ্গে অবদমনের ফলও বটে। এখানে ব্যক্তি তার সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পাপ—পুণ্য থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় একধরনের কাঠামো তৈরি করেছে। ফলে এই কাঠামো যেন ভেঙ্গে না পড়ে তাই সে কঠোর মনোভাব নিয়ে থাকে। তারেক মাসুদের পিতার ক্ষেত্রেও তেমনটি লক্ষ করা যায়। তো এই ব্যক্তি কিন্তু তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে এবং সামজিকভাবে পরাভব মানতে চায় না। ফলে সন্তানের মাদ্রাসা পরিবর্তন করে দূরবর্তী স্থানে প্রেরণের মতো ঘটনাও ঘটে। সন্তানকে কওমি মাদ্রাসায় পড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত যেমন কাজ করে, তেমনিভাবে রাষ্ট্র তার জাতীয়তাবাদী আইডেনটিটি দ্বারা এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে সামগ্রিক হওয়ার দিকে পুশ করে। তো এমন যদি হয়, তবে সংকটটা কোথায়?
আমার তখন বয়স খুব অল্প। আমার বোনের বয়সও অল্প। আমার মা পুরো বাড়িতে একা। পুরো একটা বিরান বাড়ি। আমার বাবা যে হারিয়ে গেলেন জানাজার পরে, ৯ মাস পরে ফিরে এসেছেন। কেউ জানত না কোথায় গেছেন, কী ঘটেছে? ৯ মাস পরে দাড়ি বানিয়ে, আলখাল্লা পরে ফেরত আসছেন। পুরো তবলিগ, পুরো চেঞ্জ।
ব্যক্তি যখন তার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মদদ পায় তখন সে তার সিদ্ধান্তের বাইরে থাকা জনসাধারণকে খুব সহজে ‘অপর’ বানায়। আর তখনই প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে ধর্মীয় আইডেনটিটির প্রসঙ্গ দ্বারা অপরকে ঘায়েল করা, নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো কাজ করে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে সংখ্যার বিচার অর্থাৎ পার্সেন্টেজ অর্থাৎ সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর আইডেনটিটি। তো তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে এই প্রসঙ্গগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। আনুর পিতা মানে কাজী সাহেব চরিত্রটি বাঙালি মুসলমান সমাজ থেকে গ্রহণ করা সেই চরিত্র—যে পুত্রকে মাদ্রাসায় পড়ায়, নিজে হোমিও ডাক্তারি করে, মৃত্যুযাত্রী অসুস্থ কন্যাকে এলোপ্যাথি ঔষুধ দিয়ে চিকিৎসা করাতে আপত্তি জানায়, স্ত্রীকে ঘরে পর্দাবৃত করে রাখে আর পাকিস্তানকে ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে ধারণ করে এবং এর খণ্ডিত হওয়ার প্রক্রিয়াতে দুঃখ পায়।
বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাসে তারেক মাসুদ সৃষ্ট এই চরিত্রের ভিত্তি কোথায়? ইংরেজ উপনিবেশে পূর্ব বাংলার মুসলমান সমাজে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটে নাই। মূলত তারা ইংরেজিকে ইহুদি নাসারার শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার দুটি ধারার প্রচলন লক্ষ করা যায়, যেমন আলিগড়পন্থি ধারা ও দেওবন্দপন্থি ধারা। আলিগড়পন্থিরা ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন ও বিকাশের সঙ্গে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পৃক্ত করে আর অপরদিকে দেওবন্দপন্থিরা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষায় যুক্ত থাকে এবং আলিগড়পন্থিদের থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়। তাদের মতে, ইংরেজি শিক্ষা হলো মুসলমানের ইমান নষ্ট করার জন্য ইহুদি নাসারার ষড়যন্ত্র। সামাজিকভাবে তারা এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে থাকে। ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে আনুর পিতা মানে কাজী মাজহারুল ইসলাম চরিত্রটি এই দেওবন্দপন্থি। ফলে তার অনুশাসনও সেই প্রক্রিয়ায় চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায়।
তারেক মাসুদ ‘মাটির ময়না’র কাহিনিতে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তকে যে সময়ে যুক্ত করেছেন, সেই সময়টা খেয়াল করা দরকার। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি সময় তিনি বাছাই করেছেন। তো সময়ের ইতিহাসটা বাঙালি মুসলমানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র থেকে বের হওয়ার জন্য যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার সেরকম ব্যক্তিত্ব তার ছিল কিনা? সেক্ষেত্রে কাজী মাজহারুল চরিত্রটির মনোভাব বোঝা দরকার। আর এই চরিত্রটিকে বোঝার জন্য তারেক মাসুদের পিতাকে আবারও স্মরণ করা দরকার। তাঁর পিতার পরিবর্তন সম্পর্কে তারেক বলেন:
‘যখন আমার নানী হঠাৎ করে মারা যান, মারা যাওয়ার পরে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমার বাবা অ্যাডাল্ট বয়সে দেখা দেয়। সেটা হলো তাঁর জানাজায় এবং জানাজার পরেই তাঁকে আর খুঁজে পাওয় যায় না। আমার তখন বয়স খুব অল্প। আমার বোনের বয়সও অল্প। আমার মা পুরো বাড়িতে একা। পুরো একটা বিরান বাড়ি। আমার বাবা যে হারিয়ে গেলেন জানাজার পরে, ৯ মাস পরে ফিরে এসেছেন। কেউ জানত না কোথায় গেছেন, কী ঘটেছে? ৯ মাস পরে দাড়ি বানিয়ে, আলখাল্লা পরে ফেরত আসছেন। পুরো তবলিগ, পুরো চেঞ্জ। প্রথম এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে আমার মার ওপরে। পর্দা। ঘরের মধ্যে পর্দা রেখে। মাটির ময়নায় সামান্য রেফারেন্স আছে কিন্তু এই ব্যাক স্টোরিটার। আমার মা আমার বাবার কাজিন, তার নেফিউজ, অর্থাৎ, আমার চাচাতো ভাইদের সঙ্গে খেলত, কারণ আমার মায়ের সঙ্গে আমার বাবার বয়সের পার্থক্য ছিল অনেক। চৌদ্দ বছর বয়সে আমার মায়ের বিয়ে হয়েছে। আর বেনুরাও তখন মায়ের বয়সী। এদের সঙ্গেই মা খেলত। সেই খেলাও বন্ধ। বাবার নিকট—আত্মীয়ের সঙ্গে খেলতে পারছে না। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, আমার ওপরে নিরীক্ষা হলো। আমাকে মাদ্রাসায় দেওয়া হলো। এই প্রক্রিয়ায় মধ্যে কিন্তু আমার বাবা পড়েছেন। যেটা মাটির ময়নায় দেখা যায়। এবং যেটা ইন্টারেস্টিং আমার বাবা সম্পর্কে এটাই বলা যে, তার একটা তৃতীয় পরিবর্তন হয়েছে। একটা তো ছিল গোঁড়া মার্কসবাদী, নাস্তিক, গানবাজনায়, সংস্কৃতিতে, একদম নিবেদিত। এটা হলো থিসিস, তারপরে এর এন্টি থিসিস হচ্ছে, গোঁড়া ধার্মিক একটা মানুষ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের মধ্য দিয়ে মাটির ময়নায় যার ইঙ্গিত আছে। সেই জন্য ভেতরটা তছনছ, তার বিশ্বাসের জায়গাটা ভেঙেচুরে গেছে। জোর করে আসলে চাপিয়ে দেওয়া—রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও না, ব্যক্তি পর্যায়েও না, এতে কোনো লাভ হয় না। সেটা হয়তো ভেতরে ভেতরে, মরমে মরমে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ওই যুদ্ধের পর থেকেই কিন্তু আমার বাবা অনেক, যেটাকে বলে সিনথেটিক, অনেক মডারেট। তিনি ধর্মকর্ম করেন কিন্তু কাউকেই কিছু বলেন না। আমার মাকেও বলেন না, আমাকেও না। বরঞ্চ আমি কিন্তু মাদ্রাসা থেকে সাধারণ শিক্ষায় নিজের উদ্যোগে বিপ্লবী হয়ে, বিদ্রোহ করে আসিনি। আনু যেমন কোনো বিদ্রোহ করে না, নির্বিকার। ওকে যা বলে, তাই করে। আমিও তাই ছিলাম। যুদ্ধের পরে আমার বাবাই বলেছে, তুমি মাদ্রাসায় যাবে না। তুমি প্রাইভেট পরীক্ষা দেবে ম্যাট্রিকে। ওভাবেই আমি তিয়াত্তর সালে পরীক্ষা দিয়ে সাধারণ শিক্ষায় যাত্রা শুরু করি। আমার চাচারা, আমার চাচাতো ভাইবোনেরা আমাকে লুফে নিয়েছে এবং তাদেরই কল্যাণে আমি পরবর্তী সময়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছি।’
তারেক মাসুদ কিন্তু তাঁর পিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বারবার মাটির ময়নাকে সংযুক্ত করেছেন। ‘মাটির ময়না’ তো আদতে একটা ভিডিও ফিকশন। কিন্তু এর কাহিনি কিংবা ব্যাকস্টোরি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এই বাঙালি মুসলমানের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন চিত্র। তো তারেক মাসুদের পিতার যে বিবর্তন লক্ষ করা যায়, তার অন্যতম কারণ হলো রাষ্ট্রীয় আউডেনটিটির পট পরিবর্তনের ফল। যে মুসলিম জাতীয়তাবাদী ধারণাকে কেন্দ্র করে তার চিন্তার জগতে নববিকাশ ঘটে সেটার পরিবর্তন হয় মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি মুসলমান দ্বারা বাঙালি মুসলমানকে গণহত্যার দৃশ্য দ্বারা। ফলে তার জাতীয়তাবাদী আত্মপরিচয়ের জগতে বিশাল ধাক্কা লাগে। ওই মুহূর্তে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গ্রহণ না করে তার কি কোনও উপায় ছিল? চলচ্চিত্রে কাজী মাজহারুল চরিত্রটির পাকিস্তানকেন্দ্রিক মুসলিম জাতীয়তাবাদী বিশ্বাসের জগতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এসে তার পুরাতন চেতনাকে সংকটে ফেলেছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপরে আস্থা ও বিশ্বাস রাখা কাজী মানুষ হত্যা, নারী নির্যাতন ও বাড়িঘর পোড়ানোর মতো বিষয় সম্পর্কে বলে—‘শোনা কথায় বিশ্বাস করবা না। ওরা আসছে ইসলাম রক্ষা করতে, শান্তি রক্ষা করতে তো ওরা মানুষ মারবে ক্যান? মুসলমান মুসলমানকে মারবে ক্যান?’ পাকিস্তান আর্মি কাজীর বাড়ি পুড়িয়ে দিলে তাদের প্রতি তার বিশ্বাসও উবে যায়। ফলে সে আত্মপরিচেয়র সংকটে পড়ে। এই সংকট থেকে উত্তরণের একটাই উপায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গ্রহণ করা।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে ব্যক্তির এই নতুন আত্মপরিচয়কে গ্রহণের সংকটের বিষয়টি কিন্তু জটিল। যদি চলচ্চিত্রে কাজী মাজহারুলের বাড়ি না পুড়তো তবে তার মনোভাবের কি পরিবর্তন হতো? কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়ে এই ঘরানার ব্যক্তির উত্থান লক্ষ করা যায়, যারা পাকিস্তানের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের আদলে বাংলাদেশে তার আইডেনটিটি নির্ধারণ করতে চায়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
সব মাধ্যমেই অভিনয় করে যেতে চাইঃ সাবিলা নূর
অভিনয়ের প্রতিটি ধাপেই নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন অভিনেত্রী সাবিলা নূর। নাটক দিয়ে যাত্রা শুরু করে ওটিটি হয়ে বড়পর্দায় পা রেখেছেন তিনি। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’—এর পর তাকে সর্বশেষ দেখা গেছে ‘রকস্টার’ সিনেমায়। এবার ওটিটিতে ফিরছেন সাবিলা, তবে একেবারেই ভিন্ন ধরনের চরিত্র ও গল্প নিয়ে।
আলফা—আই ও চরকির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে কমেডি ঘরানার ফ্ল্যাশ ফিকশন ‘ফাইসা গেছি’। মাহমুদুর রহমান হিমি পরিচালিত এই কনটেন্টে একজন রাইডশেয়ার চালকের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা বিচিত্র ঘটনাকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে গল্প। হাস্যরসের আবহ থাকলেও উঠে এসেছে সুযোগ, লোভ ও অপরাধ বোধের মতো বিষয়ও। সাবিলা নূরের সঙ্গে এতে অভিনয় করেছেন দিব্য জ্যোতি, আরফান মৃধা শিবলু ও করভী মিজান।
নতুন এ কাজ নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত সাবিলা। নিজের চরিত্র ও গল্পের বৈচিত্র্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় চেষ্টা করি এক কাজের সঙ্গে আরেক কাজের যেন মিল না থাকে। বনলতা এক্সপ্রেস ও রকস্টার—এর পর “ফাইসা গেছি” আমার জন্য একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কমেডি ঘরানার গল্পে কাজ করতে দারুণ লেগেছে। আশা করি, দর্শকও কাজটি উপভোগ করবেন।’
নাটক থেকেই তার অভিনয়জীবনের শুরু। সেই শিকড়ের কথা উল্লেখ করে সাবিলা বলেন, ‘আমি নাটক থেকে উঠে এসেছি। এটাই আমার শিকড়। এরপর ওটিটিতে বেশকিছু কাজ করেছি। সেগুলো দর্শক ভালোভাবে নিয়েছেন। তারপর সিনেমায় এসেছি। এখানেও দর্শক আমাকে দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন। নাটক, ওটিটি ও সিনেমা—এ তিন প্লাটফর্মের প্রস্তুতি তিন রকম। সিনেমার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে হয়। তাই সবসময় নাটক বা ওটিটিতে কাজ করা সম্ভব হয় না। আমার মূল পরিচয় একজন অভিনয়শিল্পী। তাই সব মাধ্যমেই অভিনয় করে যেতে চাই।’
এদিকে নতুন একটি সিনেমাকে ঘিরেও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন সাবিলা নূর। সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, শাকিব খান ও নির্মাতা মেহেদী হাসান হৃদয়ের নতুন অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় নায়িকা হিসেবে থাকছেন তিনি। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন সিনেমাটির প্রযোজক শাহরীন আক্তার সুমি। তার ভাষ্য, নতুন এ প্রকল্পে সাবিলা নূরকে নেয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। চিত্রনাট্য চূড়ান্ত হওয়ার পর গল্পের সঙ্গে মানানসই শিল্পীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
