ইতিহাসের বঙ্গবন্ধু || আশরাফ আহমেদ মেরিল্যান্ড
ইউনুসের ১৮ মাসের অপশাসনের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় আশা করা গিয়েছিল কিছুটা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের দোষত্রুটির সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু সে লক্ষণ আর দেখা যাচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে নতুন সরকারকে ইউনুস সরকারেরই প্রতিভূ মনে হচ্ছে। এখনও মব সন্ত্রাস পুরোদমে চলছে এবং সংবিধান লংঘন করে জাতির পিতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। ১৫ আগস্টকে সামনে রেখে এখানে আমরা শুধু জাতির পিতার কথাই আলোচনা করতে পারি। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতাবিরোধী যে—অপশক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করেছিল, প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর ২০২৪ সাল থেকে তাদেরই অনুসারীরা আবার বাংলার মাটি থেকে তাঁর স্মৃতি মুছে ফেলায় যে তৎপর হয়েছিল এখনও তা বহাল রয়েছে।
সেই সুযোগে আপাতদৃষ্টিতে কিছু কিছু ‘নিরপেক্ষ’, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলকে ইউনুসের ১৮ মাসের বিভীষিকাময় ‘মাৎসান্যায়’ শাসনের সাথে তুলনা করার অপচেষ্টায় মেতেছে। তাঁরা সেই সময়কার বাস্তবতার কথা বেমালুম ভুলে অথবা পাশ কাটিয়ে বঙ্গবন্ধু শাসনামলের ত্রুটিগুলোকেই অতিরঞ্জিত করে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আজকের লেখাটি তাই সেই সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধুর সফলতাকে ঘিরে।
‘বাংলাদেশ’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ও ‘স্বাধীনতা’ এই তিনটি শব্দের ব্যাবহারিক অর্থ অভিন্ন। একাত্তরের আগে ও পরে একটি ছাড়া অপরটির অস্তিত্বও অকল্পনীয় ছিল। আমার আলোচনায় তাই এই তিনটি শব্দ একই অর্থে অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে।
যুদ্ধশেষে একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে স্বাধীনতা লাভের সময় বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণভাবে অচল, সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ছিল শূন্য, ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীসহ পুরো দেশটিই ছিল লন্ডভন্ড, সরকারী—বেসরকারী অবকাঠামো পর্যুদস্ত, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদনহীন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ছিল অসংগঠিত।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ বইতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এ সম্পর্কে কি লিখেছেন আমরা তা দেখতে পারি। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রথম রাজনৈতিক দলের একজন আহবায়কই শুধু ছিলেন না জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার মন্ত্রীসভারও সদস্য ছিলেন। সে সময়কার দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির কথা বইয়ের ২১১ পৃষ্ঠায় তিনি লেখেন, ’চরম দারিদ্রপূর্ণ এক অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৬৮ সালের বন্যার ফলে ১৯৬৯ সাল এবং ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে কৃষিতে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। ..আবার ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের ঘুর্ণিঝড়ে ১১০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ ও অসংখ্য গবাদি পশু বিনষ্ট হয়। এরপর আসে ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপি যুদ্ধ। এতে অসংখ্য প্রাণহানির পাশাপাশি রেলপথ, সেতু, সড়ক, টেলিযোগাযোগ, মিল ও ফ্যাক্টরি তথা দেশের গোটা অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকার এমন কি জাহাজ ও উড়োজাহাজগুলোও রেখে যায়নি, যা নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশের কিছুটা হলেও কাজে লাগতো। ..১৯৭২ সালে ধান উৎপাদন ছিল ১৯৬৯—৭০ সালের তুলনায় ১৫% কম। শিল্পোৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল ৩০%...।
১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে মওদুদ আহমেদ তাঁর বইয়ের ১৭৮ পৃষ্ঠায় লেখেন, এটা সত্য যে ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৪ সাল অবধি বাংলাদেশের বুকে একের পর এক বন্যা, ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রলয়লীলা সংগঠিত হচ্ছিল। এ ছাড়া নয় মাসব্যাপি সশস্ত্র যুদ্ধ, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবস্থা, সারা বিশ্বে খাদ্য সংকট, ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি, চাউলের আমদানী ব্যয় বৃদ্ধি এগুলো সবই ছিল দুর্ভিক্ষের একটি কারণ।’
স্বাধীনতার পর থেকে সমস্যা হিসাবে এর সাথে যোগ হয়েছিল লুকিয়ে থাকা অস্ত্রধারী আলবদর—রাজাকার ও স্বাধীনতার শত্রুদের উপস্থিতি, এবং লক্ষাধিক ভারতীয় সহায়ক সৈন্যের উপস্থিতি। পরাজয়ের মুখে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরের জলসীমায় পাকিস্তানিরা অসংখ্য মাইন পুতে রেখেছিল। ফলে বিদেশ থেকে খাদ্য ও পণ্য সাহায্যবাহী জাহাজ আসতে পারছিল না।
কিন্তু পাকিস্তানের কারামুক্ত হয়ে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেই অনেকটা অবিশ্বাস্য রকমের স্বল্পতম সময়ের মাঝে বঙ্গবন্ধু পাহাড়সম এইসব সমস্যার সমাধান করলেন। তার সমস্যা ও সাফল্যের বিস্তারিত বিবরণ দিতে গেলে এই লেখা কোনোদিনই ফুরোবে না। তাই স্বাধীনতার গুটিকয় প্রাপ্তি ও অর্জন মাত্র তুলে ধরছি।
একাত্তরের যুদ্ধের সময়ে ও পরে দেশি—বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল ভারতীয় বাহিনী কখনোই বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে না, স্বাধীনতা লাভ করলেও দারিদে্র্য জর্জরিত দেশটির হবে স্বল্পায়ু, এবং বাংলাদেশ অচিরেই ভারতের একটি করদ রাজ্য হয়ে বেঁচে থাকবে। সেইসব অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণ করে বিজয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় বঙ্গবন্ধু লক্ষাধিক ভারতীয় সৈন্যকে শুধু ফেরতই পাঠালেন না, দেশটিকে সসম্মানে বেঁচে থাকার ভবিষ্যতও নিশ্চিন্ত করলেন।
পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান রচিত ও গৃহীত হয়েছিল স্বাধীনতার নয় বছর পর, যা কখনোই কার্যে রূপান্তরিত হতে পারেনি। ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল স্বাধীনতার আড়াই বছর পর। গণচীনেরটি প্রণীত ও গৃহীত হয়েছিল তিন বছর পর। সেই তুলনায় আইন মান্য করে দেশ শাসন করতে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত ও গৃহীত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতার মাত্র এগারো মাস পর। এটি আমাদের অনন্য সাধারণ একটি উদাহরণ ও প্রাপ্তি! সম্ভব হয়েছিল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বঙ্গবন্ধুর একাগ্রতার জন্য।
পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা অবাঙালিদের ফিরিয়ে নিতে পাকিস্তান অস্বীকার করল। অপর দিকে স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় পাকিস্তানে আটকে পড়া এক লক্ষ ষাট হাজার (সংখ্যাটি ১.৬ থেকে ৫ লক্ষ বলে বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করেছে) সামরিক ও বেসামরিক বাঙালি চাকুরিজীবী ও পরিবারের সদস্যকে দেশে ফিরিয়ে আনলেন। শুধু তাই নয় যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি কাঁধে নিয়েও তিনি এদের সবাইকে উপযুক্ত চাকুরিতে নিয়োগ—বহাল করলেন।
নিচের উদ্ধৃতিটি আমি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদের ভূমিকাসহ মোঃ হাবিবুর রহমান খান রচিত এবং ১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও শেখ মুজিব’ গ্রন্থের ১৭৪ পৃষ্ঠা থেকে নিয়েছি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে জিয়াউর রহমান এবং বিনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র শিক্ষকতার প্রতি অবিচল থাকার কারণে অধ্যাপক এমাজউদ্দিন তৎকালীন বাস্তবতা ও সত্যকে উপেক্ষা করতে পারেননি।
‘১৯৭২—৭৩ সালের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ৬৫ লক্ষ ঘরবাড়ি অল্প সময়েই পুনর্নির্মিত হল। মেরামত করা হল ৩০০ ভাঙা ব্রীজ। পরিষ্কার করা হলো বন্দর। রেল চালু হল। বিমান উড়ল। বাস, ট্রাক, ট্যাকসি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানী শুরু হল। উৎপাদনের স্বার্থে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুব করা হলো। সংগে সংগে পাকিস্তানি আমলের বকেয়া প্রায় ৮০ কোটি টাকা ঋণ মওকুব করা হলো। গরীব ও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে ৭২ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা সাহায্য বিতরণ করা হয়। জমির মালিকানা ১০০ বিঘায় নামিয়ে আনা হয়। উদ্বৃত্ত ও খাস জমি গরীব ও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। ক্ষেতে খামারে উৎপাদনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার পাওয়ার পাম্প, ১০ হাজার শ্যালো পাম্প এবং ৩ হাজার গভীর নলকূপ প্রদান করা হয়। কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ বিতরণের উদ্যোগ গৃহীত হয়। বিনামূল্যে কীটনাশক ঔষধ, স্বল্পমূল্যে সার, বীজ, সেচের যন্ত্রপাতি ইত্যাদি কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা হয়। জলমহল, বনমহল, ও হাট—বাজার ইত্যাদি ক্ষেত্রে শোষণমূলক যে ইজারাদারি প্রথা চালু ছিল তা বিলোপ করা হয়’।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর মাত্র তিন বছর আট মাস বেঁচেছিলেন। দেশে চলছিল যুদ্ধে পরাজিত শত্রু এবং রাতারাতি সমাজতন্ত্র কায়েমে উত্যুৎসাহী যুবকদের সম্মিলিত ধ্বংসাত্মক কাজ। এদের সামাল দিয়ে এই অল্প সময়ের মাঝে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও প্রায় নিঃস্ব, পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশটির জন্য যে কোনো বিচারে তা ছিল অসামান্য অর্জন।
বঙ্গবন্ধু জুলাইসন্ত্রাসীদের মতো হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা কোনো যুবক ছিলেন না। সমাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যৌবনের শ্রেষ্ঠ ১৩টি বছর জেলে কাটানো পরিক্রমার মাঝ দিয়ে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তাঁর মূলমন্ত্র করে নিয়েছিলেন। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালবংশ ও সেনবংশ রাজত্ব করলেও তাঁরা কতটুকু বাঙালি ছিলেন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যদিকে কয়েকজন সুলতান এই অঞ্চলে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করলেও তাঁরা মোটেও বাঙালি ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই এই বাংলার মানুষ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজেদের শাসন করা শিখল। অর্থাৎ একটি স্বাধীন জাতিসত্তা হিসাবে বিশ্ব দরবারে আবির্ভূত হলো। রাজনীতিতে তাঁর পূর্বসূরি শেরে বাংলা একে ফজলুল হক বাঙালি হয়েও স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন সম্ভ্রান্ত উর্দুভাষী অবাঙালিকে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দী বাঙালি হয়েও ছিলেন উচ্চশ্রেণির উর্দুভাষী। তাঁদের তুলনায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন একটি সাধারণ বাঙালি পরিবারের সন্তান, বিয়েও করেছিলেন অতি সাধারণ বাঙালি পরিবারেই। এইসব বিবেচনায় তিনি ছিলেন এক খাঁটি বাঙালি।
দেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধু শুধু ভালোবাসতেনই না, স্বপ্ন দেখতেন ও কাজ করতেন সবার খিদে নিবারণের, উদোম গা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে, রাতে নিরাপদ ঘুমের আশ্রয় দিতে, বাঙালিকে বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ স্থানে দাঁড় করাতে। এই বাঙালিকে দিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। আজ প্রায় এক কোটি বাঙালি বিদেশে অবস্থান করে যেভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রেখেছে এবং অনেকে উন্নত জীবন যাপন করছে, তা এই স্বাধীন দেশের সবুজ পাসপোর্টের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে। পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’কে বাস্তবে রূপ দিতে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা যখন দারিদ্র্য কমিয়ে দেশটিকে এশিয়ার ‘দ্রুত অগ্রসরমান বাঘ’ বা ঊসবৎমরহম অংরধহ ঞরমবৎ—এর খ্যাতি এনে দিয়েছিল, ঠিক তখনই চক্রান্তের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী দেশীয় ও বিদেশী জোট জনগণকে প্রতারিত করে শুধু হাসিনা সরকারের পতনই ঘটাল না, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে তৎপর হয়ে উঠল।
মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন বঙ্গবন্ধুর কিছু প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকলেও তিনি বাঙালিকে বিশ্বে একটি গৌরবময় জাতি হিসাবে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ফলে তাঁকে হত্যার প্রায় ৩০ বছর পার হয়ে গেলেও কৃতজ্ঞ বাঙালিরা তাকে ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসাবে নির্বাচন করেছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনীতির কট্টর সমালোচক ও দার্শনিক আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘..তথাপি শেখ মুজিবুর রহমান এই জাতির মহান স্থপতি এবং একজন মহান পুরুষ। সমস্ত দোষত্রুটি, রাজনৈতিক প্রমাদ এবং সীমাবদ্ধতাসহ বিচার করলেও তিনি অনন্য। শেখ মুজিবুর রহমানের তুলনা স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান’ (মোরশেদ শফিউল হাসান সম্পাদিত আহমদ ছফা নির্বাচিত প্রবন্ধ, মওলা ব্রাদার্স, ২০১৫, পৃ২৩১)।
আহমদ ছফা আরও লিখেছেন, ‘আজ থেকে অনেক অনেক দিন পরে কোনো পিতা হয়তো তাঁর শিশুপুত্রকে বলবেন, ‘জানো, খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন, .. জ্যোৎস্নারাতে রুপালি কিরণধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তাঁর ভালোবাসা। জানো খোকা তাঁর নাম? শেখ মুজিবুর রহমান‘ (প্রাগুক্ত, পৃ ২২৮)।
কোনো—কোনো সমালোচক দাবি করেন যে, জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনায় সময়ক্ষেপণ করে এবং ’৭১—এর ২৫শে মার্চ ভারতে পালিয়ে না—গিয়ে পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি কখনওই বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। কিন্তু ’৭০—এর নির্বাচনে অগ্রিম ঘোষণা দিয়ে তাঁর বিখ্যাত ৬—দফার পক্ষে যে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছিলেন এবং ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনায় ছয়দফার একটি দফাও ছাড়তে রাজি হননি, সেই সমালোচকরা এ—সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলেন না। এ সম্পর্কে প্রয়াত বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম লিখেছেন, ওঃ ধিং ড়হষু ধ ংযড়ৎঃ ংঃবঢ় ধধিু ভৎড়স পড়সঢ়ষবঃব রহফবঢ়বহফবহপব (গধশরহম ড়ভ ধ ঘধঃরড়হ ইধহমষধফবংয অহ ঊপড়হড়সরংঃ’ং ঞধষব, ঘঁৎঁষ ওংষধস, টচখ, উযধশধ, ২০০৩, ঢ়ধমব ৯৪). ৬—দফা যে কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতার নীলনকশা ছিল, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মাঝেও এ সম্পর্কে দ্বিমত বোধকরি নেই। ফলে জেনারেল আইয়ুব খান ও জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর কম চেষ্টা করেননি।
পৃথিবীতে ‘বুদ্ধিমান মানব’ বা হোমোসেপিয়েন্স প্রজাতির উদ্ভবের পর থেকেই তারা সত্যের অন্বেষণ করে চলেছে, নিজের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। আগে এই প্রবণতা সীমাবদ্ধ ছিল গুটিকয় চিন্তাশীল মানুষের মাঝে, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মাঝেÑ জিন টেকনোলজির সহায়তায় স্বল্পমূল্যে বংশ—ইতিহাস নির্ণয় করে। প্রতিবারই তারা অতীতের সন্ধান করে করে পূর্বেকার ভ্রান্ত ধারণা এবং অসত্যকে পরাজিত করেছে। সাগরের তলদেশে, পাহাড়ের গভীর নিচে, গহীন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন জঙ্গলের ভেতর থেকে সত্যকে টেনে বের করেছে। এভাবেই আমরা মিশর, গ্রিক, রোমান ও ইনকা সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন খুঁজে পেয়েছি।
আজ যে সম্রাট অশোককে ঘিরে ভারতের জাতীয় সিলমোহর, দুইশত বছর আগে সেই মহামতি অশোক ভারতবর্ষেই অপরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু আড়াই হাজার বছর আগে তিনি শুধু মহাপরাক্রমশালী সম্রাটই ছিলেন না, বিভিন্ন জনহিতকর কাজের জন্যও তাঁর খ্যাতি ছিল। পুরো এশিয়ায় তিনি বৌদ্ধধর্মকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ কলহ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্থানের সাথে সাথে পালসাম্রাজ্যের পতনের ফলে এই সম্রাট শুধু ইতিহাস থেকে নয়, মানুষের স্মৃতি থেকেও হারিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অমোঘ সত্যটি হচ্ছে ইতিহাসকে সাময়িকভাবে অস্বীকার করলেও তাকে চিরতরে চাপা দিয়ে রাখা যায় না। তাই কোনো ভারতীয় নয়, দুইশত বছর আগে ইংরেজ শাসকরা খননকাজ চালিয়ে ও প্রাচীন ব্রাহ্মলিপির পাঠোদ্ধার করে তাঁকে ইতিহাসে পুনঃস্থাপন করেছিল। সত্যকে যে চাপা দিয়ে রাখা যায় না, তার উদাহরণ দিতে গিয়েই আমি সম্রাট অশোককে টেনে এনেছি।
বাংলার স্বাধীনতাবিরোধীরা তাদের অপচেষ্টা যতই চালাক না কেন, সমসাময়িক বাস্তবতার কারণে কয়েকটি দালানকোঠা ও ভাস্কর্য ভেঙে অশোকের মতো বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। আমাদের সময়কালে সংবাদপত্র, সিনেমা এবং অতি সাম্প্রতিক ভিডিও ও তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে বঙ্গবন্ধু একটি দালান বা ভাস্কর্যের মাঝে আবদ্ধ নেই। আজ থেকে চুয়ান্ন বছর আগে বিশ্বের প্রতিটি সংবাদপত্র প্রায় প্রতিদিন তাঁকে নিয়ে সংবাদ ছেপেছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সেসব সংরক্ষণও করেছে। বর্তমান ক্রান্তিকালে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে যদি বঙ্গবন্ধুর অবদান থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখাও হয়, সুপ্ত হয়ে তিনি বেঁচে আছেন ও বেঁচে থাকবেন বিশ্বের প্রতিটি দেশে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে, অসংখ্য বৈদ্যুতিক বা ডিজিটাল বইপুস্তকে। সত্যের সন্ধানী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাই আর আড়াই হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে না। আঙ্গুলের কয়েকটি চাপেই তিনি জীবন্ত হয়ে উঠবেন ইতিহাসের পাতায়, বাংলার আকাশে, প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।
১৫ই আগস্ট, ২০২৬
