বত্রিশের উচ্চতা বাঙালির সর্বোচ্চ চূড়া || রাকীব হাসান টরন্টো
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও বত্রিশ নম্বরে আঘাত। কেউ নেই সেখানে, বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। বেঁচে থাকা দুই কন্যা কেউ থাকেনি এই বাড়িতে। তবুও আঘাতের নিশানা বদলায়নি, এই ঠিকানার মানুষ শেষ করেও শেষ হয়নি পাশবিক আকাঙ্খা, দালান ভেঙেছে, পুড়িয়েছে, মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, তবুও এই বাংলায় ওখানে এখনও শেখ মুজিবুরের শ্বাসের বাতাস নিষিদ্ধ!
এখন বত্রিশ নম্বর পোড়া একখন্ড জমি। এই জমির মাটি খুঁড়ে সমুদ্রে বিলীন করে দেয়া যেতে পারে। তারপরও এই মাটির গায়ে লেগে থাকা পাশের মাটি যদি শেখ মুজিবকে মনে রাখে পরবর্তীতে তাকেও বিলীন করে দেয়া যেতে পারে, এভাবে বত্রিশ নম্বরের চারপাশে যতো মাটি এবং বত্রিশের নিচে যতো মাটি সব বিলীন করতে করতে পুরো বাংলাদেশকে বিলীন করা যেতে পারে! তবুও পৃথিবীর ইতিহাসে লেখা থাকবে শেখ মুজিবুর বাংলাদেশ নামে একটা দেশ সৃষ্টি করেছিলেন এবং উল্লেখ থাকবে তার ভৌগোলিক অবস্থান আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
বিশ্বাস করি বাংলাদেশ বাঁচবে তার শেষ মানুষটির মৃত্যু পর্যন্ত এবং এই শেষ মানুষটি মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে একজন রাজাকার হলেও বঙ্গবন্ধুকে মনে রাখবে, কারণ সে একজন বাংলাদেশী হয়ে মরবে, মরার যন্ত্রণায় সে অনুভব করবে তার জন্ম হয়েছিলো যে বাংলায়, যে দেশটির নাম ছিলো বাংলাদেশ, তার জনক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ।
পৃথিবীতে খুব কম দেশই আছে, যে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা এবং সহযোদ্ধাদের ঘৃণা করা মানুষের রাজনৈতিক দল থাকে। সেইসব মানুষ স্বাধীনতার অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ভুল ইতিহাস সৃষ্টি করার প্রয়াস পায়। বাংলাদেশে এই ধারা বহাল, এখানে দেশের শত্রুদের স্থান করে দেয়া হয়েছে। তারা দেশের বিরুদ্ধে, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। দেশকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে একটি স্বাধীন দেশের ধর্মাচ্ছন্ন সেনাবাহিনী!
এই দেশের সাধারণ মানুষ এখনও সাম্প্রদায়িক নয়, এখানে এখনও ধর্মীয় উগ্রবাদ ঘৃণার তবুও রাজনীতির ঘৃণ্য আকাঙ্খায় এ দেশে সাম্প্রদায়িক বিষের ঢেউ ঝাপটাচ্ছে। মৌলবাদের শক্তি আমাদের গান, ভাস্কর্য, ছবি আঁকা, নাচ এবং নাটক—সিনেমা বন্ধ করে দিতে চায়!
বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির অনেক পৃথিবী বিখ্যাত গুণীজন আছেন। তাঁরা স্বমহিমায় তাঁদের কাজের জন্য পৃথিবীতে স্মরণীয়। তাঁদের কাউকে পরিবার নিয়ে একই দিনে নিজ বাসভূমে হত্যার শিকার হতে হয়নি। বঙ্গবন্ধু একমাত্র উদাহরণ এই পৃথিবীতে, যিনি একমাত্র বাঙালি, তাঁকে মরতে হয়েছে কেননা তিনি পৃথিবীর ভূগোল বদলে দিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন। এবং এখানেও তিনি ক্ষান্ত হননি, তিনি বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করতে চেয়েছেন।
বিবিসির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জরিপে শ্রেষ্ঠ আসনটি বঙ্গবন্ধু পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় হয়েছেন। একটি জাতির জন্য তার পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তি নিয়ে আসার জন্য শেখ মুজিবুর নোবেল পুরস্কার পাননি। কারণ বঙ্গবন্ধু পশ্চিমকে আঘাত করেছিলেন তাঁর শত্রুর সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে অগ্রাহ্য করে। রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র বসু, রবিশংকর কিম্বা সত্যজিতকে তাঁদের সৃষ্টির জন্য মরতে হয় না! এবং এঁরা সকলে পশ্চিম দিয়ে প্রশংসিত কিন্তু শেখ মুজিবকে সৃষ্টির জন্য মরতে হয় কেন?
বঙ্গবন্ধু সাত কোটি মানুষের জন্য একটি দেশ, এবং তার নিজস্ব সত্তায় নতুন সূর্যোদয় নিয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। বাংলাদেশ কোন প্রভুর দিক—নিশানা মানবে না, এমনকি মুক্তিযুদ্ধে যে সকল দেশ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে তাদেরও তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, বাঙালি জাতি আর কারো দাসত্ব মেনে নেবে না। কোনো বাঙালির সৃষ্টিতে পৃথিবীর কোন দেশের রাজনৈতিক আগ্রাসনের স্বপ্নে আঘাত লাগেনি যতোটা মুজিবুরের সৃষ্টিতে লেগেছে।
বাংলার নেতা কীভাবে বাঁচবেন! সাত কোটি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন না, কিন্তু স্বাধীনতার পরে তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, ‘ক্ষমা করলেই শত্রু তার বন্ধু হয়ে যায়’! বঙ্গবন্ধুর পড়াশুনার চৌহদ্দি কম ছিলো না, এই উপমহাদেশের বিখ্যাত সব নেতাদের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে বুঝেছি তিনি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং জেদী মানুষ ছিলেন । তবে এও সত্য রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবেলার বাস্তবতা বুঝতে পারতেন তিনি নিমিষেই! বাংলায় রাজনৈতিক ইতিহাসের মীরজাফর চরিত্রটি হয়তো তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, অথবা তাঁর বাংলা ভাষা—সংস্কৃতির প্রেমকেই তিনি ভাবতেন বাঙালির সকলের প্রেম।
বর্গি অথবা বখতিয়ারের বাহিনীর রক্তবীজ এখনও যে এইদেশে চাষ হয়, এই একমাত্র অজ্ঞতা বঙ্গবন্ধুর সম্ভবত ছিলো!
১৯৭৫ সালে যে বাড়ির সকলকে হত্যা করা হয়েছে, সেই বাড়িটি ৩৯ বছর পরে কেন পুড়িয়ে দেয়া হলো? কেন একখন্ড জমির উপরে এমন আগ্রাসী আক্রোশ? এখানেই বাঙালি জাতির পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারা এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, কারা বাংলাদেশ চায়নি? শেখ মুজিব দীর্ঘ জীবন ধরে রাজনীতিতে গড়ে ওঠা উপমহাদেশের অন্যতম নেতা। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার উত্তরণ দেখা যায় তাঁর মৃত্যু অবধি। তিনি যখন মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলার জনগণ তাঁর মুখ মুখস্থ করে নেয়। তারপর ১৯৫২, ছয় দফা, ১৯৬৯, ১৯৭১ এই প্রতিটি জয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের মুখের আয়নায় বাংলার মানুষ নিজের মুখ দেখেছে। এইসব আন্দোলনে বাংলাদেশ কখনো পরাজিত হয়নি। বাংলার এতোসব জয়ে পরাজয় মানবে কেন সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান? এই পরাজয়ের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে শুধু পাকিস্তান নয় প্রতিশোধের বারুদ নিয়ে অপেক্ষায় ছিল আরো দেশ। আর এটাই ছিলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কারণ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একদিনে সৃষ্টি হয়নি, স্বাধীনতার স্বপ্নও মানুষের শেষ হয় না। বঙ্গবন্ধু যে মানুষের হৃদয়ে ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্রও ধর্মনিরপেক্ষতা—র বীজ রেখে গেছেন সেই জাতিকে অন্ধকারে নিয়ে যাওয়া যাবে না। শেখ মুজিবের শক্তি শুধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সীমাবদ্ধ ছিলো না, বাংলার শিল্প—সাহিত্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক বাঙালির জীবনে একাত্ম হয়ে আছে, বাংলাদেশে শহীদ মিনার ভাঙা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা যাবে, কিন্তু বাঙালির হৃদয়ের বাংলাদেশ ভাঙা যাবে না! যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিলো বত্রিশের মাটির শেখ মুজিবের বুক থেকে বাংলার মানুষের বুকে, এই বাড়ি থেকে যে মুজিব জয় বাংলা স্লোগানে বাঙালির বুক কাঁপিয়েছে, এই বাড়ি বাঙালির, বত্রিশের মৃত্যু হয় না, পোড়া মাটি তবুও চিৎকার করে বাংলাদেশ, বত্রিশের মৃত্যু হয় না, জয় বাংলা স্লোগানের ঢেউ আছে এই বাড়িতে। এখানে দালান লাগে না, বত্রিশের উচ্চতা বাঙালির সর্বোচ্চ চূড়া।
