উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—৮ || ড. আনিস রহমান পেনসিলভেনিয়া
স্মার্ট কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ও কৃষি বিপ্লব
কার্বন সঞ্চয় ও কৃষি পদ্ধতির অর্থনৈতিক প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং টেকসই কৃষিতে বিভিন্ন চাষাবাদ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে প্রধান চারটি কৃষি পদ্ধতির কার্বন সঞ্চয় ক্ষমতা, সম্ভাব্য আয় এবং সুবিধার বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. নো—টিল ফার্মিং (ঘড়—ঞরষষ ঋধৎসরহম): মাটি চাষ না করে সরাসরি বীজ বপনের এই পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে বছরে প্রায় ০.৫ থেকে ১.৫ টন কার্বন সঞ্চয় করা সম্ভব। অর্থনৈতিকভাবে এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে হেক্টর প্রতি বছরে ১০ থেকে ৩০ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। এই পদ্ধতির প্রধান বিশেষত্ব হলো এটি মাটির উপরিভাগের ক্ষয় রোধ করে মাটির গঠন ঠিক রাখে।
২. এগ্রোফরেস্ট্রি (অমৎড়ভড়ৎবংঃৎু): কৃষি জমির সাথে বৃক্ষ রোপণের এই পদ্ধতিতে কার্বন সঞ্চয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, যা বছরে হেক্টর প্রতি ২.০ থেকে ৬.০ টন পর্যন্ত হতে পারে। কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে এখান থেকে বছরে ৩০ থেকে ১২০ ডলার পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। এছাড়া এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি উচ্চ জৈববৈচিত্র্য বজায় রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
৩. কভার ক্রপিং (ঈড়াবৎ ঈৎড়ঢ়ং): প্রধান ফসল কাটার পর জমি খালি না রেখে আবরণী শস্য চাষ করলে বছরে হেক্টর প্রতি ১.০ থেকে ২.০ টন কার্বন সঞ্চিত হয়। এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করলে বছরে ১৫ থেকে ৪০ ডলার পর্যন্ত বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকে। এটি মূলত মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তী ফসলের জন্য মাটিকে প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।
৪. ঘূর্ণায়মান চারণ (জড়ঃধঃরড়হধষ এৎধুরহম): গবাদি পশুকে পর্যায়ক্রমে নির্দিষ্ট এলাকায় চারণ করার মাধ্যমে বছরে হেক্টর প্রতি ১.০ থেকে ৩.০ টন কার্বন সঞ্চয় করা যায়। এর মাধ্যমে বছরে ১৫ থেকে ৬০ ডলার পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। এই পদ্ধতির একটি বড় সুবিধা হলো এটি চারণভূমির ঘাস এবং মাটির গুণমান ঠিক রাখার পাশাপাশি গবাদি পশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।
এআই এবং সার্কুলার ইঞ্জিনিয়ারিং (ঈঊহম)
এআই এখানে ‘অভিযোজিত মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করে যা সার্কুলার ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেমগুলোকে বাজার পরিস্থিতি এবং কাঁচামালের ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করে। হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং ব্যবহার করে একটি ফল প্রক্রিয়াকরণ কারখানা তাদের আগত শস্যগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করতে পারে—যেমন তাজা পণ্য হিসেবে বাজারে পাঠানো, জুস তৈরি করা, বা অবশিষ্টাংশ থেকে বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ ও প্রোটিন সংগ্রহ করা। এই প্রক্রিয়ায় সুপারক্রিটিকাল ফ্লুইড এক্সট্রাকশন এবং মাইক্রোওয়েভ—অ্যাসিস্টেড এক্সট্রাকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে মূল্যবান রাসায়নিক আহরণ করা হয়, যা কৃষকদের জন্য বাড়তি রাজস্ব তৈরি করে। অ্যাডভান্সড বায়োরিফাইনারি কনসেপ্টের মাধ্যমে একই অবশিষ্টাংশ থেকে ক্রমান্বয়ে পেকটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং পরিশেষে বায়োগ্যাস তৈরি করা সম্ভব, যা বর্জ্যকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে।
সুদূরপ্রসারী উদ্ভাবন: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও অ্যামোনিয়া উৎপাদন
ভবিষ্যতের কৃষিতে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক ব্রেকথ্রু হতে পারে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং—এর মাধ্যমে সার উৎপাদনের আমূল পরিবর্তন। বর্তমান বিশ্বের মোট উৎপাদিত সারের মূল ভিত্তি হলো অ্যামোনিয়া, যার উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত শক্তি—নিবিড় এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
হেবার—বশ প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ও কোয়ান্টাম সমাধান
বর্তমানে ‘হেবার—বশ’ (বা ‘হ্যাবার—বশ’) (ঐধনবৎ—ইড়ংপয) প্রক্রিয়ায় অ্যামোনিয়া উৎপাদনে বিশাল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি এবং উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের প্রয়োজন হয়, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ২ শতাংশ এবং কৃষিখাতের মোট শক্তি ব্যবহারের এক—তৃতীয়াংশ ব্যয় করে। আইবিএম (ওইগ) এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ঈধষঃবপয) বর্তমানে কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম তৈরি করছে যা নতুন বায়ো—ইলেক্ট্রোক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক খুঁজে পেতে ১০০০ গুণ দ্রুত কাজ করতে পারে। এর লক্ষ্য হলো স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও চাপে বায়োলজিক্যাল পদ্ধতিতে নাইট্রোজেন ফিক্সেশন করা, যা সারের উৎপাদন খরচ এবং কার্বন নিঃসরণ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে। ২০৩০ সালের মধ্যে কোয়ান্টাম সিমুলেশনের মাধ্যমে ঋবগড়পড়—এর মতো জটিল অণুর আচরণ বুঝে ফেলে সারের এক নতুন বিপ্লব শুরু হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। এটি সফল হলে খামারে বসেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে সার উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাবে।
ডিজিটাল টুইন ও এগ্রো—ইকোসিস্টেম সিমুলেশন
‘ডিজিটাল টুইন’ (উরমরঃধষ ঞরিহ) হলো একটি ভৌত খামারের একটি নিখুঁত ভার্চুয়াল প্রতিরূপ, যা রিয়েল—টাইম ডেটা ব্যবহার করে খামারের পারফরম্যান্স মডেল করে। এটি কৃষকদের জন্য একটি ‘ভার্চুয়াল ল্যাবরেটরি’ হিসেবে কাজ করে যেখানে তারা বাস্তব জীবনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তার ফলাফল কম্পিউটারে দেখে নিতে পারেন।
গঠন ও কার্যকারিতা
একটি কৃষি ডিজিটাল টুইন মূলত চারটি স্তরে গঠিত: ১. পারসেপশন লেয়ার: এটি খামারের সংবেদনশীল অংশ যা মাটির ঘচক লেয়ার, আর্দ্রতা, পিএইচ এবং ড্রোন ইমেজের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। ২. কমিউনিকেশন লেয়ার: ৫জি বা লোরাওয়ান (খড়জধডঅঘ) এর মাধ্যমে এই তথ্য কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে পাঠায়। ৩. মডেলিং ও সিমুলেশন লেয়ার: এখানে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলো ‘হোয়াট—ইফ’ (ডযধঃ—রভ) সিনারিও চালায়—যেমন সারের পরিমাণ ১৫ শতাংশ কমালে ফলনে কী প্রভাব পড়বে। ৪. ডিসিশন ও অ্যাকশন লেয়ার: প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় ট্রাক্টর বা সেচ ব্যবস্থাকে কমান্ড দেয়।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে খামারের উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা—উভয়ই নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি বিশেষ করে জটিল শস্য চক্র এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় কৃষকদের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
জিনোমিক সিলেকশন ও বায়ো—ফোর্টিফিকেশন
ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা কেবল পেট ভরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অংশ। ‘বায়ো—ফোর্টিফিকেশন’ বা জৈব—পুষ্টিবর্ধন হলো এআই এবং বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে শস্যের পুষ্টিগুণ বাড়ানো।
এআই—চালিত প্রজনন ব্যবস্থা
এআই এখন বিশাল জিনোমিক ডেটাসেট বিশ্লেষণ করে এমন সব জেনেটিক মার্কার শনাক্ত করতে পারে যা খরা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রোটিন বা জিংকের উপাদানের সাথে সম্পর্কিত। আইআরআরআই (ওজজও) এর ‘এঅও—ঐজচ’ প্ল্যাটফর্ম এআই ব্যবহার করে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের জাত তৈরি করছে যা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ফলন দিতে পারে। এটি প্রথাগত প্রজনন চক্রের সময় প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। এছাড়াও ‘ক্রিসপার’ (ঈজওঝচজ) জিন এডিটিং এর মাধ্যমে ধান ও গমে আয়রন এবং জিংকের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে, যা উন্নয়নশীল দেশে ‘লুকানো ক্ষুধা’ (ঐরফফবহ ঐঁহমবৎ) মেটাতে অত্যন্ত কার্যকর।
ব্লকচেইন ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা
কৃষি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায়শই অত্যন্ত জটিল এবং অস্বচ্ছ হয়, যার ফলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পান না এবং ভোক্তারা পণ্যের বিশুদ্ধতা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। ব্লকচেইন প্রযুক্তি এখানে একটি বিকেন্দ্রীভূত এবং অপরিবর্তনীয় ডিজিটাল লেজার হিসেবে কাজ করে।
