নিষিদ্ধ করলে জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়
বাংলাদেশে বৃহৎ এবং মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল হিসাবে একমাত্র আওয়ামী লীগকেই কয়েকবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পরে ১৯৫৮ সালে প্রথম সামরিক শাসন জারি হলে প্রথমবার নিষিদ্ধ করা হয়। তখন অবশ্য সব রাজনৈতিক দলকেই মার্শাল ল আদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন জেনারেল আইয়ুব খান। আইয়ুব খান ‘পলিটিক্যাল পার্টিস ইলেক্টেড বডিস ডিসকোয়ালিফাইড অর্ডিন্যান্স বা সংক্ষেপে চজঙউঙ’র আওতায় শুধু দল নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্তি দেননি, তিনি সেই সময়কালের দুই রাজনীতিককেও গ্রেফতার করেন। এরা হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর্, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতা। ৫ বছর পরে ১৯৬৩ সালে তাদের মুক্তি দেয়ার পর নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগ মাথা চাড়া দিেয়ে ওঠা শুরু করে। নিষিদ্ধ করার কারণে মুক্তি পাওয়া দল এবং নেতৃবৃন্দ আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালে দলটি স্বায়ত্বশাসনের দাবি সম্বলিত ৬ দফা দাবি উত্থাপন করে। বিবিসি বাংলা এক সংবাদে বলছে, এই ৬ দফা দাবি উত্থাপনের কারণে আওয়ামী লীগকে আইয়ুব খানের পতন অর্থাৎ ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত নানা রকম দমন পীড়নের সম্মুখীন হতে হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। পরদিন ইসলামাবাদে ফিরে গিয়ে ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিবিসি বাংলা বলছে, এই নিষিদ্ধের কারণে আওয়ামী লীগ নিঃশেষ না হয়ে আরো শক্তি সঞ্চয় করে। যার ফলশ্রম্নতিতে পাকিস্তান হারায় তাদের পূর্বাংশ। যুদ্ধে অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।
এরপর আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র বঙ্গবন্ধুকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে পাকিস্তান ফেরত কিছু সেনা কর্মকর্তা। তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয়, তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করে। সেই সাথে আবার কার্যত নিষ্ক্রিয় হয় আওয়ামী লীগ। কারণ আওয়ামী লীগের প্রায় সকল নেতা আত্মগোপনে চলে যায় গ্রেফতার ও নির্যাতনের ভয়ে। অনেকে গ্রেফতার হয়। সিনিয়র চার নেতা যারা ৯ মাসে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে, তাদের কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয়। ফলে দল নিষিদ্ধ না করলেও যে ভীতির সঞ্চার করা হয় নেতৃবৃন্দের মনে, তার কারণে কেউ প্রকাশ্যে আসতে সাহস পায় না। তাছাড়া ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে এক সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে সংসদে বাকশাল আইন প্রণীত হয় (চতুর্থ সংশোধনী)।
১৯৭৬ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ রেগুলেশন’ বা পিপিআরএর আওতায় ঘরোয়া রাজনীতি শুরুর অনুমোদন দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোতে নতুনভাবে নিবন্ধন করতে বলে। এ সময় আওয়ামী লীগ নিজের একক পরিচয়ে নিবন্ধিত হয় এবং রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও দলে নানা বিভাজন শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে থাকাকালেই দলের সভাপতি করা হয় এবং তিনি ১৯৮১ সালে ফিরে যান দেশে।
কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সাত্তারকে বন্দুকের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক শাসন জারি করেন জেনারেল এরশাদ। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হয়েই সংবিধান স্থগিত করেন এবং সকল রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেন। আওয়ামী লীগও এর অন্তভুর্ক্ত ছিল। ১৯৮৬ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এরশাদ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতন এবং ১৯৯১ সালে নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে আওয়ামী লীগের সভা—সমাবেশে বাধা প্রদানসহ তাদের নেতা—কমীর্দের গ্রেফতার ও হয়রানি শুরু হয় বলে উল্লেখ করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ।
বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা দখলের পরপরই অন্যান্য রাজনৈতিক দলসহ আওয়ামী লীগের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ কারাগারে আটক রাখা হয়। সেই সরকার এই দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার যে অপচেষ্টা চালায় তা আর গোপন থাকেনি।
২০০৮ সালের সেনা সমর্থিত সরকারের আয়োজনে যে নির্বাচন হয় সেখানে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। বাংলাদেশ সেই বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, তারা স্বাভাবিক নির্বাচনে পুনর্বার জিততে পারেনি। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তাই হয়। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে প্রচন্ড বাধা দেয়। জ্বালাও পোড়াও করে। ২০১৮ সালে রাতের অন্ধকারে ভোট বাক্স ভর্তি করা হয়। আর ২০২৪ সালে ডামি নির্বাচন হয়। কোনো কিছুই গোপন রাখতে পারেনি সরকার। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার যতই উন্নয়ন করুক দেশের মানুষ দুনীর্তির কারণে তাদের অপছন্দ করা শুরু করে। এই ক্ষোভের সুযোগ গ্রহণ করে অন্য দেশের প্রত্যক্ষ অর্থে ও সমর্থনে আন্দোলনের নামে রাস্তায় নেমে পড়লে, শেখ হাসিনার পুলিশ গুলি চালায়। ফলে বাতাস ঘুরে যায়। সাধারণ মানুষ ছদ্মবেশিদের ডাকে নেমে আসে রাস্তায়। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এ সময়ের অপেক্ষা করছিল স্বাধীনতা বিরোধীরা। তারা শুরুতেই স্বাধীনতার সব স্মারক গুঁড়িয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করে। আর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আওয়ামী সমর্থক সব প্রতিষ্ঠান, সংবাদ মাধ্যম, সংবাদ কমীর্, বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার করে।
নিয়ম হচ্ছে, কেউ বা কোনো গোষ্ঠী অন্যায় করলে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করে বিচারে দোষ প্রমাণিত হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু বিনা বিচারে শাস্তি দেয়ার অধিকার কারো নেই। অন্তত সভ্য সমাজে। ইতিহাস বলে, অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে। ইতিহাস বলে অকারণে পীড়ন করলে সে পীড়ন ফিরে আসে পীড়নদাতার ওপরেই। ইতিহাস বলে বাধা দিলে বাধবে লড়াই। আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না। তাছাড়া বিনা বিচারে কাউকে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করলে তার জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায়। মানুষের মনোস্তত্ত্বই হলো, কারো বিরুদ্ধে অনর্গল বিষোদগার করলে তার প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়ে যায়। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত সরকার তারেক রহমানকে বিনা বিচারে নির্যাতন করে, মুচলেকা নিয়ে নির্বাসনে পাঠিয়ে তাকে নিঃশেষ করতে চেয়ে শেষ পর্যন্ত নেতায় রূপান্তর ঘটিয়েছে। ইতিহাস তো এমনই সাক্ষ্য দেয়।
এ বছর বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের প্রতিবাদে এই নিউইয়র্কে যত মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে এবং যত বাংলা বর্ষবরণ হয়েছে তা অতীত ইতিহাসকে ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করতে গিয়ে গভর্নও মোনায়েম খান রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দিয়েছে দেশের আনাচে কানাচে। রবীন্দ্রনাথের গানই হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
এসব দৃষ্টান্ত আমাদের দেশেই আছে। সক্রেটিস, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও’র দিকে তাকানোর দরকার নেই।
