সাগর আমাকে ডাকে || কুলদা রায়
সমুদ্র দেখেছি বেশ বড় বেলায়। তার আগে সমুদ্র পেরিয়ে গিয়েছি আকাশ দিয়ে। তারও আগে সমুদ্র চিনেছি মাইকেলের মহাকাব্যে।
জ্যাক লন্ডনের দি সী উলফ পড়ে বাঘা লারসেনের সমুদ্রের জলদস্যুগিরি দেখেছি। দেখে গা শিউরে উঠেছে। তার কাছে মহানুভবতা বলে জীবনে কোনো শব্দ থাকতে নেই। আছে মহাশক্তিধর শব্দটি। মহাশক্তি অর্জন করে মহাদানবের মতো বাঁচতে হবে।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অলৌকিক জলযান পড়ে অর্চিকে ভালোবেসে ফেলেছি। হায় মেয়েটি, ছোট বাবুকে পাখির ছানার মতো সমুদ্রে আশ্রয় দিয়েছে। তার কাছে শক্তি নয়— কোমলতাই জীবনের মানে।
সমুদ্র মানুষ উপন্যাসটি অলৌকিক জলযানের আগের পর্ব। কিন্তু সমদ্র মানুষ অতীন লিখেছেন পরে। অলৌকিক জলযান লেখার পরে অতীনবাবুর অর্চির আগের কাহিনীটুকু বলতে ইচ্ছে করেছিল বোধ হয়। একজন বড় লেখকের হাতে একটি কাহিনীর আগে পরে বহু কাহিনী থাকে। তার শুরুও নেই— শেষও নেই। অশেষ করে লেখেন। লিখতে লিখতে বোঝেন, তিনি সারা জীবনে একটি মাত্র কাহিনীই লিখছেন। কাহিনীটি তার আগে পূর্বিসূরীরা লিখেছেন। পরে অন্যরা লিখবেন।
অমর মিত্রের ধনপতির চর উপন্যাসে পর্তুগিজ বংশোদ্ভুত পেদ্রো নামের বুড়ো মানুষটি এক টুকরো দ্বীপের উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে। তার বয়সের গাছ পাথর নেই। দ্বীপটিকে পিঠ দিয়ে জাগিয়ে রেখেছে একটি অলীক কাছিম। কাছিমটি যে কোনো সময় হুস করে সরে গেলেই দ্বীপটি জলে ডুবে যাবে। এই আশঙ্কা থেকেও চরটি ধনপতি নামে হুলস্থুলভাবে পরিচিত আছে। দ্বীপটি দখলের লড়াই করছে নানাজনে। এখানে বহুদূর থেকে বউ ছেলে মেয়েকে রেখে জেলেরা মাছ ধরতে আসে। মাছের মৌসুমে কোনো এক জেলেনীকে নিয়ে এই দ্বীপে ঘর করে। আর পেদ্রোকে মহাশক্তিধর মনে করে। তাকে বিনতি করে। এই পেদ্রোই তাদের কাছে কোনো মানুষ নয়— সেই অলীক কাছিম। আর এসব নিয়েই অসামান্য করে বর্ণিত হয়েছে এইসব লেখা।
আজ বেশ কদিন ধরে প্রতিদিনই সমুদ্রের কাছে আসছি। বড় বড় ঢেউ ছুটে আসছে। গুড়ো গুড়ো হয়ে জলগুলো তীরে আছড়ে পড়ছে। আর অসংখ্য শঙ্খচিল নিচু হয়ে উড়ছে।
একটি শিশু এই সমুদ্র তীরে আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে। মুখে কথা নেই। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তারপর সেই বালি, ঢেউয়ের গুড়ো আর শঙ্খচিলের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে আমার আঙুলগুলো ধরেছে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। ফিক করে হেসে তার মাকে বলছে, দিস ইস আ পিপল। নো ডেমোন।
