বাংলাদেশে পাঠকসত্তা কেন বাড়ে না? আহমাদ মাযহার নিউইয়র্ক
অবিকশিত মনের আমি পাঠক হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছিলাম নিজেরই জীবনাগ্রহে। আমার মনে হয়, এটাই পাঠকসত্তার মূল। জীবনতৃষ্ণাই আমাকে পাঠক করে তুলেছিল। পন্ডিত হয়ে দেশ আলোকিত করবÑএমন কোনো স্বপ্ন আমি দেখিনি। বরং পটভূমির দিকে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, বই পড়ার আগ্রহ আমার মধ্যে জন্মেছিল কৌতূহল নিবৃত্তি আর আনন্দ পাওয়ার টানে।
অনেক সময় ভেবেছিÑএই আনন্দের উৎস কোথায়? স্মৃতির ভেতর ঢুকে দেখি, দাদির কাছে গল্প শুনতে শুনতেই আমার প্রথম পাঠকসত্তার উন্মেষ। অথচ তিনি ছিলেন নিরক্ষর মানুষ। কিন্তু ‘পরস্তাব’ বলার আশ্চর্য ক্ষমতায় তিনি আত্মীয়মহলে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর গল্প বলার আকর্ষণ এতটাই ছিল যে, দূরসম্পর্কের আত্মীয়রাও তাঁকে নিয়ে যেতে চাইত বেড়াতেÑশুধু তাঁর গল্প শোনার জন্য।
পরে দেখেছি, দাদির কাছে শোনা অনেক গল্পই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন বা বন্দে আলী মিয়ার বইয়ে পরিশীলিত রূপে পাওয়া যায়। সেগুলো পরে আমার সচেতন মনকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু অনুভব করেছি দাদির গল্প বলার ভঙ্গি ছিল ভিন্ন। তিনি আমার তখনকার চারপাশের চেনা জীবন থেকে দৃষ্টান্ত আনতেন, সাধারণ ঘটনার ভেতর থেকে জাগিয়ে তুলতেন কল্পনা, ন্যায্যতার পক্ষে যুক্তি, এবং যাপিত জীবনের অসঙ্গতির প্রতি এক ধরনের সংবেদনশীলতা। ছোট ছোট ভুলের মধ্যে তিনি খুঁজে পেতেন নির্মল কৌতুক, যা মানুষকে ক্ষমাশীল হতে শেখাত। তাঁর গল্পে মমতা ছিল, ভালোবাসা ছিল, এবং সবচেয়ে বড় কথা—ছিল জীবনের প্রতি কৌতূহল জাগানোর এক সহজাত ক্ষমতা।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমার ধারণা দাঁড়ায়Ñপাঠকসত্তার সংকট মূলত জীবন—কৌতূহলের সংকট নয়; বরং সেই কৌতূহলকে টিকিয়ে রাখার কার্যকর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলনের অভাব।
জীবনের প্রতি কৌতূহল না থাকলে পাঠকসত্তা সক্রিয় হয় না। কিন্তু কৌতূহল থাকলেই যে পাঠক তৈরি হবে, তা—ও তো নয়! কারণ পাঠক হওয়া মানে তো কেবল পড়া নয়; বরং পড়তে পড়তে সজাগ মনের অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া। এই সজাগ মনই তো বিচার করতে পারে, কিংবা প্রশ্ন তুলতে পারে, এবং পারে পাঠকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে।
শিশুকাল থেকেই এই মননশীলতার অনুশীলন শুরু হওয়া প্রয়োজন। কৌতূহল জাগানো, নৈতিক প্রশ্ন তোলা, কল্পনার উন্মেষ ঘটানো, জীবনের অসঙ্গতি চিহ্নিত করাÑএসবই পাঠকসত্তা গঠনের প্রাথমিক উপাদান। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লালিত হয় না। ফলে পাঠকসত্তা থাকলেও তা বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন জাগেÑআমাদের সমাজে সজাগ পাঠকের অভাব কি লেখকের সজাগতাকেও প্রভাবিত করছে? অনেক সময় মনে হয়, আমাদের অনেক লেখকই এমন নিশ্চিন্ততায় লেখেন যেন তাঁদের লেখা বিচারের জন্য কোনো কঠোর পাঠক উপস্থিত নেই। এই পর্যবেক্ষণ সর্বজনীন দাবি নয়; বরং একটি উদ্বেগ, যা পাঠক—সংকটের সঙ্গে লেখকসত্তার সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে, আমেরিকার শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে, যেখানে চিন্তাশীলতা ছাড়া যান্ত্রিকভাবে জীবনযাপন সম্ভব হলেও, যারা গভীরতর মননচর্চা করতে চায় তাদের জন্য আলাদা পথও খোলা থাকে। এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। হাইস্কুল পর্যায় পর্যন্ত তাদের জীবনযাপনের অংশ হিসাবে কৌতূহল মোচনের উৎস হিসাবে স্কুলে ও স্থানীয় লাইব্রেরিতে বইয়ের সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয় বলে ঐ পর্যন্তই যাদের বিদ্যায়তনিক শিক্ষা গ্রহণের শেষ সীমানা তাদের উল্লখযোগ্য সংখ্যার মধ্যেও পাঠকসত্তা জাগরুক থাকে!
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একসময় গ্রামীণ সাংস্কৃতিকতার মধ্যেই একটি সম্মিলিত মননের চর্চা ছিল, যা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতাকে আংশিকভাবে পুষিয়ে দিতে পারত। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাবে সেই সাংস্কৃতিক কাঠামো আজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। অথচ নতুন মননভিত্তিক সাংস্কৃতিক বিনিয়োগে ততটা মনেযোগ দূরের কথা, ন্যূনতম মনোযোগও গড়ে ওঠেনি। ফলে আমাদের সমাজ থেকে ঐতিহ্যগত মননচর্চা হারিয়ে যাচ্ছে, পক্ষান্তরে আর নতুন করে তার বিকল্পও তৈরি হচ্ছে না।
বর্তমানে অন্তর্জালের মাধ্যমে জ্ঞানের বিস্তার সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই জ্ঞানের সঙ্গে সজাগ মননের অনুশীলন তাল মিলিয়ে বাড়েনি। আমাদের পাঠ—পরিকল্পনায় তা কিভাবে বাড়াতে পারে সে—কথা প্রায় ভাবাই হয়নি। ফলে বাস্তবে পাঠকসত্তা সংখ্যায় নয়, গুণে সংকুচিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বইমেলার বিস্তার নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ, বইমেলায় এই যে মানুষের সমাগম বাড়ছে, এমনকি বইয়ের বিক্রিও বাড়ছে তাতে কি পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে? বরং দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে বইমেলা সীমিত হয়ে উঠছে শুধুই সামাজিক মিলনমেলা হিসাবে। সেখানে বই কেনা একটি আনুষঙ্গিক ঘটনা মাত্র। ক্রমশ জনসমাগম বাড়ার ফলে বইয়ের ক্রেতা বাড়লেও সজাগ পাঠক কিন্তু এর ফলে তৈরি হচ্ছে না। পাঠক সত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে সজাগতা—বইমেলাগুলো কিন্তু ন্যূনতম মনোযোগ দিতে পারছে না তার অনুশীলনের দিকে। ফলে বইমেলায় বিনিয়োগকৃত অর্থ, শ্রম ও সময়ও পেরে উঠছে না পাঠকসত্তা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে! অথচ বইমেলা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালায় সাধারণ উৎসবমূলক সাংস্কৃতিকতা কমিয়ে যদি কিভাবে সজাগ মননের অনুকূল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রাখা সম্ভব তা নিয়ে আলোচনার ভাগ বাড়ানো যায় তাহলে বইমেলাগুলোও হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ!
সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, পাঠকসত্তার বিকাশ একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় সীমিত বিষয় নয়; এটি একটি ব্যাপক সাংস্কৃতিক ও মননিক অনুশীলন, যা পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগÑসবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে গড়ে ওঠে। সমাজ রূপান্তরের ধারায় দাদির গল্পবলা কিংবা অন্যান্য গ্রামীণ সাংস্কৃতিকতার অনুপস্থিতি জনিত বিকল্প এই ধরনের অনুশীলনের অভাবেই বাংলাদেশে পাঠকসত্তা বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
