হরমুজের প্রান্তে বেইজিংঃ কূটনীতির চোরাবালি || ড. জীবন বিশ্বাস

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর নিছক কোনো প্রথাগত কূটনৈতিক পদচারণা নয়, এক অগ্নিপরীক্ষা। বলপ্রয়োগের মদমত্ততাকে এখনো কৌশলগত শৃঙ্খলায় রূপান্তর করা সম্ভব কি না, বিশ্ব আজ সেই উত্তর খুঁজছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের রণদামামা আজ যে কেবল ধূসর মরুপ্রান্তর কিংবা পারমাণবিক চুল্লির চারপাশেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তা নয়, সংঘাতের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক আইনের জটিলতা, আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রচীন প্রতিযোগিতার এক অত্যন্ত নাজুক পরিকাঠামোয়। বেইজিংয়ের উদ্দেশে পাড়ি দেওয়ার সময় ট্রাম্প যখন উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘ইরান আমাদের নিয়ন্ত্রণে’, তখন তা ধ্রুব সত্যের চেয়ে বরং এক অনিয়ন্ত্রিত সংকটের ওপর জোরপূর্বক রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস আরোপের ব্যর্থ চেষ্টা বলে প্রতীয়মান হয়। সংবাদসংস্থা এপি ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটন যখন বেইজিংকে ব্যবহার করে তেহরানকে বশ মানাতে এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে মরিয়া, তখনো ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বিদ্যমান বৈরিতাগুলো ধামাচাপা দেওয়ার এক অদ্ভুত কসরত করে যাচ্ছেন। দুই মাসের অধিক সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধের এই রক্তক্ষয়ী প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই বেইজিং যাত্রা তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।

এখানেই এক গভীর প্যারাডক্স বা বৈপরীত্যের জন্ম হয়। ওয়াশিংটন চীনের করুণা যাচ্না করছে, অথচ মুখে আস্ফালন করছে যে তাদের কারো সহায়তার প্রয়োজন নেই। রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রকাশ, ট্রাম্প দম্ভভরে বলেছেন যে তিনি চীনের সাহায্য চান না এবং যুক্তরাষ্ট্রশান্তিপূর্ণভাবে হোক বা অন্যভাবে’—যেকোনো উপায়েই বিজয়ী হবে। অথচ রূঢ় বাস্তবতা হলো, যুদ্ধবিরতি নিয়ে কূটনীতি আজ হিমাগারে, আর ইরান তার চিরচেনা ভূরাজনৈতিক ছক অনুযায়ী ইরাক পাকিস্তানের সঙ্গে জ্বালানি সেতুবন্ধন তৈরি করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও পোক্ত করছে। ট্রাম্পের এই স্ববিরোধিতা আকস্মিক নয়, এটি ট্রাম্পীয় কূটনীতির এক মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। একদিকে একতরফা আধিপত্যের তর্জনী হেলন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর কৌশলগত নির্ভরতা। ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, আর চীনের ক্ষেত্রে তারা চাইছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেই নির্বাচিত সহযোগিতা।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী ইরানের দাবিগুলো পাহাড়প্রমাণÑ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, টুঁটি চেপে ধরা অবরোধের অবসান এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা। বিপরীতে ওয়াশিংটনের দাবি যেন এক কঠোর নিয়তিÑইরানের পারমাণবিক স্বপ্নের সমাধি এবং হরমুজের ওপর তেহরানের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান। যেন দুই মেরুর যুদ্ধ। ইরান একে দেখছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল একে চিত্রিত করছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা সামুদ্রিক চলাচলের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে। ট্র্যাজেডি হলো, এই দ্বন্দ্বে প্রতিটি পক্ষের যুক্তির ভেতরেই সত্যের কিছু কণা লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই খন্ডসত্য যখনপরম সত্যহিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়, তখনই তা বারুদ হয়ে জ্বলে ওঠে।

হরমুজ প্রণালি আজ সেই মহাজাগতিক অক্ষ, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহাপ্রলয়ে রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে এই প্রণালি দিয়ে দৈনিক গড়ে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা সমুদ্রপথে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের এক বিশাল অংশ। ফলে ইরানকে যুদ্ধে জেতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে ধূলিসাৎ করার প্রয়োজন নেই, কেবল এই জলপথের নিশ্চয়তাকে অনিশ্চয়তায় বিদ্ধ করতে পারলেই কেল্লাফতে। সেই অনিশ্চয়তার আঁচ ইতিমধেই সাধারণ মানুষের হেঁশেলে পৌঁছেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়েছে, পেন্টাগনের যুদ্ধের খেরোখাতায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের বোঝা চেপেছে, আর খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা দ্বিধাবিভক্ত। রয়টার্সইপসোসের জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকানই জানেন না কেন তাদের দেশ এই অন্তহীন যুদ্ধের গোলকধাঁধায় পা বাড়াল।

এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতেই চীনশীর্ষ বৈঠকটি হয়ে উঠেছে আশার শেষ প্রদীপ। চীন এখানে কোনো গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শক নয়। তারা ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা এবং এমন এক বিশ্বশক্তি, যার প্রভাববলয় ওয়াশিংটন শত চেষ্টাতেও উপেক্ষা করতে পারছে না। তবে বেইজিং নিজেও এক উভয়সংকটে। তারা হয়তো ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সহানুভূতিশীল, কিন্তু হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে চীনের নিজস্ব উৎপাদন প্রবৃদ্ধির চাকায় বালু পড়ে যাওয়া। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাঘচির বৈঠকে যেসমন্বিত স্থায়ী সমাধান’—এর কথা বলা হয়েছে, তাতে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল যে হরমুজ খোলার চাবিকাঠি হয়তো বেইজিংয়ের পকেটেই আছে।

বেইজিংয়ের এই খেলায় বাজি বা স্টেকের বিশালতা অনেক গভীর। প্রথমত, সংকট ব্যবস্থাপনা; শি জিনপিং কি পারবেন তেহরানকে এমন এক ফর্মুলায় আনতে, যাতে হরমুজ খুলে যায় অথচ ইরানের মানসম্মানও রক্ষা পায়? দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য। রয়টার্সের ইঙ্গিত অনুযায়ী ট্রাম্প শি আলোচনার টেবিলে কেবল ইরান নেই, সেখানে তাইওয়ান, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থেকে শুরু করেরেয়ারআর্থখনিজ পর্যন্ত সবকিছুই মজুত আছে। তৃতীয়ত, সরবরাহ শৃঙ্খলের নতুন বিন্যাস। ২০২৫ সালের বাণিজ্য ঘাটতির পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয় যে, ওয়াশিংটন চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইলেও বিশ্ববাজার তার নিজস্ব নিয়মে নতুন পথ খুঁজে নেয়। আসিয়ান অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যের এই পুনর্গঠন প্রমাণ করে যে, বিচ্ছেদ অতটা সহজ নয়।

বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সাফল্য কোনোভাবেই ইরানের অবমাননার মাধ্যমে সম্ভব নয়। সেটি হবে কেবল সাময়িক এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া এক সমাধান। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য তিনটি স্তম্ভ অপরিহার্য; () ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্বচ্ছ সীমাবদ্ধতা, () হরমুজ প্রণালিতে মুক্ত চলাচল ধাপে ধাপে পুনরুদ্ধার এবং () এমন এক কূটনৈতিক স্থাপত্য যেখানে তেহরান, ওয়াশিংটন বেইজিংÑসবাই বিজয়ের হাসি হাসতে পারে। একে আপসবাদ না বলে বরংকঠোর বাস্তববাদবলাই শ্রেয়। যুদ্ধ তখনই স্তিমিত হয়, যখন রাজনৈতিক চরিত্রগুলো শান্তির কাঠামোর মধ্যেও নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়।

আশঙ্কার কথা হলো, ট্রাম্পেরচুক্তি অথবা ধ্বংস’—এই চরমপন্থী ভাষা কূটনৈতিক উদ্ভাবনী শক্তিকে পঙ্গু করে দেয়। পেশিশক্তি আনুগত্য আদায় করতে পারে, কিন্তু তা কখনোই হৃদয়ে বৈধতা পায় না। চীন যদি আঁচ করতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি ছাড় আদায়ের পরই পুনরায় শুল্ক নিষেধাজ্ঞার পুরনো খেলায় ফিরবে, তবে তারা এই সংকটের দায়ভার কাঁধে নেবে না। এপি ভাষ্যমতে, উভয় দেশেরই নতুন কোনো শুল্কযুদ্ধ এড়ানোর বড় কারণ রয়েছে। অর্থনৈতিক ধ্বংসের এই পারস্পরিক ভীতিই হয়তো আজ শান্তির সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি।

সারকথা হলো, এই যুদ্ধ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে সামরিক বিজয়ের চেয়েব্যবস্থাগত স্থিতিশীলতাঅনেক বেশি কাম্য। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মারণাস্ত্রের জৌলুস হয়তো আকাশছোঁয়া, কিন্তু ইরানের হাতে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থানের মোক্ষম অস্ত্র এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সহনশীলতা। আর চীনের হাতে রয়েছে সেই জাদুকরী প্রভাব, যা সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও অর্জিত হয়নি। তাই বেইজিং আজ কোনো পার্শ্বচর নয়, বরং মূল মঞ্চ। এখান থেকেই ঠিক হবে যুদ্ধের এই দাবানল কি শান্ত হবে, নাকি আরও ভয়াবহ আন্তর্জাতিক রূপ নেবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বেইজিং সফর শেষ পর্যন্ত এক অমোঘ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াবেÑ মহাশক্তির কূটনীতি কি দম্ভের মোহজাল ছিন্ন করে মানুষের কল্যাণে নীতি নির্ধারণ করতে পারে? ওয়াশিংটন যদি কেবল আধিপত্যের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, তবে এই যুদ্ধবিরতির আশা অচিরেই ধূলিসাৎ হবে। আর বেইজিং যদি কেবল ধোঁয়াশা তৈরি করে, তবে হরমুজ প্রণালী হয়ে থাকবে বৈশ্বিক অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরার এক ধীরজ্বলন্ত মাইন। যদি এই দুই নেতা বুঝতে সক্ষম হন যে তেলের বাজার কিংবা পারমাণবিক ঝুঁকিকোনোটিই হুমকির ভাষায় শাসন করা যায় না, তবেই বেইজিং সম্মেলন হবে রক্তপাত থেকে আলোচনার টেবিলে ফেরার প্রথম গম্ভীর পদক্ষেপ। প্রশ্নটি এখন আর ইরানকেনিয়ন্ত্রণেরাখা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলোবিশ্বের পরাশক্তিদের মধ্যে নিজেদের দম্ভকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ন্যূনতম কান্ডজ্ঞান এখনো অবশিষ্ট আছে কি?



Related Posts