বই আমাদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু || বিশ্বাস কেতকী ফারহানা
ঠিক কবে, কখন বইয়ের প্রতি প্রথম আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করেছিলাম সে কথা মনে নেই। তবে ছোটবেলায় যে কোনো বই দেখলেই সেটা উল্টেপাল্টে দেখার এবং পড়ার জন্য প্রচন্ড আগ্রহ বোধ করতাম। চকচকে রঙিন মলাটের বই কিংবা জীর্ণ বিবর্ণ বইÑ যে কোনো বইই আমাকে আকর্ষণ করতো, ব্যতিক্রম ছিল শুধু পাঠ্যপুস্তক। রূপকথা, ভ্রমণকাহিনী, জীবনী, ছড়া—কবিতা, কার্টুনের বই, বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ, শিশু কিশোর উপন্যাস সবই ছিল ভাললাগার তালিকায়।
বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ বা পড়ার অভ্যাসটি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মা বাবার প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ দু’ভাবেই অবদান ছিল। বই পড়ার জন্য তাঁরা কখনোই সরাসরি চাপ সৃষ্টি করেননি, কিন্তু বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করতেন। মা বাবার সাথে ঢাকার নিউমার্কেটে যাওয়ার দিনগুলো ছিল অন্যরকম আনন্দের! বইয়ের দোকানে ঘোরাঘুরির সাথে সাথে দু’একটা নতুন বই পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকতো। বাবা সাথে করে ইৎরঃরংয ঈড়ঁহপরষ খরনৎধৎু, ইটঊঞ খরনৎধৎু তে নিয়ে যেতেন। ইৎরঃরংয ঈড়ঁহপরষ এর পযরষফৎবহ’ং ংবপঃরড়হ এর বই আর সার্বিক বিন্যাস চিত্তাকর্ষক ছিল। যদিও সেখানকার সব বই তখনও পড়তে বা বুঝতে পারতাম না। তবে পরিবেশটা ভাল লাগতো। জন্মদিনেও উপহার হিসেবে বেশ কিছু নতুন বই পেতাম, তবে দুর্ভাগ্যবশত পুরো বছরে মাত্র একবারই জন্মদিন আসতোÑতাই সেই দিনটির জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। বার্ষিক অথবা ষান্মাসিক পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল করতে পারলে প্রণোদনা বা পুরস্কার ছিল ‘বই’।
আমাদের সময় বাংলায় অনুদিত বিখ্যাত বিদেশী সাহিত্যিকদের গল্প, উপন্যাস এবং শিশু সাহিত্যগুলো বইবাজারে পাওয়া যেতো। ‘রুশদেশের উপকথা’, আর্কাদি গাইদারের ‘ইশকুল’, ইভান তুর্গেনিভের ‘গঁসঁ’, ‘পূর্বক্ষণ’, ভিক্টর হুগোর ‘ঞযব ঐঁহপযনধপশ ড়ভ ঘড়ঃৎব উধসব’, এবং ‘খবং গরংবৎধনষবং’, আলেকজান্ডার ডুমার ‘ঞযব ঈড়ঁহঃ ঙভ গড়হঃব ঈৎরংঃড়’, চার্লস ডিকেন্সের ‘অ ঞধষব ড়ভ ঞড়ি ঈরঃরবং’, ‘এৎরসস ইৎড়ঃযবৎং ঋধরৎু ঞধষবং’— এই বইগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং স্মরণীয়। অনেক রূপকথার গল্পের বইয়ের মধধ্যে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ অন্যতম ও সর্বকালীন। ‘দেব সাহিত্য কুটিরের’ প্রকাশিত বইগুলোর অলংকরণ আর সংকলন ছিল মনলোভা। মোহাম্মদ নাসির আলী, বন্দে আলী মিয়ার লেখা ভাল লাগতো। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন রচিত দুই খন্ডের ‘বাঙালীর হাসির গল্প’ ছিল অবিস্মরণীয়। তবে অধিকাংশ বইয়ের লেখকই ছিলেন তখন ওপার বাংলার।
শুধু কিনে আর ক’টা বই পড়া যায়? সৌভাগ্যক্রমে যেসব বাড়িতে বইয়ের সংগ্রহ সমৃদ্ধ সেরকম কয়েকটি বাড়ির সাথে আমাদের সৌহার্দ্য এবং সুসম্পর্ক ছিল। আমাদের ঠিক পাশের বাড়িতে থাকতেন কবি মহাদেব সাহা। কবিপত্নীকে ‘মাসী’ সম্বোধন করতাম, সেই সূত্রে কবি মহাদেব সাহাকে বলতাম ‘মেসো’। তাঁদের স্নেহধন্য হওয়ার সুবাদেও বাড়ির বইয়ের আলমারিতে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম। আরো কিছু বাড়ি ছিল যেখানে বইপত্রের সংগ্রহ ভাল ছিল। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু রুচিরার বাড়িটি ছিল এরকম বাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম। রুচিরার বাবা প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান। সে বাড়ির বইয়ের ভান্ডার রত্নভান্ডারসম হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। খালাম্মা ছিলেন মার্জিত, শিক্ষিত, অমায়িক, রুচিশীল, এবং স্নেহশীল। কাজেই খুব দ্রুত রুচিরাদের বইয়ের আলমারিও আরেকটি উৎসে পরিণত হলো। লাইব্রেরি থেকেও বই আনা হতো। রবীন্দ্র রচনাবলী, বঙ্কিম রচনাবলী, শরৎ রচনাবলী সম্পূর্ণটাই পেয়েছিলাম ইটঊঞ খরনৎধৎুর সংগ্রহে। বুদ্ধদেব বসুর রচনাসমগ্র পড়ার সুযোগ হয়েছিল এড়বঃযব ওহংঃরঃঁঃব (এবৎসধহ ঈঁষঃঁৎধষ ঈবহঃবৎ খরনৎধৎু) থেকে। বইয়ের প্রতি সে সময় আমাদের আকর্ষণের প্রাবল্যটা বোঝানোর জন্যই এই স্মৃতিচারণগুলো করা।
কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন মানুষকে সার্বিকভাবে শিক্ষিত করতে পারে না। বিভিন্ন ধরনের বই থেকে আমরা জ্ঞান, তথ্য, দর্শন এবং শব্দসম্ভার সম্বন্ধে অবগত হই। বই পড়ার অভ্যাস অজান্তেই মনের মধ্যে অন্য একটি ভুবন সৃষ্টি করে, যা মনকে প্রফুল্ল আর প্রশান্ত রাখে। ভ্রমণকাহিনী, বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনী, রূপকথা, সুকুমার রায়ের কবিতা, পঞ্চতন্ত্রের গল্প, বাঙালির হাসির গল্প, রামায়ণ, মহাভারত, বাইবেল, বা কোরানের গল্পÑ এই বইগুলো শুধু আমার নয় অনেকেরই শৈশব, কৈশোরকে আনন্দময় করেছে, একই সাথে কল্পনার জগতকে করেছে প্রসারিত। কল্পনাশক্তির ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে শিশুতোষ বইগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সেই শৈশব থেকে আজ অবধি চলার পথ সবসময় রেশম মসৃণ ছিল না। জীবনের চড়াই উৎরাইগুলোতে বাস্তবতাকে জানার, উপলব্ধি ও অতিক্রম করার সুযোগ ও অভিজ্ঞতা হয়েছে। মানুষের আমিত্ববোধ, স্ববিরোধ, অহং, ঈর্ষা, নিষ্ঠুরতা, কৃত্রিমতা আমাকে প্রতিনিয়ত বিস্মিত করেছে এবং এখনো করে। বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করলে এখন মনে হয় বইই আমাদের সবচেয়ে অকৃত্রিম, বিশ্বস্ত, নিঃশর্ত, নির্ভেজাল, এবং সার্বক্ষণিক বন্ধু, যে বন্ধুত্ব কখনো সম্পর্কের টানাপোড়েন, ঈর্ষা—বিদ্বেষ, বা ব্যক্তিত্বের সংঘাতে বিঘ্নিত হয় না।
বর্তমান বিশ্বে বই পড়ার অভ্যাস বা প্রবণতা সম্ভবত ক্রমেই কমে আসছে। নিউইয়র্ক সিটি সহ বিভিন্ন শহরে প্রচুর বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা যাচ্ছে। ইধৎহবং ধহফ ঘড়নষব, ঝঃৎধহফ ইড়ড়শংঃড়ৎব এর মত বইয়ের দোকানের পাশাপাশি এ শহরে আরো অনেক ছোট ছোট নতুন এবং পুরনো বইয়ের দোকান ছিল, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। ৯০এর দশকে সাবওয়েতে অনেক যাত্রীকেই বই পড়তে দেখা যেতো। যে দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করতো। এখন দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। যাত্রীদের অধিকাংশই মুঠোফোনে নিমগ্ন থাকে, বই পাঠের দৃশ্য এখন বিরল।
বিনোদনের ধারণা, পদ্ধতি এবং মাধ্যম এখন অনেকটাই বিস্তৃত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা’ প্রযুক্তি নির্ভর আর বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই সব বিনোদনের জন্য বই পড়ার মত দীর্ঘকালীন সুগভীর মনোনিবেশের প্রয়োজন হয় না। প্রযুক্তি বা প্রযুক্তি নির্ভর সামাজিক মাধ্যমগুলোর অবদান দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়, বৈশ্বিক যোগাযোগে, তথ্য আদান প্রদানে অনস্বীকার্য। আশংকার বিষয় হচ্ছে মুঠোফোন বা সামাজিক মাধ্যমে নিমগ্নতা যখন বই পড়ার মত সুঅভ্যাস বা অন্যান্য সৃজনশীলতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়! ভয় সেখানেই, যখন কোনো কিছু সৃষ্টি বা কল্পনার জন্য আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শরণাপন্ন হতে হয়! বই আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে অলস করে না বরং সক্রিয় করে। বই আমাদের মৌলিক কল্পনার জগতকে বিস্তৃত এবং আলোকিত করে কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কল্পনার অবকাশ না দিয়ে কাজটি নিজ দায়িত্বে করে দেয়। বই আমাদের ভাবতে শেখায়, ভাবনার কাজটি নিজে করে দেয় না।
স্বীকার করতেই হবে আজকাল আর আগের মতো বই পড়া হয়ে ওঠে না। শুধু কর্মব্যস্ততার কারণে নয়, মুঠোফোন আর সামাজিক মাধ্যমেও আমার এবং আমাদের সময় ব্যয় হয়। তবুও নিজেকে বা আমার সমসাময়িকদের সৌভাগ্যবান মনে করি কারণ আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টাতে বইপড়াই ছিল অন্যতম বিনোদন, এত বিকল্প বিনোদন ব্যবস্থায় বিভ্রান্ত হতে হয়নি। যেটুকু পড়েছি, যা পড়েছি—তা শুধুমাত্র আমাকে বা আমাদেরকে বিনোদনই দেয়নিÑদৃষ্টিভঙ্গি, কল্পনাশক্তি, ভাবনার পরিধিকেও বিস্তৃত করেছে। পৃথিবীতে আজও ইতিবাচক নেশাগুলোর তালিকায় বই পড়ার নেশা শীর্ষস্থানীয়! শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, বার্ধক্যে, বা একাকীত্বে বইই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ, নিঃস্বার্থ, এবং জ্ঞানী হতে পারে।
