হামে দুই মাসে ৪৫১ শিশুর মৃত্যু
ঢাকা থেকেঃ হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা) দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে চার শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ৮ শিশুর। এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ১৯২ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১১১ শিশুর শরীরে।
শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
হাম শনাক্ত হয়ে মারা যাওয়া চার শিশুর দুজন ঢাকা বিভাগের আর একজন করে রয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে। হামের উপসর্গ নিয়ে মাা যাওয়া আট শিশুর তিনজন ঢাকা বিভাগের, তিনজন চট্টগ্রাম বিভাগের আর একজন করে রয়েছে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৩৭৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭৪ শিশু। মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০ হাজার ১৭৬ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৬ হাজার ৫৫ শিশু।
গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৭ হাজার ৪১৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সরকার ‘মহামারি’ ঘোষণা করেনি
অথচ এখন পর্যন্ত রোগটি নিয়ে সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের নজরদারি নেই। চিকিৎসার জন্য কোনো গাইডলাইনও তৈরি করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্ভেইল্যান্স বা নজরদারি না হলে রোগের বিস্তার, এর ব্যাপকতা, মৃত্যুর কারণ, টিকার ঘাটতি বিষয় অজানা থেকে যায়। অর্থাৎ এসব সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য না জানা গেলে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্ধকারে থেকে যায়।
দেশে নতুন কোনো রোগ দেখা দিল কি না, পুরনো রোগ ফিরে এলো কি না, কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব কমল বা বাড়ল কি না—এগুলো দেখার দায়িত্ব হলো সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)। হাম নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এমন কোনো কার্যক্রমই নেই।
এ বিষয়ে জানাতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হরে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। বর্তমানে তিনি ছুটিতে বিদেশে আছেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, হাম হলো ভ্যাকসিন প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এটা আইইডিসিআরের মধ্যে পড়ে না। নজরদারি করে সম্প্রসারিত টিকা কার্যক্রম (ইপিআই) এবং পরীক্ষা হয় জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইপিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘নিয়ম হলো—মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তথ্য দেবেন। সেটি মনিটর করবে ইপিআই।
কিন্তু আমাদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এটা কোনো দিনই পরিচালিত হয়নি। জেলা পর্যায়ে থাকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা সেটা একত্র করেন। একসময় তা প্রকাশ করেন।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, হাম যেহেতু আগে হয়নি, এর
এ বিষয়ে গত বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নজরদারির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এখনো শুরু করা হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে—নজির আহমেদ বলেন, হামের নজরদারি বা সার্ভিল্যান্স নিয়ে প্রধান স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। রোগের ব্যাপকতা জানতে, ভৌগোলিকভাবে দেশের কোন অঞ্চলে রোগটি ছড়াচ্ছে, রোগটির ইতিহাস কী, রোগটি প্রাদুর্ভাব কেমন বা গতিবিধি কী, তার কোনোটাই জানা যাচ্ছে না। পুরোপুরি অন্ধকারে রোগটির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, আইইডিসিআর মূলত সংক্রামক ব্যাধির নিয়মিত নজরদারি, নমুনা পরীক্ষা এবং মাঠ পর্যায়ে প্রাদুর্ভাব তদন্তের মাধ্যমে কাজ করে। তারা আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের বদলে মহামারি বা রোগের বিস্তার রোধে তথ্য—উপাত্ত বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করে। এবার এর কোনোটাই তারা করেনি।
ডা. বে—নজির আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়া সত্ত্বেও সরকার এটিকে ‘মহামারি’ ঘোষণা করেনি, যা করলে ব্যবস্থাপনা আরো জোরদার হতো। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোনো কন্টিনজেন্সি প্ল্যান বা বিশেষ বাজেট বরাদ্দ ছিল না। জাতীয় গাইডলাইনের আলোকে ডাক্তার ও নার্সদের বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হয়নি। পূর্বাভাস ও নজরদারির অভাব রয়েছে।
আইডিসিআরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বা গাণিতিক মডেলিং ব্যবহার করে রোগের পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সঠিক নজরদারি না থাকায় আক্রান্ত শিশুদের কোমরবিডিটি বা মৃত্যুর প্রকৃত কারণগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
