কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—নয় ব্যাংকনোটে সুফিবাদ || আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি

হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে পরমেশ্বরকে অনুভব করাই হলো সুফি দর্শনের সারকথা। সুফিবাদ কোনো তাত্ত্বিক ধর্মতত্ত্ব নয় বরং এটি হৃদয়ের পরিশুদ্ধি এবং পরম প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের এক মরমী পথ। সুফিরা বিশ্বাস করেন স্রষ্টা আকাশের ওপারে নন, বরং তিনি বাস করেন মানুষের হৃদয়ে। এইইশকে হাকিকিবা পরম প্রেমের দর্শনই যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের ব্যাঙ্ক নোটের মতো রাষ্ট্রীয় দলিলে স্থান পেয়েছে, যা প্রমাণ করে তাঁদের আধ্যাত্মিক সাংস্কৃতিক প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী। সুফিবাদ বাতাসাউফ’—এর উৎপত্তি নিয়ে নানা মত থাকলেও এর মূল সুরটি হলো পবিত্রতা ত্যাগ।সুফবা পশমি পোশাক পরিধানকারী এই সাধকরা পার্থিব জাঁকজমক ত্যাগ করে স্রষ্টার প্রেমে মগ্ন হতেন। তাঁদের দর্শন হলোভয় নয়, বরং ভালোবাসার মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়া। সুফিদের মতে, সৃষ্টির সেবা করাই স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ ইবাদত।

সুফিবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমী, যাঁকে বলা হয়প্রেমের বিশ্বকবি তুরস্কের সাংস্কৃতিক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই প্রতীককে সম্মান জানাতে ১৯৮৫ সালে ইস্যুকৃত ৫০০০ লিরা নোটে তাঁর প্রতিকৃতি সমাধি সৌধের ছবি স্থান পেয়েছে। রুমী কেবল একজন কবি বা দার্শনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চমার্গের সুফি সাধক এবং সুফি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। সুফি দর্শনে রুমীর অবদান অনবদ্য। তাঁর মহাকাব্যমসনবী’—কে আধ্যাত্মিক গভীরতার কারণেফারসি ভাষার ধর্মগ্রন্থবলে অভিহিত করা হয়। রুমী শিখিয়েছেন যে, স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর সহজতম পথ হলো নিঃস্বার্থ প্রেম। তাঁর মতে, আত্মার সাথে পরমাত্মার যে বিরহ, তা কেবল প্রেমের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। তাঁর সেই বিখ্যাত নাচ বাসুফি ড্যান্স’ (ঝধসধ) ছিল মূলত স্রষ্টার প্রেমে আত্মহারা হয়ে লীন হওয়ার এক আধ্যাত্মিক সাধনা। রুমী শিখিয়েছেন, ধর্ম বা ভাষার বিভেদ নয়, বরং হৃদয়ের পবিত্র স্পন্দনই মানুষকে স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। তিনি মনে করতেন, মানুষ যখন নিজেরআমিত্ববা অহং বিসর্জন দিয়ে প্রেমের পথে হাঁটে, তখনই সে প্রকৃত সত্যের দেখা পায়। তাঁর সেই অমর বাণী আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়— ‘প্রেমই হলো সেই জ্যোতি যা আমাদের অন্ধকার আত্মাকে আলোকিত করে।ব্যাঙ্কনোটের গায়ে তাঁর এই উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সুফি দর্শনেরই এক নীরব জয়গান।

ইউনুস এমরে মীর সাইয়্যেদ আলী হামাদানি ছিলেন মানবতার চারণকবি সমাজ সংস্কারক। তুরস্কের ২০০৯ সালের ২০০ লিরা নোটে আমরা দেখি মানবতার চারণকবি ইউনুস এমরেকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর এই সুফি সাধক অত্যন্ত সহজ ভাষায় মানুষের সেবা সহমর্মিতার কথা বলতেন। তাঁর সেই বিখ্যাত পংক্তি আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে— ‘আমরা সৃষ্টিকে ভালোবাসি, কারণ আমরা স্রষ্টাকে ভালোবাসি।অন্যদিকে, ২০২১ সালের তাজিকিস্তানের ১০ সোমোনি নোটে দেখা যায় কাশ্মীরের আলোকবর্তিকা মীর সাইয়্যেদ আলী হামাদানির ছবি। এই মহান পারস্য সুফি কেবল ধর্ম প্রচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি কাশ্মীর অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি সেখানকার শিল্প হস্তশিল্পের (বিশেষ করে শাল তৈরি) বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তসবিহ হাতে জিকিরের পাশাপাশি তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন কীভাবে স্বাবলম্বী হতে হয়।

মখতুমগুলি ফিরাগী (গধমঃুসমঁষু চুৎধমু) হলেন তুর্কমেনিস্তানের আধ্যাত্মিক চিকিৎসক। তুর্কমেনিস্তানের ১০ মানাত (২০১২) নোটে শোভা পাচ্ছে মখতুমগুলি ফিরাগীর (গধমঃুসমঁষু চুৎধমু) প্রতিকৃতি। আঠারো শতকের এই মহান চিন্তাবিদ কবিকে তুর্কমেন সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বাস্পিরিচুয়াল ডক্টর’, যিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে বিভক্ত গোত্রগুলোকে ঐক্যের সুতায় বেঁধেছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল একাধারে মানবিক আধ্যাত্মিক, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য আজও একটিমডেল স্কুলহিসেবে কাজ করে। 

আমার সংগ্রহের আরেকটি উজ্জ্বল নাম কিরগিজস্তানের ১০০০ সোম নোটের তোকতোগুল সাতিলগানভ (ঞড়শঃড়মঁষ ঝধঃুষমধহড়া) তিনি ছিলেন মধ্য এশিয়ার একজন কিংবদন্তিআকিনবা চারণকবি। তোকতোগুল প্রচলিত অর্থে কোনো সুফি পীর বা ধর্মতাত্ত্বিক ছিলেন না, কিন্তু তাঁর জীবন দর্শনের সাথে সুফিবাদের এক গভীর আত্মিক সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। সুফিরা যেমন পার্থিব স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কেবল সত্যের সন্ধানে নিজেকে সঁপে দেন, তোকতোগুলও তেমনি কোনো জাগতিক প্রলোভনের কাছে মাথানত করেননি। শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর বজ্রকণ্ঠ এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘ নির্বাসনের যন্ত্রণা সহ্য করাতাঁর অটল সৎ চারিত্রিক দৃঢ়তারই পরিচয় দেয়, যা সুফিদের আপসহীন জীবনবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়। সুফিবাদের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যেমনসামাবা সঙ্গীত, যার মাধ্যমে সাধকেরা আধ্যাত্মিক প্রশান্তি খোঁজেন; তোকতোগুলও ঠিক তেমনি তাঁর ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রকোমুজ’—এর তারে তারে মানুষের মুক্তি মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তাঁর সঙ্গীত কেবল বিনোদন ছিল না, বরং তা ছিল এক প্রকারের আত্মিক জাগরণÑযা সুফি সঙ্গীতের মতোই শ্রোতার হৃদয়ে এক গভীর আবেদন তৈরি করে।

সুফি দর্শনের আলোচনা মির্জা গালিবকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। বিশ্বের কোনো দেশের ব্যাঙ্কনোটে এখনও এই মহান কবির প্রতিকৃতি স্থান পায়নি। তাঁর কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুফিবাদের প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্ট। মির্জা গালিবকে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ মহান কবি এবং দক্ষিণ এশিয়ার উর্দু ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

 সুফিবাদ আর আধ্যাত্মিকতার যে সুবাস পারস্যের আকাশেবাতাসে মিশে আছে, তার অন্যতম ধারক কবি হাফিজ শিরাজি। ইরানের মানুষের কাছে হাফিজ কেবল একজন কবি নন, বরং এক পরম পথপ্রদর্শক। তাঁর এই কালজয়ী মরমী দর্শনকে সম্মান জানাতেই ইরান তাদের জাতীয় মুদ্রায় পরম মমতায় স্থান দিয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীর এই কাব্যসম্রাটকে। হাফিজের গজল কাব্য যেমন আধ্যাত্মিক পথের পাথেয়, তেমনি তাঁর সমাধিও দেশটির এক পবিত্র সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ইরানী মুদ্রায় হাফিজের সমাধির চিত্র ১০০,০০০ রিয়াল নোট এবং ৫০,০০০ রিয়াল নোটে রয়েছে। তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই নকশাটি করা হয়েছে, যা পর্যটক সুফি অনুসারীদের কাছে এক পরম শ্রদ্ধার স্থান। মুদ্রায় সুফি সাধকদের এই সরব উপস্থিতি কেবল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য দর্শনের এক নিরন্তর স্মরণিকা। হাফিজের মতো মরমী কবির স্মৃতি ব্যাঙ্কনোটে ধারণ করার মাধ্যমে ইরান তার সমৃদ্ধ সুফি ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে। মুদ্রা দিয়ে আমরা পার্থিব সম্পদ কিনি, কিন্তু এই সুফি সাধকরা শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে অমূল্য আত্মিক সম্পদ লাভ করা যায়। ব্যাঙ্ক নোটের এই ক্ষুদ্র পরিসরে যখন আমরা এই মহাত্মাদের দেখি, তখন তা কেবল একটি দেশের মুদ্রা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিকতার এক একটি মাইলফলক। পকেটে রাখা এই নোটগুলো আমাদের অবিরত মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের আসল সার্থকতা সঞ্চয়ে নয়, বরং নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝে, ঠিক যেভাবে এই সুফি সাধকরা নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন পরমাত্মার সন্ধানে।

Related Posts