বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাইয়ের পাকিস্তানি কূটকৌশল || আনিস আহমেদ
সম্প্রতি বাংলাদেশ—পাকিস্তান নলেজ করিডোরের দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রী বলেন এ নলেজ করিডোর দু’দেশের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। প্রশ্ন হচ্ছে কোন সে নতুন দিগন্ত? এই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে পাকিস্তানি ভাবধারায় মগজ ধোলাই। শিক্ষা মন্ত্রী এহাসানুল হক মিলন বলেন, ‘শিক্ষাগত দিক দিয়ে তাদের (অর্থাৎ পাকিস্তানের) বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অত্যন্ত এক্সেলেন্ট, সেন্টার অফ এক্সেলেন্স; সেই জায়গায় আমাদের স্টুডেন্টরা যাবে সে জন্য আমি তাদেরকে আন্তরিক ভাবে মুবারকবাদ জানাই’। তিনি আরও বলেন, ‘.. এবং আমাদের সাথে পাকিস্তানের কালচারের মিল রয়েছে, খাবার—দাবার, রিলিজিয়স মিল রয়েছে’। বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রী সম্ভবত এ কথা বেমালুম ভুলে গেলেন যে বাঙালি আর পাকিস্তানিরা যোজন যোজন ব্যবধানে অবস্থিত, সে কেবল স্থানিক দূরত্ব নয়, মননেরও দূরত্ব। আর এই দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে প্রকট আকার ধারণ করে যখন তারা নৃশংস আক্রমণ চালায় বাঙালিদের ওপর। এই নৃশংসতা যে কেবল বাস্তব হামলার মধ্যেই সীমিত ছিল তা নয়, বরঞ্চ ১৯৭১ এর আগেও দীর্ঘ বাইশ বছর ধরে পাকিস্তানিরা আক্রমণ চালিয়েছে আমাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতির ওপরও। সেই যে বায়ান্ন সালে বাংলা ভাষার উপর তাদের আক্রমণ, আমাদের ভাষাকে নির্মূল না হলেও বিকৃত করার যে অপচেষ্টা তারা চালিয়েছে, সে ইতিহাস কি বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রী জানেন না? হয়ত তিনি পাকিস্তান আমলের সেই অবিবেচিত পরোক্ষ নিপীড়ন দেখেননি কিন্তু ইতিহাস জানার জন্য তো চাক্ষুষ সাক্ষী হওয়া লাগে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিবর্তন এবং ন’মাস ব্যাপী যুদ্ধের কথাতো ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। তবু জানি সে ইতিহাস মুছে ফেলার প্রয়াস চালাচ্ছে নব্য রাজাকাররা। অবশ্য আশা করি, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের সন্তানের মন্ত্রীসভার যিনি সদস্য তিনি ইতিহাসের সেই সব নির্মম সত্যগুলোকে অবমূল্যায়ন করবেন না। কিন্তু বিস্ময়কর ভাবে তিনি এ কথাও বলেন যে পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা ‘অনেক অনেক এগিয়ে গেছে’। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়েছে? পিছিয়ে যদি পড়ে তবে তার দায় কি শিক্ষা মন্ত্রী এহাসানুল হক মিলন নেবেন? নাকি পূর্বতন ইউনুস সরকারের উপর এই দায় বর্তাবে। কারণ শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেখে স্বয়ং পাকিস্তানি তরুণরা বলেছিল, ‘আমাদের দেশটাকে সুইজারল্যান্ড বানানোর কোন দরকার নেই, দেশটাকে বাংলাদেশ বানিয়ে দাও’। শিক্ষামন্ত্রী মিলন কি সে কথাও বেমালুম ভুলে গেলেন?
সংবাদে জানানো হয় ‘ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ইমরান হায়দার এই উদ্যোগকে দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ স্থাপনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে’। এই যে তিনি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের কথা বললেন সেটিও বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সুখবর নয়। কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক থাকতেই পারে এবং বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির যে মূল মন্ত্র দিয়ে গেছেন যে ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরীতা নয়’ সেই মন্ত্রে বাংলাদেশকে বিশ্বাস করতে হবে। তবে নিজেদের স্বাতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে কোনো ক্রমেই নয়। সেটি পৃথিবীর যে কোন দেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইউনুস আমলের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি যেমন সাধারণ মানুষের কাছে কঠোর সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি তার চেয়েও কম বিপজ্জনক নয় পাকিস্তানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পাঠানোর জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে এই নলেজ করিডোর তৈরির বিষয়টি। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো ঘাটতি পড়ে নাই যে আমাদের শিক্ষার্থীদের পাকিস্তানে গিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে পাকিস্তানের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা যদিও বিস্তার লাভ করছে কিন্তু পাকিস্তানে উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে কাঠামোগত এবং অর্থায়নে বড় রকমের সমস্যা রয়েছে। সেখান থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেখানে সরকারি খরচ অপর্যাপ্ত এবং ভৌগলিক বৈষম্যও প্রচুর। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে সে দেশে পাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, সেখানকার শিক্ষাগত মান আদৌ উন্নত হয়নি। শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য পাকিস্তানের উচ্চ শিক্ষা কমিশন এবং জেলা স্তরে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে সেখানে দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে কারণ পাকিস্তানে শিক্ষার মানের অবনতি, যথার্থ মান সম্বলিত অনুষদ (ফ্যাকাল্টি) এর অভাব এবং দুর্বল কাঠামো পাকিস্তানের উচ্চ শিক্ষাকে তলানিতে নিয়ে গেছে। তা ছাড়া পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আন্তর্জাতিক মান অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
এই যখন পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা, বস্তুত উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা তখন বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রী না জেনেই পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছেন এবং পাকিস্তান যেখানে নিজের শিক্ষায়তনে অর্থায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে নিয়ে যাবার কারণটা অনুসন্ধান করা উচিৎ। সম্প্রতি মেহের আফরোজ শাওন তাঁর ফেইসবুকে এক নারীর বক্তব্য পোস্ট করেছেন, দেখলাম যে সেই নারী তার সন্তানকে পড়াশোনার জন্য পাকিস্তানে পাঠাতে পারছেন দেখে ভাবে গদ গদ হয়ে উঠেছেন। পাকিস্তানে তাঁর পুত্রকে পড়তে পাঠানোর আগেই বাংলাদেশে বসেই তাঁর মগজ ধোলাই হয়ে গেছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি সেটা ভিন্ন কথা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করে তিনি বলছেন, ‘৭১ সালে যুদ্ধ কিংবা কিছু না কিছু একটা হয়েছিল, অনেক সময় বাড়িয়েও বলা হচ্ছে, বন্ধু বন্ধুতো গন্ডগোল হয়, বন্ধু যদি হাত বাড়ায়, সরি বলে; সরি বলার দরকার নেই, সে আমাকে সুযোগ দিচ্ছে’। পাঠকরাই বিচার করে দেখতে পারেন যে পাকিস্তানের প্রতি তাঁর উপচে পড়া দরদ কি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যায়! তিনিতো মুক্তিযুদ্ধকে বলছেন ‘কিছু না কিছু’ হয়েছিল, তাঁর কাছ থেকে তো পাকিস্তান প্রীতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীও কি জানেন না, অর্থাভাবে নিমজ্জিত পাকিস্তান কেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিতে চায়, যারা একাত্তরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নির্বিশেষে সকলকেই হত্যা করেছিল।
আমাদের প্রত্যাশা বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের সকল শিক্ষার্থীকে মগজ ধোলাইয়ের এই পাকিস্তানি কারখানা থেকে দূরে রাখবেন।
