৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ ফ্লোরিডা সয়ামপ্লান্ডিয়াঃ ক্যারেন রাসেল আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

ফ্লোরিডার এভারগ্লেডসের গভীর জলাভূমির মধ্যে একটি ছোট দ্বীপচারপাশে কাদা, ম্যানগ্রোভ, আর অলিগেটরে ভরা অচেনা জলরাশি। সেই দ্বীপেই দাঁড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত থিম পার্ক— ‘সয়ামপ্লান্ডয়া আর সেই পার্কের প্রাণ ছিল বিগট্রি পরিবার।

সবকিছু একসময় খুব উজ্জ্বল ছিল। পর্যটকেরা দূরদূরান্ত থেকে আসত শুধু এক নারীকে দেখার জন্যহিলোলা বিগট্রি। তিনি ছিলেন অলিগেটরের রানী। কুমিরের মুখের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে, তাদের পিঠে চড়ে, মৃত্যুর সঙ্গে খেলা করতেন তিনিএবং দর্শকেরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তা দেখত। তার স্বামী, চিফ বিগট্রি, গর্বে বুক ফুলিয়ে সেই শো পরিচালনা করতেন। তাদের তিন সন্তানঅসসি, কিওই, আর ছোট্ট অভাএই বিস্ময়কর জগতেই বড় হচ্ছিল।

কিন্তু একদিন সব থেমে গেল।

হিলোলা অসুখে পড়লেন, এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মারা গেলেন। তার মৃত্যু যেন শুধু একজন মায়ের মৃত্যু নয়একটি জগতের অবসান। সয়ামপ্লান্ডিয়া হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পর্যটকেরা আর আসতে চাইল না। যারা একসময় করতালি দিত, তারা এখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

এরই মধ্যে, মূল ভূখন্ডে গড়ে উঠল নতুন এক আধুনিক থিম পার্ক—‘ডড়ৎষফ ড়ভ উধৎশহবংং আলো, প্রযুক্তি, আর ভয়ংকর কৃত্রিম অভিজ্ঞতার মিশেলে সেটি খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। সয়ামপ্লান্ডিয়া তার সামনে যেন এক পুরনো, ক্লান্ত স্মৃতি।

চিফ বিগট্রি অনেক চেষ্টা করলেন পার্কটিকে বাঁচাতে, কিন্তু অর্থের টানাপোড়েন বাড়তেই থাকল। শেষ পর্যন্ত একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেনমূল ভূখন্ডে গিয়ে টাকা জোগাড় করতে হবে। তিনি সন্তানদের দ্বীপে রেখে চলে গেলেন, যেন এই সাময়িক অনুপস্থিতি সবকিছু ঠিক করে দেবে।

কিন্তু সেটাই ছিল ভাঙনের শুরু।

কিওই, যিনি সবসময় একটু আলাদা ছিল, এই সুযোগে দ্বীপ ছেড়ে চলে গেল। সে কাজ পেলডড়ৎষফ ড়ভ উধৎশহবংং’—এ। সেখানে গিয়ে সে এক নতুন পৃথিবী দেখতে পেলযেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত, চকচকে, এবং মুনাফাকেন্দ্রিক। ধীরে ধীরে সে তার নিজের পরিবারকে দূর থেকে দেখতে শুরু করলএকটা পুরনো, অচল ব্যবস্থার মতো।

অন্যদিকে, অসসি ক্রমশ বাস্তবতা থেকে সরে যেতে লাগল। সে বিশ্বাস করতে শুরু করল যে সে এক মৃত ছেলের আত্মার প্রেমে পড়েছে। সে আয়নার সামনে বসেপ্রেতাত্মার আহ্বানকরত, অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলত, যেন অন্য জগতের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করছে। অভা, তার ছোট বোন, এসব দেখে বিভ্রান্ত হলেও বিশ্বাস করতকারণ তাদের জগতে অলৌকিক আর বাস্তবের সীমারেখা কখনোই খুব স্পষ্ট ছিল না।

একদিন, এক রহস্যময় লোক এলনিজেকে সেইরৎফ গধহবলে পরিচয় দিল। তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক আলো, কথায় ছিল এক অদ্ভুত মায়া। সে অসসিকে বলল, সে তাকে নিয়ে যেতে পারবে সেই মৃত প্রেমিকের কাছেজলের নিচে, অদ্ভুত এক জগতে।

অসসি তার কথায় বিশ্বাস করল।

এক রাতে, কাউকে কিছু না বলে, সে ইরৎফ গধহএর সঙ্গে চলে গেল।

পরদিন সকালে, অভা ঘুম থেকে উঠে দেখলঅসসি নেই। চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু কাদা আর জলের গন্ধ। তার বুকের ভেতর একটা অজানা ভয় জমতে লাগল। সে জানত, কিছু একটা ভীষণ ভুল হয়েছে।

অভা সিদ্ধান্ত নিলসে তার বোনকে খুঁজে বের করবে।

কিছুদিনের মধ্যে ইরৎফ গধহ আবার দেখা দিল। সে বলল, সে অসসিকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। অভা দ্বিধায় পড়ল, কিন্তু তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না। সে তার সঙ্গে যাত্রা শুরু করলএভারগ্লেডসের গভীর অজানা অঞ্চলের দিকে।

যাত্রা সহজ ছিল না। তারা ছোট নৌকায় করে এগোতে লাগলচারপাশে ম্যানগ্রোভের জট, কাদামাটি, আর মাঝে মাঝে পানির নিচে ভেসে ওঠা অলিগেটরের চোখ। রাত নামলে সবকিছু আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতজলের ওপর কুয়াশা, অদ্ভুত শব্দ, আর অন্ধকারের গভীরতা।

প্রথমে ইরৎফ গধহ বন্ধুর মতো আচরণ করছিল। সে গল্প বলত, পথ দেখাত। কিন্তু ধীরে ধীরে অভা কিছু অস্বাভাবিকতা টের পেল। তার কথাগুলো অস্পষ্ট, আচরণ অদ্ভুত। কোথাও যেন একটা বিপদের গন্ধ।

এক রাতে, তারা একটি নির্জন জায়গায় থামল। চারপাশে শুধু জল আর অন্ধকার। সেই রাতেই ইরৎফ গধহ তার আসল রূপ দেখাল। তার আচরণ হঠাৎই পরিবর্তিত হলসে অভার দিকে এগিয়ে এল এক ভয়ংকর উদ্দেশ্য নিয়ে।

অভা বুঝতে পারলসে বিপদে পড়েছে।

ভয় তাকে আচ্ছন্ন করল, কিন্তু সেই ভয়ের মধ্যেই সে শক্তি খুঁজে পেল। সে প্রতিরোধ করল, পালানোর চেষ্টা করল। কোনোমতে সে সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এলএকলা, ক্লান্ত, কিন্তু বেঁচে।

এই অভিজ্ঞতা তাকে মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিল। সে আর আগের সেই সরল, বিশ্বাসী মেয়ে নেই। সে এখন জানেজগৎ শুধু কল্পনা আর রোমাঞ্চ নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বিপদ, প্রতারণা, আর অন্ধকার।

অভা একা পথ খুঁজে ফিরে এল। জলাভূমির মধ্য দিয়ে, কাদা আর অন্ধকার পেরিয়ে, সে আবার তার দ্বীপে পৌঁছাল।

এরই মধ্যে, কিওইও ফিরে এল। সে বুঝতে পেরেছিলযে আধুনিক জগতের দিকে সে ছুটছিল, তা তাকে সম্পূর্ণ করতে পারবে না। তার শিকড় এখানেই।

চিফ বিগট্রিও ফিরে এলেনক্লান্ত, ব্যর্থ, কিন্তু পরিবারের কাছে।

তারা আবার একত্রিত হল, কিন্তু আগের মতো নয়। সয়ামপ্লান্ডিয়া আর সেই পুরনো জৌলুস ফিরে পেল না। অসসি কোথায়তা স্পষ্ট নয়। সে কি সত্যিই কোনো অলৌকিক জগতে হারিয়ে গেছে, নাকি বাস্তবের কোনো অন্ধকারেতা রহস্যই থেকে যায়।

অভা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে জলাভূমির দিকে তাকিয়ে। সে জানেতার শৈশব শেষ হয়েছে। কিন্তু সেই শেষের মধ্যেই সে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছে।

ফ্লোরিডার সেই জলাভূমিযেখানে জল আর মাটি একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছেসেই জায়গাটাই যেন তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। অনিশ্চিত, বিপজ্জনক, কিন্তু গভীরভাবে সত্য।

এবং সেই সত্যের মধ্য দিয়েই, অভা বড় হয়ে ওঠে।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরচিতি:

ক্যারেন রাসেলজন্মগ্রহণ করেন ১৯৮১ সালে, ফ্লোরিডারমায়ামিতে শৈশব কাটে ফ্লোরিডার প্রকৃতির কাছাকাছি, বিশেষ করে জলাভূমি উপকূলীয় পরিবেশেযা পরে তার লেখায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।

তিনি নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কলম্বিয়া থেকে এমএফএ সম্পন্ন করেন।

তার লেখার বৈশিষ্ট্য:

জাদুবাস্তবতা (সধমরপধষ ৎবধষরংস

অদ্ভুত, স্বপ্নময় পরিবেশ 

শৈশব প্রাপ্তবয়স্কতার সীমারেখা 

প্রকৃতি মানুষের সম্পর্ক 

তিনি আধুনিক আমেরিকান সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে বিবেচিত। আলোচ্য উপন্যাসটির প্রকাশকাল ২০১১ সাল।


Related Posts