গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— উনত্রিশ ভরাট কণ্ঠের সংযত সুরসাধক সৈয়দ আবদুল হাদী

ড. জীবন বিশ্বাসঃ ১৯৪০ সালের ১ জুলাই ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত কসবা উপজেলার (বর্তমান বাংলাদেশ) শাহপুর গ্রামে মাতুলালয়ের পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাঙ্গীতিক দিগন্তের এই নক্ষত্র সৈয়দ আবদুল হাদী, যদিও শৈশবের স্বর্ণালী দিনগুলোর এক বড় অংশ কেটেছিল আগরতলার প্রকৃতির কোলে। পিতা সৈয়দ আবদুল হাই ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক এক সৌখিন মানুষ, যাঁর গ্রামোফোন রেকর্ডের মায়াবী আবর্তন ছোটবেলাতেই বালক হাদীর ভেতরে সুরের গোপন বীজ বুনে দিয়েছিল। পরবতীর্তে আগরতলার উমাকান্ত একাডেমি থেকে শুরু করে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর ঘুরে ঢাকায় থিতু হন শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী। ছিয়াশি বছর বয়সে দাঁড়িয়েও তিনি বাংলা গানের পরিমন্ডলে এক সতেজ, প্রদীপ্ত ও সক্রিয় জীবন্ত শিল্পী হিসেবে বিরাজ করছেন। জীবনের এই দীর্ঘ সুরময় যাত্রায় তাঁর কণ্ঠের ভরাট ও সংযত সুর তরঙ্গের মতো সময়ের কূল ঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে চলছে আজও অবিরল ধারায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পলিমাটি ও সেতার থেকে কণ্ঠের রূপান্তর

তিতাস বিধৌত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পলিমাটিতে ছড়িয়ে ছিল সংগীতের এক অলৌকিক সুবাস। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ ও ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁর মতো মহারথীদের সাধনপীঠ এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৈশোরেই তরুণ হাদীর ইচ্ছা জেগেছিল সেতারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে সুরের জাদু তৈরি করার। কিন্তু সেতারের কঠিন ধাতব তারে অঙ্গুলি সঞ্চালন করতে গিয়ে ফোসকা পড়ে গেলে গুরুমহাশয় স্নেহের ধমক দিয়ে বলেছিলেনÑযন্ত্রের পেছনে মিছে সময় নষ্ট না করে কণ্ঠ সাধো, আসল সুর তো তোমার বুকেই জমা হয়ে আছে। উত্তরকালে গুরুর সেই জহুরি চোখ ও দিকনির্দেশনা বাংলা সাঙ্গীতিক ভুবনের জন্য এক অপার আশীর্বাদ হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। যন্ত্রের জ্যামিতিক কঠোরতা ছেড়ে তিনি যখন গলায় সুর তুললেন, তখন বোঝা গেল তার বিশুদ্ধ সুরের আবেগ কত সহজে মানুষের হৃদয়ের নিভৃততম গহীনে প্রবেশ করতে পারে।

সাহিত্যবোধ, শব্দানুশীলন ও পরিশীলিত গায়নশৈলী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যয়নকালে তাঁর শিল্পচেতনা লাভ করেছিল এক অনন্য বৌদ্ধিক ঋজুতা। শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ, বাণীর অন্তর্নিহিত অর্থপ্রবাহ, ব্যাকরণের শুচিতা এবং দুটি চরণের মধ্যবর্তী নীরবতা ও বিরতিকে কীভাবে সুরের অলংকার বানাতে হয়Ñসাহিত্য পাঠের গভীর অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তা অর্জন করেছিলেন। গায়কীর ক্ষেত্রে তিনি কেবল সুরের পিঠে কথা বসাননি, বরং প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণ ও স্বরবর্ণকে নিজের অনুভূতির আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। সুবল দাস, পি. সি. গোমেজ, আবদুল আহাদ, কমল দাশগুপ্ত কিংবা আবদুল লতিফের মতো তৎকালীন দিকপাল সুরস্রষ্টাদের নিবিড় সান্নিধ্য ও স্নেহ তাঁকে বেতার, চলচ্চিত্র এবং আধুনিক গানের ত্রিমাত্রিক পরিমন্ডলে এক ঈর্ষণীয় উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছিল।

সেলুলয়েডের সুরভুবন

ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সিংগার হিসাবে তাঁর আগমন ঘটে। ১৯৬৪ সালে ‘ডাকবাবু’ চলচ্চিত্রে একক কণ্ঠে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে যে স্বর্ণালী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তা পরবতীর্ কয়েক দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র—সংগীতকে এক ভরাট কণ্ঠের নিজস্ব আভিজাত্য উপহার দেয়। তাঁর গায়কীতে কোনো কৃত্রিম কোলাহল কিংবা অহেতুক নাটকীয় আতিশয্য ছিল না। বিরহ কিংবা ব্যাকুলতাকে বুকফাটা আর্তনাদে না বদলে একধরনের উচ্চমার্গীয় হাহাকার ও শান্ত উদাসীনতায় প্রকাশ করাই ছিল তাঁর সুরের আসল জাদু। ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’ অথবা ‘কেউ কোনোদিন আমারেতো কথা দিলনা’ কিংবা ‘এমনও তো প্রেম হয়’—এর মতো গানে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, গলা না উঁচিয়েও নিচু স্বরের দীর্ঘশ্বাসে কীভাবে এক মহাজাগতিক একাকিত্বকে মূর্ত করে তোলা যায়। মানুষ যখন চরম হতাশায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখন এই ভরাট কণ্ঠটিই যেন তার মনের অর্গল ঢাকা দুঃখের একমাত্র সহযাত্রী হয়ে ওঠে।

স্বদেশচেতনায় দীপ্তি ও লোকায়ত সামাজিক বিস্তার

সংগীত যখন ব্যক্তির প্রেম—বিরহের গন্ডি পেরিয়ে এক রক্তস্নাত জাতীয় পতাকার ছায়াতলে এসে দাঁড়ায়, তখনও তাঁর কণ্ঠ হয়ে ওঠে সমান উজ্জ্বল ও বিনম্র। তাঁর ‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তি সেনা’ গানটি শহীদের রক্তের ঋণে ভেজা মাতৃভূমির প্রতি এক আত্মনিবেদিত আরাধনা। আবার ‘আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার’ কিংবা ‘আউল বাউল লালনের দেশে’—র মতো গানে তিনি যেমন গ্রামীণ মেজাজ ও সামাজিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত সাবলীল রসিকতায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’ গানে বাংলাদেশকে দিয়েছেন সুরের এক অনন্য রূপরেখা। হাস্যরস, প্রতিবাদ, ভক্তি, প্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতাÑসবকিছুই তাঁর পরিশীলিত গায়কীতে ভারসাম্য লাভ করেছে।

স্বীকৃতি ও সুরের চিরন্তন নিবাস

দীর্ঘ ছয় দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মাননা তাঁর পথ চলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই যুক্ত হয়েছে। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘গরিবের বউ’ ও ‘ক্ষমা’ চলচ্চিত্রে অবিস্মরণীয় গায়কীর জন্য তিনি লাভ করেছেন পাঁচটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০০০ সালে ভূষিত হয়েছেন রাষ্ট্রীয় ‘একুশে পদক’—এ, এর পাশাপাশি লাভ করেছেন আজীবন সম্মাননাসহ অজস্র স্বীকৃতি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক পদকের চেয়েও তাঁর আসল অর্জন হলো আপামর মানুষের স্মৃতির বন্দরে তাঁর গানের অমলিন উপস্থিতি। তিনি আধুনিক গানকে হালকা চপলতায় ভাসিয়ে দেননি, আবার শাস্ত্রীয় কঠোরতায় তাকে সাধারণের জন্য দুর্বোধ্যও করে তোলেননি বরং জনপ্রিয়তা ও গম্ভীর রসানুভূতির মাঝে গড়ে তুলেছিলেন এক টেকসই সুরের সেতু।

সৈয়দ আবদুল হাদীর গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গান

১। একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, ২। এমনও তো প্রেম হয়, ৩। যেও না সাথী, ৪। জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, ৫। আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার, ৬। চোখ বুজিলেই দুনিয়া আন্ধার, ৭। চোখের নজর এমনি কইরা, ৮। চলে যায় যদি কেউ বাঁধন ছিঁড়ে, ৯। এই পৃথিবীর পান্থশালায়, ১০। যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তি সেনা, ১১। সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি, ১২। সখী চল না জলসা ঘরে, ১৩। ভুল গাঙে নোঙ্গর করিস না, ১৪। আমি তোমারই প্রেম ভিখারী, ১৫। কারো আপন হইতে পারলি না অন্তর, ১৬। কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিলো না, ১৭। তোমাদের সুখের নীড়ে, ১৮। আঁধারে ডুবে গেছে রাত, ১৯। আমার দোষে দোষী আমি, ২০। তেল গেলে ফুরাইয়া, ২১। আউল বাউল লালনের দেশে, ২২। নদীরে তুই কত রঙ্গ দেখালি আমায়, ২৩। বড় কঠিন এ দুনিয়া, ২৪। সতী মায়ের সতী কন্যা, ২৫। আমার বাবার কথা বড়ই মনে পড়ে।

পরিশেষ

শিল্পের সফলতা সময়ের দীর্ঘতম কষাঘাতে টিকে থাকায়। যে যুগে সুরের চেয়ে কোলাহল বেশি আর বাণীর চেয়ে চমক প্রধান, সেই যুগেও সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠস্বর যেন এক শান্ত, অবিচল বটবৃক্ষের ছায়া। প্রতিটি শব্দের বিশুদ্ধ উচ্চারণ, সুরের প্রতি ব্যাকুল আনুগত্য এবং আবেগের সুপরিমিত নান্দনিকতা তাঁকে বাংলা সংগীতে এক স্বয়ম্ভূ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। সময় বয়ে চলে, সুর ও শিল্পের পরিবর্তন হয় কিন্তু সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠে তোলা সুরগুলো অনুভূতির গভীরে এমনভাবে শেকড় গেঁথেছে যে, নতুন স্রোত এসে সে শেকড়কে স্থানচ্যুত করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। তিনি সুরের এক এমন অভিজাত প্রদীপ, যা অনুচ্চ স্বরে জ্বলে অথচ পুরো ঘরকে এক স্নিগ্ধ আলোয় ভরিয়ে রাখে।

Related Posts