যুদ্ধ কি কবিতার কথা শোনে? গিনসবার্গের যশোর রোড || দীপেন ভট্টাচার্য ক্যালিফোর্নিয়া

একটি কবিতা কি একটি যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারে? একটি নাটক থামাতে পারে কি একটি গণহত্যা, একটি স্লোগান কি স্তব্ধ করে দিতে পারে বারুদের বিস্ফোরণ, বেয়নেটের আঘাত? না, আমি এমন কোনো বোকার স্বর্গে বাস করি না যাতে মনে করতে পারি যে, পৃথিবী নামের গ্রহে কোনো কবির আর্তনাদ আমাদের বিবেককে জাগ্রত করবেÑ যা হওয়া উচিত নয় তা চিরতরে বন্ধ করে দেবে। তবু আমরা তো আশা করি।

১৯৬৬ সনে অ্যালেন গিনসবার্গ ভিয়েতনামে আমেরিকার যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি কবিতা লিখেছিলেন, কবিতাটির নাম ছিল ডরপযরঃধ ঠড়ৎঃবী ঝঁঃৎধ। সেখানে লিখেছিলেন-

I lift my voice aloud,

make Mantra of American language now,

I here declare the end of the War!

এই কবিতায় যে যুদ্ধ থামবে না তা কবি জানতেন, তবু লিখলেন- I here declare the end of the War। এই কবিতার পরে আরো দীর্ঘ নয় বছর সেই যুদ্ধ চলেছে, তাহলে কি আজ আমরা কবিতাটিকে ব্যর্থ বলে ঘোষণা দেব? না, এই যে আমি এখন লিখতে বসেছি তাঁর ঝবঢ়ঃবসনবৎ ড়হ ঔবংংড়ৎব জড়ধফ নিয়ে, সেখানে ১৯৭১—এর সেপ্টম্বরের পাঁচ বছর আগের ছাড়পত্র — ও যবৎব ফবপষধৎব ঃযব বহফ ড়ভ ঃযব ডধৎ আমার মাথায় ঘুরছে, ভাবছি পৃথিবীর সব কবিরই কোনো না কোনো সময়ে লেখা উচিতÑ ‘আমি এখানে যুদ্ধ বন্ধ করার ঘোষণা দিলাম’। কোটি কন্ঠে রণিত হোক সেই মহাবাণী, আছড়ে পড়ুক বধির রণনায়কদের কানে। হয়তো সেই ঢেউ ভাঙতে পারবে না তার পাষাণ প্রাসাদ, তবু ইতিহাসে সেই সাহসী উচ্চারণ রয়ে যাবে।

‘সেপ্টেম্বর অন যেশোর রোড’ও ছিল সেরকম একটি উচ্চারণ। এটি একটি হৃদয়ভাঙা চিৎকার যা মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচারকে বন্ধ করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগী রাজাকার বাহিনীর দানবীয় অভিযান থেকে বাঁচতে পূর্ব বাংলার লাখো লাখো মানুষ তখন ভারতে পাড়ি দিয়েছে। অসুস্থ অসহায় শরণার্থীতে উপচে পড়ছে উত্তর চব্বিশ পরগণার বনগাঁর যশোর রোড সংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চল, সেই বৃষ্টিস্নাত কর্দমাক্ত মৃতপ্রায় মনুষ্য—জর্জরিত রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিনসবার্গ হাহাকার করেছিলেন — 

আর কত লক্ষ শিশুকে মরতে হবে,

আমাদের সৎ জননীরা মহান প্রভুকে দেখার আগে?

আর কত সৎ পিতা কর দিয়ে যাবে

সেই সশস্ত্র বাহিনী গড়তে, যারা শিশু হত্যার বড়াই করে?

একজন কবি এর থেকে বড় আর কী করতে পারেন? তবু গিনসবার্গ চেষ্টা করেছিলেন, আমেরিকা ফিরে কবিতাটি গানের তালে হারমোনিয়াম বাজিয়ে পরিবেশন করেছিলেন। বব ডিলানের সঙ্গে রেকর্ডও করেছিলেন, কিন্তু সেটি প্রকাশিত হয়নি। কবিতাটি জনসমক্ষে তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন সমাজকে সহানুভূতিশীল করতে চেয়েছিলেনÑ কবিতাটি এমন কি নিউইয়র্ক টাইমসেও ছাপা হয়েছিল। 

‘সেপ্টেম্বর অন যেশোর রোড’—এর যাত্রা কিন্তু ১৯৭১—এ শেষ হয়নি। সেই বছর মিশিগানের ‘জন সিনক্লেয়ার ফ্রিডম র‌্যালিতে’ গিনসবার্গ কবিতাটি পরিবেশন করেছিলেন। ১৯৬৯ সনে, দুটি মারিজুয়ানা—ভরা সিগারেট দেওয়ার দায়ে কবি জন সিনক্লেয়ারের দশ বছরের কারাদন্ড হয়েছিল; সেই কঠোর সাজার প্রতিবাদ ও তাঁর মুক্তির দাবিতে ওই সমাবেশ হয়েছিল। 

এরকম একটি প্রতিবাদের অনুষ্ঠানে গিনসবার্গ কেন এই কবিতাটি বেছে নিলেন? আমার মনে হয় ‘সেপ্টেম্বর অন যেশোর রোড’ তাঁর কাছে স্থান—কাল—পাত্র ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছিল এক বিশ্বজনীন প্রতিবাদের ভাষা। অথচ কাব্যিক মানদন্ডে কবিতাটি যে উৎকর্ষতার দাবী রাখে এমন নয়, অনেক মার্কিন আর্ট সমালোচক তো এটিকে নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু একটি সৃষ্টির আবেদন যখন আমাদের অন্তঃস্থলকে নাড়া দেয় তখন সেটি তার ফর্মাল রূপের অপূর্ণতাকে অতিক্রম করে; তাই আজও পঞ্চান্ন বছর পরে আমরা যশোর রোডের সেপ্টেম্বর মাস নিয়ে কথা বলছি। (প্রসঙ্গতÑ সেই প্রতিবাদ সমাবেশের কয়েক দিনের মধ্যেই সিনক্লেয়ারকে ছেড়ে দেওয়া হয়) 

জন লেনন গিনসবার্গকে উপদেশ দিয়েছিলেন বিটলসের বিখ্যাত গান ‘এলিনোর রিগবির’ মতো স্ট্রিং কোয়ার্টেট (ভায়োলিন, ভায়োলা ও চেলো) দিয়ে যশোর রোড কবিতাটিকে পরিবেশন করতে। এর প্রায় বারো বছর পরে, ১৯৮৩ সালে আমস্টারডামে বিখ্যাত ডাচ চিত্রশিল্পী পিট মন্ড্রিয়ানের নামে গঠিত ‘ডাচ মন্ড্রিয়ান স্ট্রিং কোয়ার্টেট’—এর সঙ্গে গিনসবার্গ কবিতাটি আবার রেকর্ড করেন। অর্থাৎ যশোর রোডে দেখা সেই শরণার্থী মানুষদের নিয়ে লেখা কবিতাটির জীবন ১৯৭১—এর যুদ্ধের সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়নি। একটি কবিতা কাব্যিক বিচারে নিখুঁত নাও হতে পারে, কিন্তু সেটির আবেদন যদি কালোত্তীর্ণ হয়, তবে তা সব সময়ের জন্য থাকে প্রাসঙ্গিক।  

বাংলাদেশের জন্য গিনসবার্গের এই যে আকুতি তার একটি ইতিহাস আছে, আপনারা অনেকেই হয়তো সেটা জানেন। ১৯৭১—এর প্রায় এক দশক আগে, ১৯৬২ সালে, তাঁর সঙ্গী কবি পিটার অরলভস্কিকে নিয়ে তিনি ভারতে এসেছিলেন, ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার জগৎকে কাছ থেকে জানার এক ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে। ভারতে তাঁরা ছিলেন প্রায় চৌদ্দ মাস, এর মধ্যে সাত মাস ছিলেন কলকাতায়। এখানেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্তসহ কৃত্তিবাসের কবিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়; যোগাযোগ হয় মলয় রায় চৌধুরী ও হাংরি জেনারেশনের তরুণ লেখকদের সঙ্গেও।

এই যোগাযোগ একতরফা ছিল না। গিনসবার্গ ছিলেন আমেরিকার পঞ্চাশের দশকে গড়ে ওঠা প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ বিরোধী ‘বিট জেনেরেশন’—এর অন্যতম প্রধান কবি। বিট কবিদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাবের সঙ্গে হাংরি জেনারেশনের বিদ্রোহের একটা স্বাভাবিক মিল তিনি দেখতে পেয়েছিলেনÑ ঞড় যধঃব বাবৎু রহংঃরঃঁঃরড়হ ছিল হাংরি জেনারেশনের ম্যানিফেস্টোর ভাষা। বাংলার এই তরুণ কবিদের লেখা ও ইশতেহার তিনি আমেরিকায় তাঁর প্রকাশক লরেন্স ফেরলিঙ্গেত্তির কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফেরলিঙ্গেত্তি ১৯৬৩ সনে তাঁর নতুন ঈরঃু খরমযঃং ঔড়ঁৎহধষ—এর প্রথম সংখ্যাতেই দেবী রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও মলয় রায় চৌধুরী ডববশষু গধহরভবংঃড় ড়ভ ঃযব ঐঁহমৎু এবহবৎধঃরড়হ ছাপেন। ফলে ১৯৭১ সালে যশোর রোডে এসে গিনসবার্গ একজন সুবিধাপ্রাপ্ত পশ্চিমা নাগরিক হিসেবে আসেননি। বাংলার মানুষ, কবিতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তখন প্রায় এক দশকের; তাঁদের দুর্দশা তার মনে যে হৃদয়স্পর্শী অনুরণন সৃষ্টি করেছিল সেটি আশ্চর্যের কিছু নয়।

গিনসবার্গ ১৯৫৫ সনে ঐড়ষি কবিতা লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ঐড়ষি—এর হাহাকার ছিল তাঁর নিজের প্রজন্মের প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধের ও অবক্ষয়ের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত ও ক্ষতবিক্ষত হওয়ার বিরুদ্ধে; ১৯৬৬—তে ডরপযরঃধ ঠড়ৎঃবী ঝঁঃৎধ—এ তা শোনা গেল ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিরুদ্ধে; আর ১৯৭১—এ সেই একই কবি এসে দাঁড়ালেন যশোর রোডে। সেখানে হাহাকারটি আর শুধু তাঁর নিজের ছিল নাÑ সেটি হয়ে উঠেছিল লাখো শরণার্থীর হাহাকার। ১৯৭১ এক যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু অন্য যুদ্ধের হাহাকার থামেনি। পঞ্চান্ন বছর পরেও তা আমরা শুনছি।

Related Posts