যা দেখেছি যা বুঝেছি || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত || ধারাবাহিক—৩০
অন্ন—বস্ত্র—বাস
৭৭,০০০ বর্গমিটারের বাকিংহাম প্যালেস ব্রিটিশ রাজা/রানীর ৭৭৫ কক্ষ বিশিষ্ট লন্ডনস্থ বাসভবন, যার মোট আয়তন ৩৯ একর। তবে পঞ্চাশ হাজার একর আয়তনের ‘ব্যামোরাল ক্যাসেল’ এছাড়াও তাঁদের আছে আরো অনেক পরিত্যক্ত স্বল্প ব্যবহৃত, ব্যক্তিগত মালিকাধীন ও সরকারিভাবে প্রাপ্ত/অধিকৃত ঘরবাড়ি। স্টকহোম প্যালেস, সুইডিশ রাজার বাসস্থানে আছে ১,৪৩০ কক্ষ। জনশ্রম্নতি আছে যে, সেখানে ভুত—পেত্নীও বসবাস করে মনের আনন্দে। তিব্বতে ৩২ একর আয়তন বিশিষ্ট দালাই লামার ‘পোতালা প্যালেস’—এ আছে সহ¯্রাধিক কক্ষ।
ইথিওপিয়ার ‘নাশনাল’ প্যালেস’—এ আগে থাকতেন রাজা, এখন রাষ্ট্রপতি, অচিরেই নাকি পার্ক—জাদুঘরে রূপান্তরিত করবে। প্রধানমন্ত্রীর অফিস—বাসা হল ‘মেনেলিক প্যালেস’। দুই প্রাসাদেই গেলাম, খেলাম অতিথি হয়ে কয়েকবার। সিউলে রাষ্ট্রপতির অফিস—বাসা ‘ব্লু হাউজ’ ৬২ একর জমিতে নির্মিত। টোকিওর ‘ক্যানতেই’ হল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়—বাসস্থান, আকারে ৪৬,০০০ বর্গমিটার। দুই বাড়িতেই একবার করে খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অনুগামী হয়ে। আমাদের ‘গণভবন’ (১৫ একর) এবং বঙ্গভবনে (৫০ একর) গিয়েছি, খেয়েছি কয়েকবার। তার আগে বহুবার আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছি চীনের ‘গ্রেটহল’ (আয়তন ১,৭১,৮০০ বর্গমিটার), সীট অব সেরিমনি এবং ‘জঙ্গনানহাই’ (১৫০০—একর), সীট অব গভর্নমেন্ট। ঘুরে দেখেছি উত্তর কোরিয়ার কুমসুসান প্যালেস (১০,৭০০ বর্গমিটার), মৃত্যুর পর যারা বাসাকেই বানিয়েছে সমাধিসৌধ। সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রপ্রধানের ১০৬ একর আয়তনের বাড়িকে বলে ‘ইস্তানা’, সেখানেও জলযোগ করেছি।
আড়চোখে দেখা আমেরিকার ‘হোয়াইট হাউজ’—এর আয়তন ১৮ একর, ভিতরে নাকি আছে ১৩২ রুম। নয়াদিল্লিতে ভারতের ‘রাষ্ট্রপতি ভবন’ দুইলক্ষ বর্গমিটার এলাকা নিয়ে বিস্তৃত, কক্ষ সংখ্যা ৩৪০। তবে রুমানিয়ার নিকোলাই চসেস্কু বানিয়েছিল ৩.৩ লক্ষ বর্গমিটারের সর্ববৃহৎ প্যালেস, অথচ নিজে সস্ত্রীক মরেছে নির্মমভাবে গুলি খেয়ে রাস্তায়। ইটালির রাষ্ট্রপতির বাসভবন ‘কিরিনাল প্যালেস’ আয়তনে ১,১০,৫০০ বর্গমিটার, ১২০০ কক্ষ। ১৮ একরের ‘প্রাগ ক্যাসেল’—এ বাস করেন চেক রাষ্ট্রপতি। একশ কোটি ডলারে নির্মিত আধুনিক তুরস্কের রাষ্ট্রপতির সরকারি প্রাসাদ ‘আক সারে’—তে কামরা ১১৫০, জমি ৩২ লক্ষ বর্গমিটার।
এছাড়া পৃথিবীর সুপাররিচ, সেলিব্রেটি ও ল্যান্ডলর্ডদের বসতবাড়ির বর্ণনা তো অবিশ্বাস্য। দু’শ কোটি ডলার খরচায় পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ব্যক্তিগত বাড়ি ‘অ্যান্তিলিয়া’ বানিয়েছে বোম্বাইয়ের মুকেশ আম্বানি। সাইত্রিশ হাজার বর্গমিটারের ২৭ তলা অট্টালিকায় ছ’সদস্যের একটি পরিবারের জন্য আছে ছ’শ কর্মচারী। বিল গেটস, অপরা উইনফ্রে, টাইগার উডস, বিয়ন্সে, শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন প্রমুখের ঘরবাড়ি কেমন দেখতে পারলে মজা হত।
সারা দুনিয়ার ৮২% সম্পদ নাকি শুধু ১% মানুষের ভোগদখলে। আকাশে পাতালে ভূতলে যেখানেই যাও, সীমানা—প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে তোমার অবাধ চলার স্বাধীনতা। পৃথিবী জুড়ে এখনও গৃহহীন আছে ১.৬০ কোটি মানুষ। এখনও পযার্প্ত বাসস্থান নেই ১ কোটি মানুষের, যারা বাস করে বস্তি ও অস্থায়ী আশ্রয়ে। আর পৃথিবীতে গড়ে অন্তত ৬০ লক্ষ গৃহহীন লোকের ঘুমের স্থায়ী কোনো জায়গা নেই, অথচ দিন দিন শূন্য পড়ে থাকা বাসস্থানের সংখ্যা বাড়ছে। নগরায়ন বা আধুনিক সুবিধার কথা বলছি না, শুধু ঘুমানোর জন্য একটি নিজস্ব বিছানা কতজনের আছে, সেকথা বলছি। গৃহহীনতার কারণও বিবিধ বিচিত্র: চরম দারিদ্র্য, উচ্ছৃখল জীবনযাপন, মানসিক অসুস্থতা, উৎখাত উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক ও মানবিক কারণে বাস্তুচ্যুতি।
পৃথিবীর ৫.৭৫ কোটি বর্গমাইল ভূপৃষ্ঠে মানুষের সংখ্যা ৮০০ কোটি, পরিবারের সংখ্যা মোটামুটি আড়াইশ কোটি হলে গড়ে একটি পরিবার কতবড় একটা বাড়ি পায়? কিন্তু ধনসম্পদের মতো পৃথিবীর জমিও সমবন্টিত হয় না। আফ্রিকায় আছে দিগন্তহীন উন্মুক্ত অব্যবহৃত ভূমি অথচ অধিকাংশ পরিবার রাত কাটায় ক্ষুদ্রায়তন গোলাকার তাবুর মতো খড়কুটার ঘরে। মেরু অঞ্চলেও ‘ইগলু’ নামক এক কক্ষের গিঞ্জি খুপরিতেই পরিবার নিয়ে অনেকের জীবন কেটে যায়।
বাড়ি যত বড়ই হোক, মানুষ কিন্তু ঘুমায় ঘরের একটি কোণে, মধ্যখানেও নয়। কারণ মানুষের মন কোনোকিছুর কোণায় লুকাতে চায়, জন্মের শুরু যেমন হয় ক্ষুদ্র মাতৃগর্ভে। নিরাপত্তা, ঘুম, ধ্যান, আরাধনাÑসবকিছুর জন্যই মন চায় গৃহকোণ, উন্মুক্ত বিস্তৃত সুপরিসর জায়গা নয়। আমার মনে হয় না, রাজা—বাদশাহগণ তাদের প্রাসাদে খুশিমনে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে চান, রাজা হওয়ার কারণে তারা বাধ্য হন সেখানে থাকতে। তাই অনেকে, যেমন স্প্যানিশ রাজা ফিলিপ, শুনেছি রাজবাড়ি ছেড়ে ছোট মডেস্ট কোনো আশ্রয়ে বসবাস করেন।
আর যদি কেউ মনে করতে চায় ‘আমার বাড়ি’, ‘নিজের বাড়ি’ ‘ব্যক্তিগত বাড়ি’ কোথায়? আসলেও কি নিজের বলে কিছু আছে? কতদিন? কতবড় ঘর আর কতবেশি জায়গা, সেটা প্রশ্ন নয়, মূলকথা হল শান্তি কোথায় কিসে বেশি। সেদিকে আমার নজর কেন যায় না? সেই পাগলা রাজা হাছন কেন যে বলল, ‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার’Ñএই শুনে আমিও বেফানা। আমার আর ঘরবাড়ি ভাল লাগে না। ঘর আমাকে সারাক্ষণ বসিয়ে রাখতে পারে না, বাহির আমাকে টানে। মন শুধু বলে, কোথায় যাব, কোথায় যাব? তারপর বাইরে যাই, আবার ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে। কিছু সময় পর আবার উড়ু উড়ু মন। কেন এই অস্থিরতা? মন কেন কোথাও স্থিতু হয়ে বসতে চায় না? এইজন্যই কি পাখিরা এক এক সময় এক এক জায়গায় নীড় বাঁধে?
যাক, অন্ন—বস্ত্র—বাসের তালাশ যথেষ্ট হয়েছে, আর না। মানুষের এই তিন মৌলিক চাহিদা নিয়ে এতকথা কেন বললাম, তা—ই বলি। পৃথিবী এবং তার মানুষ যতই উন্নতি লাভ করুক, এখনো অধিকাংশ মানুষের জীবনের শাঁস বা সারকথা হল অন্ন—বস্ত্র—আবাসের সংস্থান। তবে একজন মানুষ একবেলা, একদিন বা একজীবনে কতমজা কতটুকু খেতে পারে? কতবার কতঢঙের পোশাক বদলাতে পারে? কতবড় বাড়িতে কতবেশি ঘুমাতে পারে? কয়টি প্রজন্মের জন্য সম্পদ রেখে গিয়ে বংশের কতটুকু নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে পারে? সম্পদের পাহাড় যারা গড়েছে, ভোগ দূরের কথা, হাতেও ধরে না, চোখেও সব দেখে নাÑপড়ে থাকে ব্যাঙ্কে, জমিতে, শূন্যঘরে। আহা, তবু কত খাই খাই করে মানুষ! কেন তবে বাড়াবাড়ি করি, তার কারণটা বুঝতে চেষ্টা করছি। তবে এটা এতই সহজাত স্বাভাবিক অপিরহার্য যে একজন ভিক্ষুক থেকে স¤্রাট পর্যন্ত একই আচরণ করে। মৃত্যুর দিন কি তার মনে হয়: এতকিছুর তার দরকার ছিল না?
পৃথিবীতে এত খাবার নষ্ট হয়, এত পোশাক পরিত্যক্ত হয়, এত বাসস্থান জনশূন্য পড়ে থাকে কিন্তু কেউ তার উদ্বৃত্ত অনাহারী ছিন্নবস্ত্র গৃহহীনকে শেয়ার করে না কোনোদিন কোনোভাবে। আমি আর এখন বৈষ্যম্যের কোনো প্রতিবাদ করি না। আমার মনে হয় ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে’ বড় হওয়া বা উপরে ওঠার এই দুদর্মনীয় স্পৃহার কারণেই মানবজাতির এই অভাবনীয় অগ্রগতি। এটাকে অসমতা ও বৈষম্যের কারণ দেখিয়ে পারস্পরিক প্রতিযোগিতাকে ঠেকিয়ে দমিয়ে রাখলে মানুষ কি তাজমহল গড়তে পারত? সাম্যবাদ ও পঁুজিবাদের দ্বন্দ্ব কি এখানেই? কোনটা তাহলে শ্রেয়Ñঅসাম্যের অবাধ প্রতিযোগিতা, নাকি সাম্যের সমবন্টন? প্রকৃতি কি বলে? প্রকৃতিও অসমতার গান গায়Ñসবার বুদ্ধি শক্তি সুযোগ সমান দেয়নি প্রকৃতি। প্রত্যেকটা মানুষ প্রাণী বৃক্ষ অসমানÑঅসমতাই যেন বিধান।
তবে এই চরম বৈষম্য মৃত্যুর পরেও বজায় থাকবে শুনে আমার বুদ্ধিভ্রম হচ্ছে। শুনেছি সাত দোজখ এবং আট বেহেস্তে মানুষ থাকবে তার কর্মফল অনুযায়ী অথার্ৎ পরকালেও সবার অন্ন—বস্ত্র—বাসস্থান একরকম হবে না। ঈশ^রের নিকট আমার প্রার্থনাÑস্বর্গবাস নয়, নরককন্ড নয়, সরাইখানার একটি কক্ষ। ঘুরে বেড়াব পথে প্রান্তরে, যখন যা মেলে খাব পথের ধারে, রাতে ঘুমাব পান্থশালায়।
