সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সোসাইটির কর্মকর্তারা || গত দুই বছরে কোনো অর্থ অপচয় হয়নি

নিউইয়র্ক (ইউএনএ)ঃ বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান কমিটির মেয়াদ অঅগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই মেয়াদের আগেই আগামী ২৫ অক্টোবর, রবিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রি—বার্ষিক (২০২৭—২০২৯) নির্বাচন। বিদায়ী কমিটির  কার্যক্রম এবং  অর্থের হিসাব ঘিরে কোন কোন মহল নানা অভিযোগ তুলেছেন। ফলে নানা মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী নেতৃত্বাধীন বর্তমান কার্যকরী পরিষদ। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে কমিউনিটিতে অভিযোগগুলো আলোচিত হচ্ছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে স্বচ্ছতার স্বার্থে সোসাইটির কার্যকরী পরিষদ সংবাদ সম্মেলন করে সকল অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন— বর্তমান কার্যকরী পরিষদ সোসাইটির একটি ডলারও অপচয় করেনি বরং এই কমিটির বিদায়ের সময় সংগঠনের ফান্ডে প্রায় এক মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশী অর্থ ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে যাবে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়: ‘আমরা কোনো কাদা ছোড়াছুড়ি বা ব্যক্তিগত বিতর্কে যেতে চাই না। আমরা হিসাব, নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলতে চাই।

উল্লেখ্য, সোসাইটির আগামী নির্বাচনে ‘সেলিম—আলী’ প্যানেল পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল ‘কুনু—ফিরোজ’ পরিষদ। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সোসাইটির নির্বাচনে সেলিম—আলী নেতৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে জয়লাভ করেছিলো।

বাংলাদেশ সোসাইটির নিজস্ব কার্যালয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার বিকেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত এবং অভিযোগগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরেন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী। এরপর সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ, সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। 

জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে সোসাইটি ট্রাষ্টিবোর্ডের সদস্য আজিমুর রহমান বুরহান, আব্দুর রহীম হাওলাদার, মোহাম্মদ আতোয়ারুল আলম, আহসান হাবীব, জুনেদ চৌধুরী, ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার ও নাঈম টুটুলসহ কর্মকর্তাদের মধ্যে সিনিয়র সহ সভাপতি মহিউদ্দিন দেওয়ান, সহ সভাপতি কামরুজ্জামান কামরুল, সাংগঠনিক সম্পাদক ডিউক খান, জনসংযোগ ও প্রচার সম্পাদক রিজু মোহাম্মদ, স্কুল ও শিক্ষা সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান (জিলানী), কার্যকরি সদস্য জাহাঙ্গীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হাছান খান উপস্থিত ছিলেন।     

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ আলী তার ৮ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যের শুরুতে  বাংলাদেশ সোসাইটির ভালো সময়ে এবং বিভিন্ন কঠিন সময়ে পাশে থাকা এবং আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও পাশে থাকার জন্য সংবাদিকদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সা¤প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং বিভিন্ন জনসমাগমে সোসাইটির কয়েকজন সদস্য বাংলাদেশ সোসাইটি বর্তমান কার্যকরী পরিষদ এবং এর কর্মকর্তাদের নিয়ে বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত বক্তব্য দিয়ে আসছেন। এসব বক্তব্য আমাদের ব্যথিত করেছে এবং কমিউনিটির মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাই আজ আমরা কোনো পাল্টা অভিযোগ বা ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্য নয়, বরং উত্থাপিত বিষয়গুলোর প্রকৃত তথ্য ও বাস্তবতা আপনাদের মাধ্যমে কমিউনিটির সামনে তুলে ধরতে উপস্থিত হয়েছি। 

মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশ সোসাইটি ৫১ বছরের একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমান কার্যকরী পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সোসাইটির কার্যক্রম হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সদস্যদের জন্য সহজলভ্য। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে সেই দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪—এর অভিষেক অনুষ্ঠানে বিদায়ী কমিটির পক্ষ থেকে বক্তব্যে জানানো হয়েছিল যে, সোসাইটির অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩ লক্ষ ৮৫ হাজার ডলার রেখে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক দায়দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর আমরা দেখতে পাই, অ্যাকাউন্টে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ৬৭৩.৮৯ ডলার। এছাড়াও অভিষেক অনুষ্ঠানসহ পূর্ববর্তী কমিটির সময়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেবা ও অন্যান্য খাতে প্রায় ২০ হাজার ডলারের বকেয়া দায়ও আমাদের পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থাৎ, সব দায় সমন্বয় করলে কার্যত মাত্র ১ লক্ষ ১৬ হাজার ডলারের নিট আর্থিক অবস্থান নিয়ে আমরা বাংলাদেশ সোসাইটির দায়িত্ব গ্রহণ করি।

তিনি বলেন, আমরা কার্যত মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ডলার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই সময়ে অর্থ সঞ্চয় করতে গিয়ে আমরা সোসাইটির কার্যক্রম থামিয়ে রাখিনি গত ২০ মাসে বরং অত্যন্ত জমকালো আয়োজনে বাংলাদেশ সোসাইটির ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করেছি, পবিত্র রমজানে নিউইয়র্ক সিটির বাঙালি অধ্যুষিত চারটি এলাকায় মোট ৮টি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছি। পাশাপাশি ইমিগ্রেশন সেমিনার, এনআইডি কার্ড সংক্রান্ত সেমিনারসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করেছি। সোসাইটির কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করলে, তাঁর পরিবারের এই কঠিন সময়ে আমরা পাশে দাঁড়িয়েছি। প্রয়োজন অনুযায়ী ফিউনারেল সহায়তা, সোসাইটির নিজস্ব কবরের ব্যবস্থা অথবা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছি। এতসব কর্মসূচি, অনুষ্ঠান, সহযোগিতা ও জনকল্যাণমূলক ব্যয় করার পরও গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ সোসাইটির অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ প্রায় এক মিলিয়ন ডলার (৯ লাখ ১৯ হাজার ডলার)। রেকর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশ সোসাইটির ৫০ বছরের ইতিহাসে এ পরিমাণ অর্থ সোসাইটির অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত থাকার নজির নেই। 

বাংলাদেশ সেন্টার ক্রয় সম্পর্কে তিনি বলেন, এনিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান কার্যকরী পরিষদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলাদেশ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা। আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি, পূর্ববর্তী দায়দেনা সমন্বয়ের পর আমাদের কার্যকর আর্থিক অবস্থান ছিল মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ডলার। আমাদের বিশ্বাস ছিল সৎ উদ্দেশ্য, সঠিক পরিকল্পনা এবং কমিউনিটির সহযোগিতা থাকলে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর জ্যামাইকা এলাকায় একটি ভবন আমাদের পছন্দ হয়। অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কমিউনিটির সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে প্রাথমিক যাচাই—বাছাইয়ের পর কার্যকরী পরিষদ ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের আলোচনায় ক্রয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আমাদের অ্যাটর্নির মাধ্যমে ৩১ অক্টোবর ২০২৫ শর্তসাপেক্ষ ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। সোসাইটির পক্ষ থেকে ২ লাখ ডলার ডিপোজিট প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ ব্যক্তিগতভাবে অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। চুক্তিটি ছিল শর্তসাপেক্ষ। ভবনটিতে কিছু ভায়োলেশন ও অন্যান্য অসঙ্গতি ছিল এবং সেগুলো সমাধানের শর্তেই আমরা এগিয়েছিলাম। পরবর্তীতে বিক্রেতা পক্ষ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে না পারায় সোসাইটির বৃহত্তর স্বার্থে আমরা চুক্তি বাতিল করি এবং সম্পূর্ণ ২ লাখ ডলার ডিপোজিট ফেরত নিয়ে আসি। তিনি বলেন, আমরা কখনো বলিনি, ‘ভবন কিনে ফেলেছি।’ আমরা বলেছিলাম ‘প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছি’ কারণ শর্তসাপেক্ষ চুক্তি স্বাক্ষর এবং ২ লাখ ডলার ডিপোজিট প্রদানের মাধ্যমে বাস্তবেই ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। আমাদের অনুরোধ একটাই অভিযোগের আগে তথ্য যাচাই করুন। বাংলাদেশ সেন্টার কোনো ব্যক্তি বা একটি পরিষদের স্বপ্ন নয়; এটি আমাদের পুরো কমিউনিটির এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন।

সোসাইটির ভবনের ভায়োলেশন ও জরিমানা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই এই ভায়োলেশনগুলো বর্তমান কার্যকরী পরিষদের সময়ে সৃষ্টি হয়নি এবং এর বিপরীতে আরোপিত জরিমানাও আমাদের মেয়াদকালের নয়। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় এগুলো পূর্ববর্তী সময় থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। এ সংক্রান্ত তথ্য নিউইয়র্ক সিটির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পাবলিক রেকর্ডে রয়েছে; যে কেউ চাইলে তা যাচাই করতে পারেন। 

বার্ষিক সাধারণ সভা, হিসাব ও অডিট প্রসঙ্গে জানানো হয়, বাংলাদেশ সোসাইটি কোনো ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিচালিত হয় না; এটি পরিচালিত হয় এর গঠনতন্ত্র ও বিধি অনুযায়ী। বর্তমান কার্যকরী পরিষদ সেই নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করছে এবং মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত সেভাবেই পরিচালনা করবে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গত ডিসেম্বর মাসে আমরা বার্ষিক সাধারণ সভা করেছি। সেখানে সিপিএ রিপোর্টসহ সোসাইটির আয়—ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।

অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ, অপবাদ, ভুল ব্যাখ্যা এবং অর্ধসত্য তথ্য বিভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে।  আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পর দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, অধিকাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে; কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো চলমান রয়েছে। বর্তমান কার্যকরী পরিষদের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, এবং মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করে যাব।

লিখিত বক্তব্যেও সবশেষে মোহাম্মদ আলী কমিউনিটির উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আসুন, বিভ্রান্তি নয় সত্যকে সামনে রাখি। বিভাজন নয় ঐক্যকে শক্তিশালী করি। ব্যক্তির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠানকে রাখি, আর আগামী প্রজন্মের জন্য সবাই মিলে একটি সুন্দর বাংলাদেশ সোসাইটি গড়ে তুলি’।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে আতাউর রহমান সেলিম বলেন, আমরা গঠনতন্ত্র মেনেই সোসাইটি পরিচালনা করছি। একটি ডলারও তছরুপ হচ্ছে না, হবেও না। সকল আয়—বয়ের হিসাব রয়েছে।  

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে শাহ নেওয়াজ বলেন, সোসাইটির আগামী নির্বাচনের পর যে বা যারাই বিজয় হন না কেন আমি তাদের সহযোগিতা করবো এবং বাংলাদেশ সেন্টার প্রতিষ্ঠা হবেই ইনশাল্লাহ।

Related Posts